ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপ শুধু কানাডার রপ্তানিকে চাপে ফেলেনি; এটি কানাডার বাণিজ্যনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতাকেও সামনে এনে দিয়েছে। বহু বছর ধরে অটো, ইস্পাত, কৃষিপণ্য কিংবা প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই কানাডা এমন একটি কৌশল অনুসরণ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সংযুক্তি বজায় রাখার পাশাপাশি অন্য বাজারে বৈচিত্র্য আনারও চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুই লক্ষ্যকে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক দেখিয়ে দিল, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণ এখন শুধু অর্থনৈতিক যুক্তির ওপর নির্ভর করছে না; জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক চাপও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে কানাডার জন্য প্রশ্নটি আর শুধু রপ্তানি বাড়ানোর নয়, বরং কোন বাজারে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে এবং সেই সম্পর্কের মূল্য কতটা—সেটি নির্ধারণ করার।
কয়েক বছর ধরেই কানাডা উপলব্ধি করেছে যে, একটি মাত্র বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। এই উপলব্ধি থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ, কৃষিপণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কমানো এবং নতুন বাণিজ্যিক সমঝোতা—এসব ছিল যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ।
কিন্তু এখানেই সৃষ্টি হয়েছে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। কারণ একই সময়ে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামোকে আরও ঘনিষ্ঠ করার আলোচনা চলছে, যেখানে অংশীদার দেশগুলোর তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে চাইলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করতে হতে পারে; আবার চীনের বাজারে সুযোগ বাড়াতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় পুরোনো ধরনের একক বাণিজ্যনীতি কার্যকর থাকার সুযোগ কমে যাচ্ছে। বিশ্বের অর্থনীতি আর একটি অভিন্ন বৈশ্বিক বাজার নয়; বরং ক্রমশ একাধিক ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক বলয়ে বিভক্ত হচ্ছে। প্রতিটি বলয়ের নিয়ম, ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক শর্তও আলাদা।
এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য কানাডার অর্থনীতির ভেতরকার বৈচিত্র্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষিপণ্য তুলনামূলকভাবে বিশ্ববাজারে সহজে বিক্রি করা যায়। পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলে এগুলোর ক্রেতা শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। ফলে এসব খাতে বাজার বৈচিত্র্য আনা বাস্তবসম্মত এবং কৌশলগতভাবে লাভজনক।

কিন্তু উৎপাদনশিল্পের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাড়ি, ইস্পাত বা যন্ত্রপাতির মতো শিল্পে ভৌগোলিক নৈকট্য, যৌথ সরবরাহব্যবস্থা এবং একই ধরনের মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বাজার তৈরি করা স্বল্পমেয়াদে প্রায় অসম্ভব। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি শুধু বাণিজ্যিক চাপ নয়; অনেক শিল্পের অস্তিত্বের প্রশ্নও তৈরি করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি। কানাডার বহু উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে চলে যায়। এতে অর্থনৈতিক লাভ এলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব, তথ্যনিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এই খাতে কেবল বাজারের হিসাব যথেষ্ট নয়; জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব খাতের ঝুঁকি আবার একই রকম নয়। উদাহরণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের কথা বলা যায়। এসব খনিজের বৈশ্বিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতার বড় অংশ একটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় সরবরাহব্যবস্থায় নতুন ধরনের কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই সমমনাদের নিয়ে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিটি খাতের জন্য একই নীতি নয়; বরং পৃথক কৌশল প্রয়োজন।
এই বাস্তবতা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্বায়নের অবসান ঘটছে না; বরং এটি নতুন রূপ নিচ্ছে। একসময়ের একক বৈশ্বিক বাজার এখন ধীরে ধীরে বহুস্তরীয় ও বহুকেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থায় রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রগুলোকে একই সঙ্গে একাধিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
কানাডার জন্য এর অর্থ হলো—একটি অভিন্ন বাণিজ্যনীতির পরিবর্তে বাজারভিত্তিক এবং খাতভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সরবরাহশৃঙ্খল অগ্রাধিকার পাবে, সেখানে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালিত হবে সুস্পষ্ট সীমারেখা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে।
এ কারণে উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন দায়িত্ব দিয়ে পুনর্গঠন করা যেতে পারে, যাতে তারা শুধু বাণিজ্য নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তনও সমন্বয় করতে পারে। একইভাবে চীনের সঙ্গে একটি স্থায়ী দ্বিপক্ষীয় কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে নিয়মিতভাবে সংবেদনশীল খাত, বিনিয়োগের শর্ত এবং উভয় দেশের অগ্রহণযোগ্য সীমারেখা নির্ধারণ করা হবে।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কের প্রকৃত বার্তা শুল্কের অঙ্কে নয়; বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পরিবর্তিত চরিত্রে। এটি কানাডাকে বাধ্য করছে পুরোনো নীতিগত দ্বৈততা থেকে বেরিয়ে আসতে। সামনে এগোতে হলে দেশটিকে এমন একটি নমনীয় বাণিজ্যকৌশল গড়ে তুলতে হবে, যা একদিকে উত্তর আমেরিকার বাস্তবতা মেনে চলবে, অন্যদিকে নতুন বৈশ্বিক বাজারেও স্বাধীনভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।
পরিবর্তিত বিশ্বে টিকে থাকার জন্য শুধু নতুন বাজার খোঁজাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি বাজারের জন্য আলাদা কৌশল, আলাদা প্রতিষ্ঠান এবং আলাদা রাজনৈতিক প্রস্তুতিও সমান অপরিহার্য।
জেফ মাহন 



















