০২:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম নেপালের জেন-জি আন্দোলনের এক বছর: বদলেছে সরকার, বদলায়নি আহতদের জীবন ১৮৮ কর্মকর্তার বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ইরান যুদ্ধের সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে: সেনা উপপ্রধান সার দিতে দেরি, ডিলারের গুদাম ভেঙে শতাধিক বস্তা সার লুট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট গর্ভনিরোধক সরবরাহ স্বাভাবিক হবে ২-৩ মাসের মধ্যে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামে মৃত্যু ৯৯৭, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩১৪ জন পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি করে কুপিয়ে হত্যা

স্টারমারের পতন শুধু এক নেতার নয়, ব্রিটিশ মধ্যপন্থী রাজনীতিরও সংকেত

ব্রিটিশ রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যে কোনো প্রধানমন্ত্রী এত দ্রুত নিজের রাজনৈতিক শক্তি, নৈতিক কর্তৃত্ব এবং জনসমর্থন হারিয়েছেন, যেমনটা ঘটছে কিয়ার স্টারমারের ক্ষেত্রে। মাত্র দুই বছর আগেও যিনি নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার স্থপতি হিসেবে ভাবছিলেন, এখন তিনি নিজের দলেই অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনের ফল শুধু একটি নির্বাচনী ধাক্কা নয়; এটি ছিল ব্রিটিশ মধ্যপন্থী রাজনীতির গভীর সংকটের প্রকাশ।

স্টারমারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো অর্থনীতি বা প্রশাসনে নয়, বরং রাজনৈতিক ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি এমন এক সময়ের নেতা, যখন রাজনীতি আর কেবল নীতিমালা বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি আবেগ, পরিচয়, নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্বের লড়াই। অথচ স্টারমার রাজনীতিকে দেখেছেন আইনি কাঠামো, প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিতে। ফলে তিনি ক্রমশ এমন এক নেতায় পরিণত হয়েছেন, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান, কিন্তু জনগণের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ।

লেবারের বর্তমান সংকটও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। এটি বহুদিন ধরে জমে থাকা এক আদর্শগত বিভ্রান্তির ফল। দলটি দীর্ঘদিন ধরে একই সঙ্গে উদারপন্থী শহুরে মধ্যবিত্ত এবং রক্ষণশীল শ্রমজীবী ভোটার—উভয়কে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সময় সেই ভারসাম্য কিছুটা কাজ করেছিল। কিন্তু আজকের ব্রিটেন আর ২০০০ সালের ব্রিটেন নয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিবাসন বিতর্ক, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন রাজনীতিকে নতুন আকার দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় লেবার এখনও পুরোনো ভাষায় কথা বলছে।

এই কারণেই স্টারমারের চারপাশে পুরোনো নেতাদের প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছে হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। গর্ডন ব্রাউন বা হ্যারিয়েট হারমানের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে অতীতের মুখগুলোর দিকে ফিরে তাকানো এমন এক দলের চিত্র তুলে ধরে, যারা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। এতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—লেবার কি সত্যিই নতুন ব্রিটেনের ভাষা বুঝতে পারছে?

Britain's Starmer weakened and Labour exposed in local elections | CBC News

রাজনীতিতে ভাষা শুধু বক্তব্য নয়, এটি শক্তির উৎস। স্টারমারের সমস্যা হলো তিনি এমন ভাষায় কথা বলেন, যা পরিমিত, নিরাপদ এবং প্রায় যান্ত্রিক। “পরিবর্তন”, “কর্মজীবী মানুষ”, “দায়িত্বশীল সরকার”—এই শব্দগুলো শুনতে ভালো লাগলেও এগুলোর ভেতরে আর কোনো আবেগ নেই। ভোটাররা অনুভব করছে এগুলো মুখস্থ বাক্য, বাস্তব বিশ্বাস নয়। এর বিপরীতে নাইজেল ফারাজের মতো নেতারা সরাসরি, আবেগপূর্ণ এবং সংঘর্ষমুখী ভাষা ব্যবহার করছেন। অনেকে তাঁর রাজনীতিকে বিপজ্জনক মনে করতে পারেন, কিন্তু তিনি অন্তত এমনভাবে কথা বলেন, যা মানুষের ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।

এখানেই মধ্যপন্থী রাজনীতির বড় সংকট। ইউরোপের বহু দেশে কেন্দ্রপন্থী দলগুলো একই সমস্যায় পড়েছে। তারা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সামাজিক উদ্বেগের ভাষা খুঁজে পায় না। ফলে জনতার একাংশ ডানপন্থী জনতাবাদে ঝুঁকছে, আরেক অংশ পরিবেশবাদী বা বিকল্প উদারপন্থী শক্তির দিকে চলে যাচ্ছে। ব্রিটেনে লেবারের বর্তমান অবস্থা সেই বৃহত্তর ইউরোপীয় প্রবণতারই অংশ।

স্টারমারের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কখনোই শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শনের নেতা ছিলেন না। তাঁর মূল শক্তি ছিল আত্মবিশ্বাস, প্রশাসনিক ভাবমূর্তি এবং কনজারভেটিভদের দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কেবল দক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমাজের গভীর অস্থিরতা মোকাবিলা করা যায় না। ব্রিটেন এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে মানুষ শুধু স্থিতিশীলতা নয়, অর্থবহ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও খুঁজছে।

স্থানীয় নির্বাচনের ফল তাই কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক শূন্যতার প্রতিফলন, যেখানে পুরোনো কেন্দ্রপন্থী ভাষা আর মানুষের উদ্বেগ ধারণ করতে পারছে না। স্টারমারের সংকট মূলত সেই বাস্তবতার প্রতীক। প্রশ্ন শুধু তিনি কতদিন টিকে থাকবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, লেবার কি আদৌ নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারবে, নাকি তারা অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আরও গভীর অপ্রাসঙ্গিকতার দিকে এগোবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম

