যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর গত ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর থাকা অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক ২৪ জুলাই শেষ হচ্ছে। তবে এই শুল্কের মেয়াদ শেষ হলেও ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য অনিশ্চয়তা কাটছে না। কারণ, ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে একাধিক বিকল্প ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নতুন করে আরও বেশি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল কেনা অব্যাহত রাখার কারণে ভারতকে লক্ষ্য করে আরও কঠোর পদক্ষেপের আলোচনাও চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের আগের শুল্ক কাঠামোর আইনি ভিত্তি বাতিল করার পর ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২ অনুযায়ী এই অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ী এটি সাময়িক ব্যবস্থা হওয়ায় ২৪ জুলাই এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
ভারতীয় পণ্যের বর্তমান শুল্ক কাঠামো
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অধিকাংশ ভারতীয় পণ্যের ওপর স্বাভাবিক ‘মোস্ট ফেভার্ড নেশন’ (এমএফএন) শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত রয়েছে।
তবে সব পণ্যের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও সংশ্লিষ্ট ধাতব পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ এবং গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রয়েছে। এগুলো ২৪ জুলাইয়ের পরিবর্তনের আওতায় পড়ছে না।
অন্যদিকে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা প্রসেসিং যন্ত্র, ওষুধ, জ্বালানি পণ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো কয়েকটি খাত অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু স্মার্টফোন রপ্তানির মূল্য ছিল ১০.৯ বিলিয়ন ডলার এবং ওষুধ রপ্তানি ছিল ৯.৮ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৮৬.৫১ বিলিয়ন ডলার।
এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জেনেরিক ওষুধ আগামী ১ আগস্ট থেকে আরও দুই বছর শূন্য শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। এরপর এক বছরের জন্য ১০০ শতাংশ এবং পরে ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যাতে উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরে কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করা যায়।
ফেব্রুয়ারির চুক্তি কেন থেমে গেল
ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেখানে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে আরোপিত ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্কও প্রত্যাহারের কথা ছিল।
বিনিময়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় আকারে পণ্য কেনা এবং মার্কিন রপ্তানির জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বাতিল করায় ওই সমঝোতার বাস্তবায়ন থেমে যায়। এরপর থেকে দুই দেশ অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে গেলেও তা এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি।

নতুন তদন্ত ও সম্ভাব্য বাড়তি শুল্ক
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় দুটি তদন্ত চালাচ্ছে। একটি তদন্তে ভারতীয় পণ্যে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যদিও ভারত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরেকটি তদন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে, যার ফল এখনো প্রকাশ হয়নি।
এই দুটি তদন্তের ভিত্তিতে নতুন শুল্ক আরোপ হলে ভারত যে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেতে চেয়েছিল, তা কমে যেতে পারে। কারণ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের মতো কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ সব তদন্তের আওতায় নেই।
রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে নতুন চাপ
বাণিজ্য ইস্যুর বাইরে আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে উত্থাপিত একটি বিল অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহৎ ক্রেতা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বিলটির উদ্যোক্তারা ভারতের নামও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
যদিও বিলটি এখনো আইন হয়নি এবং প্রতিনিধি পরিষদে এর বিরোধিতাও রয়েছে, তবু এটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
২৪ জুলাইয়ের পর কী হতে পারে
বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি সম্ভাবনা সামনে রয়েছে। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক পুরোপুরি উঠে যেতে পারে, যদিও সেটিকে সবচেয়ে কম সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেসের অনুমোদনে বর্তমান শুল্কের মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। আবার সেকশন ৩০১-এর অধীনে নতুন শুল্ক চালু হতে পারে কিংবা কানাডার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থাও প্রয়োগ করা হতে পারে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত ভারতের ওপর আরও উচ্চ হারের শুল্ক কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে আলোচনার টেবিলে দ্রুত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
২৪ জুলাই শেষ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদ। তবে নতুন তদন্ত, বাণিজ্য আলোচনা ও রাশিয়ার তেল ইস্যু ভারতের রপ্তানিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















