১১:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা দামি গয়না খোঁজার নতুন ঠিকানা কি টিকটক? বদলে যাওয়া শরীরের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন, নতুন বাজার তৈরি করছে ওয়েলডান আমেরিকা কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত? কারখানার মেঝেতেই জাপানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল লড়াই ২৫ বছরেই শেষ ৫ লাখ ডলারের ক্যারিয়ার, ই-স্পোর্টসে বাড়ছে চোটের ভয়াবহতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এশিয়ার দিকে কানাডার নতুন বাণিজ্যযাত্রা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের হিসাব জটিল করতে প্রতিরক্ষা জোট বাড়াচ্ছে জাপান দুর্নীতির অভিযোগে ইউক্রেনের প্রধান কৌঁসুলির পদত্যাগ মেক্সিকোয় অস্ট্রেলীয় দুই সার্ফার ভাই হত্যার বিচার শুরু

রঙিন ডোরা আর রাবারের মুরগি—যেভাবে ফ্যাশন দুনিয়া জয় করলেন পল স্মিথ

ফ্যাশন দুনিয়ায় নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে সবসময় যে বিপুল অর্থ, জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী কিংবা বড় কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না, তার জীবন্ত উদাহরণ স্যার পল স্মিথ। রঙিন ডোরাকাটা নকশা, ব্রিটিশ পোশাকের ঐতিহ্য আর অসাধারণ রসবোধকে সঙ্গী করে তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বজোড়া ফ্যাশন সাম্রাজ্য। তবে তার সাফল্যের গল্পে যতটা আছে পোশাক, তার চেয়ে কম নয় হাসি, বন্ধুত্ব, সৌজন্য আর ধৈর্যের ভূমিকা।

রাবারের মুরগিই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের হাতিয়ার

লন্ডনে নিজের কার্যালয়ে বসে ৮০ বছর বয়সী পল স্মিথ হাতে তুলে নেন দুটি বড় রাবারের মুরগি। চেপে ধরতেই বিকট শব্দে ডাকতে শুরু করে সেগুলো। হাসতে হাসতে তিনি জানান, জাপানে তার সাফল্যের পেছনেও এই অদ্ভুত খেলনার ভূমিকা রয়েছে।

১৯৮২ সালে প্রথম জাপানে যাওয়ার সময় সেখানে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলার মতো ইংরেজিভাষী মানুষ ছিলেন খুবই কম। ফলে অঙ্গভঙ্গি, ছবি আঁকা এবং রসবোধ দিয়েই তাকে যোগাযোগ করতে হতো। বিকেল চারটার দিকে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি ব্যাগ থেকে রাবারের মুরগি বের করে সেটি চেপে ধরতেন। শব্দ শুনেই আশপাশের সবাই হেসে উঠতেন।

Sir Paul Smith's London office, showing clutter including a bicycle, clothing, books, trinkets and gifts (picture taken in 2015)

সেই হাসিই ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক সম্পর্ককে সহজ করে দেয়। প্রায় সাড়ে চার দশক পর জাপানে পল স্মিথের ২০টির বেশি দোকান রয়েছে। তার ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে।

প্রথম দোকানে আয় হয়েছিল মাত্র ৩৮ পাউন্ড

পল স্মিথের ফ্যাশনযাত্রা শুরু হয়েছিল পরিকল্পিত কোনো সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন নিয়ে নয়। ১৭ বছর বয়সে পেশাদার সাইক্লিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। এরপরই ধীরে ধীরে তার আগ্রহ তৈরি হয় পোশাক ও নকশার জগতে।

১৯৭০ সালে নটিংহামে তিনি খুলেছিলেন একটি ছোট্ট, জানালাবিহীন দোকান। প্রথম দিন বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৩৮ পাউন্ডের পণ্য। সেই বিক্রির বড় অংশই করেছিলেন তার স্ত্রী পলিন ডেনিয়ার—স্বামীকে খুশি করার জন্য।

সেখান থেকেই শুরু। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর সেই ছোট দোকানের ব্যবসা পরিণত হয়েছে ব্রিটেনের অন্যতম পরিচিত ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানে।

পল স্মিথের মতে, সাফল্যের জন্য তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। ধৈর্য ধরে ধীরে, সতর্কভাবে এগিয়ে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চাবিকাঠি।

উপহারের পাহাড় আর প্রতিদিনের ধন্যবাদ

পল স্মিথের লন্ডনের কার্যালয়ও যেন তার ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। বই, পোশাক, সাইকেল, ছবি, খেলনা, নানা স্মারক আর ভক্তদের পাঠানো বিচিত্র উপহারে ভরা তার ঘর।

Getty Images Pauline Smith and Sir Paul Smith attend the Garden Cocktail event celebrating the Opening of Maison Hermes New Bond Street store at The Hurlingham Club on June 16, 2026 in London, England.

