লন্ডনের একটি সাইনসবুরি দোকানে ক্রেতাকে ভুল করে চোর হিসেবে শনাক্ত করার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কেন দোকান থেকে বের করে দেওয়া হলো ক্রেতাকে
দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের ইস্ট ডালউইচ এলাকার সাইনসবুরি দোকানে ৪৬ বছর বয়সী ম্যাট আর্নল্ড একটি হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে গিয়েছিলেন। পণ্য স্ক্যান করে এবং নিজের সদস্য কার্ড ব্যবহার করার পর দুই ব্যবস্থাপক তাকে জানান, আগের একটি ঘটনার কারণে তাকে সেবা দেওয়া যাবে না।
এরপর তাকে দোকান থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। দোকানের কর্মীরা তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আর্নল্ড নিজেই বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দোকান থেকে বের হওয়ার সময় তিনি ওপরের নিরাপত্তা ক্যামেরার পর্দায় নিজের মুখের চারপাশে লাল বৃত্ত দেখতে পান। তখন তিনি তার কেনা সামগ্রীগুলো ট্রলিতে রেখে দেওয়ার অনুরোধ করেন, যাতে তার বন্ধু পরে এসে সেগুলো নিয়ে যেতে পারেন।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর তার সহকর্মী এসে পণ্যগুলোর মূল্য পরিশোধ করে নিয়ে যান। আর্নল্ডের অভিযোগ, কর্মীরা একবারও বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখেননি যে একজন প্রকৃত দোকানচোর সাধারণত এভাবে নিজের কেনাকাটা রেখে পরে তা সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করে যাবে না।
ভুলের পর ক্ষমা চেয়ে ব্যবস্থা স্থগিত
ঘটনার পরদিন সাইনসবুরির প্রধান কার্যালয় আর্নল্ডের কাছে ক্ষমা চায়। পাশাপাশি ইস্ট ডালউইচের ওই দোকানে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার সাময়িকভাবে বন্ধ করে তদন্ত শুরু করা হয়।
আর্নল্ড বলেন, এ ধরনের ভুল অভিযোগ যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। বিশেষ করে এমন কেউ যদি অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যিনি মানসিকভাবে বেশি দুর্বল বা নিজের পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে পারেন না, তাহলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া এক বিষয়, কিন্তু যন্ত্রের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন না করে মানুষের তা অনুসরণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

আগেও ঘটেছে একই ধরনের ভুল
সাইনসবুরি দোকানগুলোতে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্দেহভাজন দোকানচোর ও অন্যান্য অপরাধী শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
তবে এর আগেও একই প্রযুক্তি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ লন্ডনের এলিফ্যান্ট অ্যান্ড ক্যাসল এলাকার একটি শাখায় ওয়ারেন রাজাহ নামের আরেক ক্রেতাকেও ভুলভাবে শনাক্ত করে দোকান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। হোম বেইগেইনস ও বি অ্যান্ড এম নামের আরও কয়েকটি দোকানেও একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আর্নল্ড মনে করেন, যদি প্রযুক্তি ব্যবহারে কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে শুধু একটি দোকানে নয়, সব দোকানেই এর ব্যবহার সাময়িকভাবে বন্ধ করা উচিত।
প্রতিষ্ঠান বলছে, সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়
সাইনসবুরি জানিয়েছে, আর্নল্ডের সঙ্গে যা ঘটেছে তার জন্য তারা দুঃখিত। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ঘটনাটি মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ভুলের কারণে নয়, বরং কর্মীদের মানবিক ভুলের কারণে ঘটেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবস্থায় সঠিক সতর্কবার্তাই তৈরি হয়েছিল এবং প্রতিটি শনাক্তকরণ প্রশিক্ষিত একজন ব্যবস্থাপক পর্যালোচনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ব্যবস্থাটির নির্ভুলতার হার ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও বলেছে, এ ঘটনায় প্রযুক্তি সঠিকভাবেই সতর্কবার্তা দিয়েছিল। দোকানে সেই সতর্কবার্তা যেভাবে সামলানো হয়েছে, ভুলটি সেখানেই হয়েছে।
ইস্ট ডালউইচের দোকানে প্রযুক্তি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখাকে তারা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। কর্মীদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় নতুন সতর্কবার্তা ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, তার সিদ্ধান্তের ওপর মানুষের অন্ধ নির্ভরতা নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















