দীর্ঘ সাত বছরের সংগীতযাত্রায় নিজেদের সৃষ্টিশীলতার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে দক্ষিণ কোরিয়ার রক ব্যান্ড ওয়ানউই। এবার ১৭টি গান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশ করছে পাঁচ সদস্যের এই দল। রূপকথার নানা গল্পকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে তৈরি করা হয়েছে অ্যালবামটি। নাম ‘মিয়ন : আননোন অ্যাটলাস’।
বুধবার প্রকাশিত হতে যাওয়া অ্যালবামটির পরিকল্পনা অবশ্য এত বড় ছিল না। দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য গিউকের পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম করার ইচ্ছা থেকেই শুরু হয়েছিল ভাবনাটি। পরে একে একে দলের অন্য সদস্যরাও নতুন গান যোগ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ছোট একটি পরিকল্পনা রূপ নেয় ১৭ গানের বিশাল সংগীতভাণ্ডারে।
রূপকথার গল্পে নতুন অর্থ
অ্যালবামের প্রতিটি নতুন গান কোনো না কোনো রূপকথাকে ভিত্তি করে তৈরি। তবে পুরোনো গল্পগুলোকে হুবহু তুলে ধরা হয়নি। বরং পরিচিত গল্পের ভেতর থেকে আধুনিক জীবনের নানা অনুভূতি ও বার্তা খুঁজে নেওয়া হয়েছে।
‘লিলিপুট’ গানটিতে অন্য কারও সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে নিজের পরিচয় ও সামর্থ্যকে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। ‘লাপুতা’য় এমন এক দ্বীপের কল্পনা করা হয়েছে, যে নিজের প্রিয় জিনিসগুলো রক্ষা করতে নিজেই চলতে শুরু করে। আর ‘পিনোকিও’য় উঠে এসেছে এমন এক ছেলের গল্প, যে নিজের ক্ষত লুকিয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে।
‘সিনারিও’ গানটি বিকল্প রকের আবহে তৈরি। পিয়ানো ও তারযন্ত্রের আবেগময় সুরের সঙ্গে গানটি এমন এক মানুষের গল্প বলে, যে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নকে আবার নিজের করে নিতে চায় এবং অন্য কেউ তার জীবনের শেষ পরিণতি লিখে দিক—এটি মেনে নিতে রাজি নয়।

গিটারবাদক কাংহিয়ন বলেন, প্রতিটি গানের বার্তা আলাদা হলেও সবগুলো একসঙ্গে শুনলে মনে হয় যেন একটি রূপকথার বই পড়া হচ্ছে।
পুরোনো গানও থাকছে অ্যালবামে
১৭টি গানের মধ্যে ১২টি সম্পূর্ণ নতুন। বাকি পাঁচটি গান আগের প্রকাশনাগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘কোঅর্ডিনেটস’, ‘কম্পাস’ ও ‘নেভারল্যান্ড’।
অ্যালবামটির ধারণা তৈরি হয়েছে বিন্দু, রেখা ও সমতলের প্রতীকী ভাবনাকে ঘিরে। এর আগে ‘দ্য কুইভার’ এবং ‘দ্য ওয়েক’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই ধারাবাহিকতার সূচনা হয়েছিল। এবার পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের মাধ্যমে সেই সংগীতযাত্রার সমাপ্তি টানছে দলটি।
নিজেদের গান নিজেরাই তৈরি
ওয়ানউইয়ের বিশেষত্ব হলো, দলের সদস্যরা শুরু থেকেই নিজেদের গান লেখা ও সংগীত তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও দলনেতা ইয়ংহুন, গিটারবাদক কাংহিয়ন, ড্রামার হারিন, কিবোর্ডবাদক ও কণ্ঠশিল্পী দংমিয়ং এবং বেজবাদক গিউক—পাঁচজনই দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে দলটির সংগীতভুবন গড়ে তুলেছেন।
২০১৯ সালের মে মাসে বিনোদন প্রতিষ্ঠান আরবিডব্লিউয়ের প্রথম পুরুষ রক ব্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ওয়ানউই। ২০২০ সালে প্রকাশ করে ‘ওয়ান’ এবং গত বছরের মার্চে আসে ‘উই : ড্রিম চেজার’।
দলের প্রথম দুই পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামের মধ্যে পাঁচ বছরের ব্যবধান থাকলেও এবার কাজ এগিয়েছে অনেক দ্রুত। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে গান লিখে রেখেছিলেন সদস্যরা। ফলে প্রত্যেকের কাছেই এমন কিছু গান জমে ছিল, যেগুলো আগে প্রকাশের সুযোগ পায়নি।
কাংহিয়নের কাছে আগে থেকেই ছিল ‘লাপুতা’ ও ‘লিলিপুট’, আর গিউকের হাতে ছিল ‘পিনোকিও’। একপর্যায়ে এসব গানকে একই রূপকথার ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব আসে।
কাংহিয়নের ভাষায়, প্রত্যেক সদস্য মাত্র তিনটি করে গান লিখলেও ১৫টি গান হয়ে যায়। সেখান থেকেই অ্যালবামটি বড় করার সাহস পান তারা।