প্রায় ৪৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের এক ভক্ত তাকে নানা অদ্ভুত জিনিস পাঠিয়ে আসছেন। কখনো প্লাস্টিকের হাঁস, কখনো অন্য কোনো খেলনা—কিন্তু কোনো চিঠি বা পরিচয় থাকে না। তাই কে পাঠাচ্ছেন, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানেন না পল।

তার সংগ্রহে রয়েছে নানা ধরনের যান্ত্রিক খেলনা, বাদাম দিয়ে তৈরি জন্মদৃশ্য এবং ক্রিস ফ্রুমের ফ্রান্সজয়ী সাইকেলও।

প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় সাঁতার কাটার পর তিনি ঠিকানা দেওয়া উপহারদাতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্টকার্ড লেখেন। তার বিশ্বাস, ব্যবসায় দীর্ঘদিন টিকে থাকতে ভালো আচরণ ও সৌজন্যের গুরুত্ব অপরিসীম।

জর্জ বেস্টের সঙ্গে অদ্ভুত বন্ধুত্ব

পল স্মিথের আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে বহু বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কিংবদন্তি ফুটবলার জর্জ বেস্ট।

সত্তরের দশকের শুরুতে দুজনের পরিচয়। বেস্ট তখন শিশুদের পোশাকের একটি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আর সেই পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন পল।

খ্যাতির চাপে বেস্ট প্রায়ই অস্বস্তিতে ভুগতেন। চারপাশের অনেক মানুষ বন্ধুত্বের নামে তার কাছে থাকলেও প্রকৃত বন্ধু ছিলেন না। তাই সপ্তাহের শেষ দিকে কখনো কখনো পলকে পাঠানো হতো তাকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসতে।

Getty Images British designer Paul Smith (C) acknowledges the audience at the end of the Paul Smith Menswear Spring/Summer 2018 show as part of Paris Fashion Week on June 25, 2017 in Paris, France.

লম্বা চুল আর মখমলের প্যান্ট পরা পল প্রতিষ্ঠানের গাড়ি নিয়ে বিমানবন্দরের বিশেষ অতিথি এলাকায় যেতেন। এরপর বেস্টকে নিয়ে আসতেন নিজের বাসায়। মজার বিষয় হলো, পল ফুটবল সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না। আর সেই কারণেই দুজনের বন্ধুত্ব এত সহজ হয়েছিল।

বেস্ট নাকি একসময় তাকে বলেছিলেন, তার সঙ্গে এভাবে আগে কেউ কথা বলেনি। দুজনে একসঙ্গে মাছ ও আলুর ভাজা খেতেন, গল্প করতেন।

ডেভিড বাউইয়ের সঙ্গেও ছিল গভীর বন্ধুত্ব

সংগীতজগতের সঙ্গেও পল স্মিথের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। একবার পল ম্যাকার্টনি তাকে শব্দপরীক্ষার পর নিজের হাতে তৈরি পনিরের স্যান্ডউইচ খাইয়েছিলেন।

তবে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বন্ধুত্বগুলোর একটি ছিল ডেভিড বাউইয়ের সঙ্গে। আশির দশক থেকে দুজনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব। বাউই ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী মানুষ। পল কোথায় কী বই রাখছেন, কী দেখছেন—সবকিছু নিয়েই তার আগ্রহ ছিল।

পরবর্তীতে বাউইয়ের শেষ অ্যালবামের সঙ্গে প্রকাশের জন্য একটি টি-শার্টের নকশাও তৈরি করেছিলেন পল। তখনই তিনি কিছুটা আঁচ করেছিলেন যে বাউই অসুস্থ। সুইজারল্যান্ডে তার ঘন ঘন যাতায়াতও পলের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।

পড়াশোনায় সমস্যা থাকলেও থামেননি

পল স্মিথের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার শৈশব। তিনি জানান, বিদ্যালয়জীবনে তার পাঠ-সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টি শনাক্ত হয়নি। ফলে বই পড়া তার কাছে কখনোই সহজ ছিল না।

১৯৯২ সালে একটি জনপ্রিয় বেতার অনুষ্ঠানে নিজের পছন্দের বই বলতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের একটি শিশুদের বার্ষিক সংকলন। কারণ সেখানে তার পছন্দের চরিত্র রজার দ্য ডজারের গল্পের ১৬টি পৃষ্ঠা ছিল।

Getty Images A three-way split showing three models (two male and one female, centre) wearing colourful Paul Smith designs on the catwalk

তবে পড়তে অসুবিধা তাকে কখনো নিজের ভাবনা প্রকাশ থেকে থামাতে পারেনি। বক্তৃতার সময় তিনি লিখিত বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলেন।

