ভারতের আসামে চলতি সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। রাজ্যের ১৫টি জেলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিবসাগর জেলা। সেখানে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। ব্রহ্মপুত্র ও এর উপনদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ ও অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, চা-বাগান ও কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে এবং গুয়াহাটির আশপাশে ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে।
ব্রহ্মপুত্রের বন্যাপ্রবণ চরিত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসামের বন্যার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়। ব্রহ্মপুত্র বিশ্বের অন্যতম বেশি পলিবাহী নদী। তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম অতিক্রম করার সময় ৫০টিরও বেশি উপনদীর পানি এতে যুক্ত হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি, হিমালয়ের তুষারগলিত স্রোত এবং পাহাড়ি নদীর প্রবাহ একসঙ্গে নেমে এসে নদীটির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ও পলি সমতলে জমা হওয়ায় নদীর গতিপথ ও প্রবাহের ধরন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বন উজাড় ও ভূমিক্ষয়ের প্রভাব
গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক বন উজাড়ের কারণে ভূমিক্ষয় ও পলির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লাখিমপুর, বিশ্বনাথ ও ধেমাজির মতো জেলাগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। সামান্য থেকে মাঝারি বৃষ্টিতেও এখন ভূমিধস ও মাটিক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বন্যা নিয়ন্ত্রণে মূলত বাঁধ নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হলেও উজান এলাকায় মাটি সংরক্ষণ ও বন রক্ষায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
অতিবৃষ্টি ও জলবায়ুর প্রভাব
ভারতের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতপ্রবণ রাজ্যগুলোর একটি আসাম। বছরে গড়ে ২,৮০০ থেকে ৩,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যার প্রায় ৭০ শতাংশই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময়। বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্র বায়ু, অনুকূল ভূপ্রকৃতি এবং মৌসুমি আবহাওয়ার বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে এখানে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির তীব্রতা এবং বন্যার ভয়াবহতাও আগের তুলনায় বাড়ছে।
বাঁধ নির্মাণের সীমাবদ্ধতা
১৯৫০-এর দশক থেকে আসামে ব্রহ্মপুত্র ও এর উপনদীগুলোর তীরে ৪২৩টি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ২৯৫টি বাঁধ নির্ধারিত কার্যক্ষমতার মেয়াদ অতিক্রম করেছে। ফলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। গবেষকদের মতে, ব্রহ্মপুত্র একটি গতিপথ পরিবর্তনকারী নদী হওয়ায় শুধু বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আসামের বন্যায় অন্তত ৮৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েক দশকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে।
কী হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
বিশেষজ্ঞরা পুরো ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে একসঙ্গে বিবেচনায় রেখে সমন্বিত বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন। একই সঙ্গে বন্যাপ্রবণ এলাকায় ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত উঁচু প্ল্যাটফর্মের ঘরসহ স্থানীয় অভিযোজন পদ্ধতি পুনরুজ্জীবিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এদিকে আসাম সরকার জানিয়েছে, শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা প্রশমন পরিকল্পনার দিকেও তারা এগোচ্ছে। জোরাবাতে ১৫০ কোটি রুপির একটি বন্যা প্রশমন প্রকল্পসহ বাঁধ শক্তিশালী করা, নদীভাঙন রোধ, ড্রেনেজ উন্নয়ন, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার ওপর কাজ চলছে।
আসামে ভয়াবহ বন্যার পেছনে শুধু ব্রহ্মপুত্র নয়, বন উজাড়, অতিবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ। নতুন করে পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের বিকল্প নেই।
আসামে ভয়াবহ বন্যার কারণ, ব্রহ্মপুত্রের পলি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত জানুন। কেন প্রতি বছর এই সংকট আরও জটিল হচ্ছে, পড়ুন পূর্ণ প্রতিবেদন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