গান তৈরি যতটা সহজ, রেকর্ডিং ততটা নয়
গান লেখা শেষ হলেও রেকর্ডিংয়ের সময় বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে দলটিকে। অ্যালবামের মূল গান ও অন্যান্য গান চূড়ান্ত করতে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত কিছু রেকর্ডিং সময়ও হারাতে হয়।
প্রধান কণ্ঠশিল্পী ইয়ংহুনের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল প্রতিটি গানের ভিন্ন ভিন্ন আবহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। গানগুলো একে অপরের থেকে এতটাই আলাদা যে প্রতিবার রেকর্ডিংয়ের সময় তাকে আলাদা ধরনের কণ্ঠ ও অনুভূতি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।
মূল গান নির্বাচন করতেও বেশ সময় লেগেছে। ‘সিনারিও’ ও ‘পিনোকিও’—এই দুটি গানের মধ্যে কোনটিকে সামনে রাখা হবে, তা নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। দংমিয়ংয়ের মতে, ‘পিনোকিও’ ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি সাহসী ও প্রচলিত ধারার বাইরে।
শেষ পর্যন্ত সংগীতজগতের বাইরের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের কাছে দুটি গান বাজিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া নেওয়া হয়। সেই মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।
সামরিক দায়িত্ব শেষে বদলে যাওয়া সংগীতের বাজার
ওয়ানউইয়ের দুই সদস্য ইয়ংহুন ও কাংহিয়ন ২০২৪ সালে সামরিক দায়িত্ব শেষ করে সংগীতে ফিরে আসেন। তাদের ফিরে আসার সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সংগীতজগতে ব্যান্ডভিত্তিক সংগীতের প্রতি আগ্রহও অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল।
দংমিয়ংয়ের মতে, সেটিই ছিল দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। আগে তারা অনেক মঞ্চে গান গাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এখন গ্রীষ্মকালীন রক উৎসবের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ শ্রোতাদের সামনে নিজেদের গান পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও অনেক বেশি হয়েছে।
সাত বছর পরও একসঙ্গে থাকার রহস্য
২০১৯ সালে আত্মপ্রকাশের পর সাত বছর পার করেছে ওয়ানউই। এতদিন একসঙ্গে থাকার পেছনে সদস্যরা মনে করেন, শুরু থেকেই নিজেদের মতবিরোধ ও সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করার অভ্যাস তাদের সাহায্য করেছে।
দলের সদস্যরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অভিজ্ঞ ব্যান্ড জাউরিমের সদস্যরাও ছিলেন।
ইয়ংহুন জানান, অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাছ থেকে তারা একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনেছিলেন—প্রত্যেককে নিজের দায়িত্বের অংশটুকু বহন করতে হবে। এই কথাটি তাদের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।

সামনে আরও বড় স্বপ্ন
নতুন অ্যালবাম প্রকাশের পর আগামী ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর নিজেদের ষষ্ঠ একক কনসার্ট আয়োজন করবে ওয়ানউই। পাশাপাশি আগামী বছর অলিম্পিক পার্কে বড় একটি মঞ্চে নিজেদের পরিবেশনা করার লক্ষ্যও রয়েছে তাদের।
তবে এত সাফল্য ও দীর্ঘ পথ পেরিয়েও একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে। এমন একটি গান এখনো তৈরি করতে পারেনি দলটি, যেটি প্রথম কয়েকটি সুরেই মানুষ চিনে ফেলবে।
ইয়ংহুনের ভাষায়, একটি বড় জনপ্রিয় গান তৈরি করা এখনো তাদের জন্য বাকি থাকা দায়িত্ব।
আর গিউক আরও সরাসরি বলেছেন, এই অ্যালবামই হয়তো ওয়ানউইকে তার সবচেয়ে নিচের অবস্থান থেকে তুলে নেওয়ার শেষ সুযোগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