সেই রঙিন ডোরাই হয়ে উঠল পরিচয়ের প্রতীক

পল স্মিথের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য তার বহু রঙের ডোরাকাটা নকশা। ১৯৯২ সালের বসন্তের পোশাক সংগ্রহে প্রথম এই ডোরা ব্যবহার করা হয়েছিল। ক্রেতাদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে পরে সেটিই বারবার ফিরে আসে।

সময়ের সঙ্গে ডোরার রং ও বিন্যাসে এসেছে অসংখ্য পরিবর্তন। পল নিজেও মজা করে বলেন, একসময় ভাবতে হয়—একই ডোরার আর কত ধরনের বিন্যাস করা সম্ভব!

কিন্তু ৩৫ বছর ধরে সেই ডোরার জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, তার আশঙ্কার কারণ খুব একটা ছিল না।

এখনো দোকানের মেঝেতে দাঁড়ান পল

লন্ডনের প্রধান দোকানে এখনো সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা নিজে কাজ করেন পল স্মিথ। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন। কেউ কেউ প্রথমে বুঝতেই পারেন না, যার সঙ্গে কথা বলছেন তিনিই সেই পল স্মিথ।

Paul Smith Archives David Bowie pictured with Sir Paul Smith

পরিচয় জানার পর তাদের প্রতিক্রিয়াও বিচিত্র—কেউ বলেন, আশির দশক থেকেই তার দোকানে কেনাকাটা করেন, কেউ প্রশংসা করেন তার চশমার, আবার কেউ মজা করে বলেন, অন্তত এখন নিশ্চিত হওয়া গেল তিনি বাস্তব মানুষ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নন!

এভাবেই নিজের নামের ব্র্যান্ডের মাঝেও তিনি আজও একজন সাধারণ বিক্রেতার মতো ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। কারণ পোশাক সম্পর্কে তার জ্ঞান সরাসরি নিজের নকশা ও কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে।

সাফল্যের মন্ত্র—ধৈর্য, সৌজন্য আর আনন্দ

৮০ বছর বয়সে নিজের জীবন নিয়ে বই লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পল স্মিথ। বইটির নাম ‘থ্রেডস: মাই লাইফ ইন স্টাইল’। তরুণদের জন্য তার সবচেয়ে বড় বার্তা—সাফল্যের জন্য এক লাফে অনেক দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

তার নিজের জীবনও তার প্রমাণ। একটি ছোট জানালাবিহীন দোকান থেকে শুরু করে আজ বিশ্বের বহু দেশে পরিচিত একটি ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান—এই দীর্ঘ পথ তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।

রঙিন ডোরা তাকে পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সহজে মেশার ক্ষমতা, হাস্যরস, সৌজন্য, কৌতূহল এবং কাজের প্রতি ভালোবাসাই তাকে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

Paul Smith Archives Sir Paul Smith pictured with a bicycle in Tuscany in the mid 1990s

 

Sir Paul Smith showing BBC reporter Colin Paterson the walls of his London office, which are packed with artworks

 

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা

রঙিন ডোরা আর রাবারের মুরগি—যেভাবে ফ্যাশন দুনিয়া জয় করলেন পল স্মিথ

১০:৩২:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফ্যাশন দুনিয়ায় নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে সবসময় যে বিপুল অর্থ, জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী কিংবা বড় কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না, তার জীবন্ত উদাহরণ স্যার পল স্মিথ। রঙিন ডোরাকাটা নকশা, ব্রিটিশ পোশাকের ঐতিহ্য আর অসাধারণ রসবোধকে সঙ্গী করে তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বজোড়া ফ্যাশন সাম্রাজ্য। তবে তার সাফল্যের গল্পে যতটা আছে পোশাক, তার চেয়ে কম নয় হাসি, বন্ধুত্ব, সৌজন্য আর ধৈর্যের ভূমিকা।

রাবারের মুরগিই হয়ে উঠেছিল সাফল্যের হাতিয়ার

লন্ডনে নিজের কার্যালয়ে বসে ৮০ বছর বয়সী পল স্মিথ হাতে তুলে নেন দুটি বড় রাবারের মুরগি। চেপে ধরতেই বিকট শব্দে ডাকতে শুরু করে সেগুলো। হাসতে হাসতে তিনি জানান, জাপানে তার সাফল্যের পেছনেও এই অদ্ভুত খেলনার ভূমিকা রয়েছে।