স্টারমারের পতন শুধু এক নেতার নয়, ব্রিটিশ মধ্যপন্থী রাজনীতিরও সংকেত

০৮:০০:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ব্রিটিশ রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যে কোনো প্রধানমন্ত্রী এত দ্রুত নিজের রাজনৈতিক শক্তি, নৈতিক কর্তৃত্ব এবং জনসমর্থন হারিয়েছেন, যেমনটা ঘটছে কিয়ার স্টারমারের ক্ষেত্রে। মাত্র দুই বছর আগেও যিনি নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার স্থপতি হিসেবে ভাবছিলেন, এখন তিনি নিজের দলেই অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনের ফল শুধু একটি নির্বাচনী ধাক্কা নয়; এটি ছিল ব্রিটিশ মধ্যপন্থী রাজনীতির গভীর সংকটের প্রকাশ।

স্টারমারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো অর্থনীতি বা প্রশাসনে নয়, বরং রাজনৈতিক ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। তিনি এমন এক সময়ের নেতা, যখন রাজনীতি আর কেবল নীতিমালা বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি আবেগ, পরিচয়, নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্বের লড়াই। অথচ স্টারমার রাজনীতিকে দেখেছেন আইনি কাঠামো, প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিতে। ফলে তিনি ক্রমশ এমন এক নেতায় পরিণত হয়েছেন, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান, কিন্তু জনগণের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ।

লেবারের বর্তমান সংকটও ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। এটি বহুদিন ধরে জমে থাকা এক আদর্শগত বিভ্রান্তির ফল। দলটি দীর্ঘদিন ধরে একই সঙ্গে উদারপন্থী শহুরে মধ্যবিত্ত এবং রক্ষণশীল শ্রমজীবী ভোটার—উভয়কে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সময় সেই ভারসাম্য কিছুটা কাজ করেছিল। কিন্তু আজকের ব্রিটেন আর ২০০০ সালের ব্রিটেন নয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিবাসন বিতর্ক, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন রাজনীতিকে নতুন আকার দিয়েছে। সেই বাস্তবতায় লেবার এখনও পুরোনো ভাষায় কথা বলছে।

এই কারণেই স্টারমারের চারপাশে পুরোনো নেতাদের প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছে হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। গর্ডন ব্রাউন বা হ্যারিয়েট হারমানের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে অতীতের মুখগুলোর দিকে ফিরে তাকানো এমন এক দলের চিত্র তুলে ধরে, যারা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। এতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—লেবার কি সত্যিই নতুন ব্রিটেনের ভাষা বুঝতে পারছে?

Britain's Starmer weakened and Labour exposed in local elections | CBC News

রাজনীতিতে ভাষা শুধু বক্তব্য নয়, এটি শক্তির উৎস। স্টারমারের সমস্যা হলো তিনি এমন ভাষায় কথা বলেন, যা পরিমিত, নিরাপদ এবং প্রায় যান্ত্রিক। “পরিবর্তন”, “কর্মজীবী মানুষ”, “দায়িত্বশীল সরকার”—এই শব্দগুলো শুনতে ভালো লাগলেও এগুলোর ভেতরে আর কোনো আবেগ নেই। ভোটাররা অনুভব করছে এগুলো মুখস্থ বাক্য, বাস্তব বিশ্বাস নয়। এর বিপরীতে নাইজেল ফারাজের মতো নেতারা সরাসরি, আবেগপূর্ণ এবং সংঘর্ষমুখী ভাষা ব্যবহার করছেন। অনেকে তাঁর রাজনীতিকে বিপজ্জনক মনে করতে পারেন, কিন্তু তিনি অন্তত এমনভাবে কথা বলেন, যা মানুষের ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।

এখানেই মধ্যপন্থী রাজনীতির বড় সংকট। ইউরোপের বহু দেশে কেন্দ্রপন্থী দলগুলো একই সমস্যায় পড়েছে। তারা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সামাজিক উদ্বেগের ভাষা খুঁজে পায় না। ফলে জনতার একাংশ ডানপন্থী জনতাবাদে ঝুঁকছে, আরেক অংশ পরিবেশবাদী বা বিকল্প উদারপন্থী শক্তির দিকে চলে যাচ্ছে। ব্রিটেনে লেবারের বর্তমান অবস্থা সেই বৃহত্তর ইউরোপীয় প্রবণতারই অংশ।

স্টারমারের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কখনোই শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শনের নেতা ছিলেন না। তাঁর মূল শক্তি ছিল আত্মবিশ্বাস, প্রশাসনিক ভাবমূর্তি এবং কনজারভেটিভদের দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কেবল দক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমাজের গভীর অস্থিরতা মোকাবিলা করা যায় না। ব্রিটেন এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে মানুষ শুধু স্থিতিশীলতা নয়, অর্থবহ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাও খুঁজছে।

স্থানীয় নির্বাচনের ফল তাই কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক শূন্যতার প্রতিফলন, যেখানে পুরোনো কেন্দ্রপন্থী ভাষা আর মানুষের উদ্বেগ ধারণ করতে পারছে না। স্টারমারের সংকট মূলত সেই বাস্তবতার প্রতীক। প্রশ্ন শুধু তিনি কতদিন টিকে থাকবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, লেবার কি আদৌ নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারবে, নাকি তারা অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আরও গভীর অপ্রাসঙ্গিকতার দিকে এগোবে।