কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নিরাপদ ও রাসায়নমুক্ত পদ্ধতিতে করলা চাষে আগ্রহ বাড়লেও উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। আধুনিক কৃষি পদ্ধতিতে উৎপাদিত এসব সবজির জন্য বাজারে আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় বাড়তি বিনিয়োগের সুফলও মিলছে না।
কুমারখালীর ধলনগর গ্রামের কৃষক দাবির উদ্দিন ফারাজী ও আবদুল বারী এবারই প্রথম গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (জিএপি) পদ্ধতিতে তিন বিঘা জমিতে ‘আলিসা’ জাতের করলা চাষ করেছেন। জমির চারপাশে নীল নেট দিয়ে ঘের তৈরি, পোকা দমনে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার এবং মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ—সব মিলিয়ে প্রচলিত চাষের তুলনায় বাড়তি যত্ন নিতে হয়েছে।
উৎপাদন ভালো, দাম কম
গত ১০ দিনে দুই কৃষক প্রায় ২ হাজার ২০০ কেজি করলা পাইকারি বাজারে ৩০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে পেয়েছেন ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে আরও অন্তত ৪ হাজার কেজি করলা উৎপাদনের আশা করছেন তারা। দাবির উদ্দিনের হিসাবে, এতে মোট আয় আড়াই লাখ টাকার বেশি হতে পারে।
তবে তিন বিঘা জমিতে জমি প্রস্তুত, বীজ, উপকরণ ও চাষাবাদে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বাড়তি খরচ ও শ্রমের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় হতাশা রয়েছে কৃষকদের মধ্যে।

দাবির উদ্দিন বলেন, জিএপি পদ্ধতিতে চাষ করতে নেট, ফাঁদ ও জৈব সার কিনতে বেশি খরচ হয়। উৎপাদন ভালো এবং সবজি তুলনামূলক নিরাপদ হলেও রাসায়নমুক্ত পণ্যের জন্য ক্রেতারা বেশি দাম দিতে আগ্রহী নন।
গত বছর একই সময়ে করলা কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও এবার পাইকারি দাম নেমে এসেছে ৩৫ থেকে ৫৫ টাকায়। ধলনগরের পান্তি তাহাবাজারে বর্তমানে পাইকারি দর আরও কমে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী মিল্টন হোসেন।
আলাদা বাজারের দাবি
কৃষকদের প্রত্যাশা, কুষ্টিয়া ও ঢাকার বড় বাজারগুলোতে রাসায়নমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার থাকবে। পণ্যে যথাযথ লেবেল থাকলে ভোক্তারা সহজেই তা শনাক্ত করতে পারবেন এবং কৃষকরাও বাড়তি দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আবদুল বারী বলেন, বাজারে রাসায়নমুক্ত সবজির জন্য আলাদা জায়গা থাকলে ক্রেতারা জানতে পারবেন তারা কী কিনছেন এবং কৃষকরাও ন্যায্য দাম পাবেন।
কৃষি কর্মকর্তারাও মনে করছেন, পৃথক বিপণন ব্যবস্থা থাকলে নিরাপদ সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে। কুমারখালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর উপজেলায় প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলা চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫০০ টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি।

আধুনিক পদ্ধতিতে বাড়ছে চাষ
কুমারখালীতে শুধু জিএপি নয়, মালচিংসহ বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতিতেও করলা চাষ বাড়ছে। ধলনগরের কৃষক উজ্জ্বল চৌধুরী গত বছর আট শতক জমিতে প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ করে করলা চাষ করে ৬০ হাজার টাকা বিক্রি করেছিলেন। এবার তিনি জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ শতক করেছেন।
কৃষক মোহন শেখ গত বছর এক বিঘায় মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করেছিলেন। এবার একই জমিতে আগাম চাষে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছেন। কৃষি প্রণোদনা পেলে আগামী বছর মালচিংয়ের সঙ্গে রাসায়নমুক্ত চাষও করতে চান তিনি।
জিএপি পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেয়। এতে মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য ও কৃষকের নিরাপদ কর্মপরিবেশের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। আর মালচিংয়ে খড়, পাতা, কচুরিপানা বা প্লাস্টিক দিয়ে গাছের চারপাশের মাটি ঢেকে রাখা হয়, যা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ধলনগরে প্রায় ২১ বিঘা জমিতে করলা চাষ হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন জানান, কৃষকদের জিএপি পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি আলাদা বিপণন ব্যবস্থাও প্রয়োজন। এ বিষয়ে উপজেলা পর্যায়ে রাসায়নমুক্ত সবজির জন্য পৃথক বাজার চালুর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তারও জানিয়েছেন, উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছালে স্থানীয় বাজারগুলোতে রাসায়নমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার চালুর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