১৯৮২ সালে প্রথম জাপানে যাওয়ার সময় সেখানে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলার মতো ইংরেজিভাষী মানুষ ছিলেন খুবই কম। ফলে অঙ্গভঙ্গি, ছবি আঁকা এবং রসবোধ দিয়েই তাকে যোগাযোগ করতে হতো। বিকেল চারটার দিকে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তিনি ব্যাগ থেকে রাবারের মুরগি বের করে সেটি চেপে ধরতেন। শব্দ শুনেই আশপাশের সবাই হেসে উঠতেন।

Sir Paul Smith's London office, showing clutter including a bicycle, clothing, books, trinkets and gifts (picture taken in 2015)

সেই হাসিই ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক সম্পর্ককে সহজ করে দেয়। প্রায় সাড়ে চার দশক পর জাপানে পল স্মিথের ২০টির বেশি দোকান রয়েছে। তার ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে।

প্রথম দোকানে আয় হয়েছিল মাত্র ৩৮ পাউন্ড

পল স্মিথের ফ্যাশনযাত্রা শুরু হয়েছিল পরিকল্পিত কোনো সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন নিয়ে নয়। ১৭ বছর বয়সে পেশাদার সাইক্লিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। এরপরই ধীরে ধীরে তার আগ্রহ তৈরি হয় পোশাক ও নকশার জগতে।

১৯৭০ সালে নটিংহামে তিনি খুলেছিলেন একটি ছোট্ট, জানালাবিহীন দোকান। প্রথম দিন বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৩৮ পাউন্ডের পণ্য। সেই বিক্রির বড় অংশই করেছিলেন তার স্ত্রী পলিন ডেনিয়ার—স্বামীকে খুশি করার জন্য।

সেখান থেকেই শুরু। পাঁচ দশকের বেশি সময় পর সেই ছোট দোকানের ব্যবসা পরিণত হয়েছে ব্রিটেনের অন্যতম পরিচিত ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানে।

পল স্মিথের মতে, সাফল্যের জন্য তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। ধৈর্য ধরে ধীরে, সতর্কভাবে এগিয়ে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের চাবিকাঠি।

উপহারের পাহাড় আর প্রতিদিনের ধন্যবাদ

পল স্মিথের লন্ডনের কার্যালয়ও যেন তার ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। বই, পোশাক, সাইকেল, ছবি, খেলনা, নানা স্মারক আর ভক্তদের পাঠানো বিচিত্র উপহারে ভরা তার ঘর।

Getty Images Pauline Smith and Sir Paul Smith attend the Garden Cocktail event celebrating the Opening of Maison Hermes New Bond Street store at The Hurlingham Club on June 16, 2026 in London, England.

প্রায় ৪৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের এক ভক্ত তাকে নানা অদ্ভুত জিনিস পাঠিয়ে আসছেন। কখনো প্লাস্টিকের হাঁস, কখনো অন্য কোনো খেলনা—কিন্তু কোনো চিঠি বা পরিচয় থাকে না। তাই কে পাঠাচ্ছেন, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানেন না পল।

তার সংগ্রহে রয়েছে নানা ধরনের যান্ত্রিক খেলনা, বাদাম দিয়ে তৈরি জন্মদৃশ্য এবং ক্রিস ফ্রুমের ফ্রান্সজয়ী সাইকেলও।

প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় সাঁতার কাটার পর তিনি ঠিকানা দেওয়া উপহারদাতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্টকার্ড লেখেন। তার বিশ্বাস, ব্যবসায় দীর্ঘদিন টিকে থাকতে ভালো আচরণ ও সৌজন্যের গুরুত্ব অপরিসীম।

জর্জ বেস্টের সঙ্গে অদ্ভুত বন্ধুত্ব

পল স্মিথের আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে বহু বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্প। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কিংবদন্তি ফুটবলার জর্জ বেস্ট।

সত্তরের দশকের শুরুতে দুজনের পরিচয়। বেস্ট তখন শিশুদের পোশাকের একটি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আর সেই পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন পল।

খ্যাতির চাপে বেস্ট প্রায়ই অস্বস্তিতে ভুগতেন। চারপাশের অনেক মানুষ বন্ধুত্বের নামে তার কাছে থাকলেও প্রকৃত বন্ধু ছিলেন না। তাই সপ্তাহের শেষ দিকে কখনো কখনো পলকে পাঠানো হতো তাকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসতে।

Getty Images British designer Paul Smith (C) acknowledges the audience at the end of the Paul Smith Menswear Spring/Summer 2018 show as part of Paris Fashion Week on June 25, 2017 in Paris, France.

লম্বা চুল আর মখমলের প্যান্ট পরা পল প্রতিষ্ঠানের গাড়ি নিয়ে বিমানবন্দরের বিশেষ অতিথি এলাকায় যেতেন। এরপর বেস্টকে নিয়ে আসতেন নিজের বাসায়। মজার বিষয় হলো, পল ফুটবল সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না। আর সেই কারণেই দুজনের বন্ধুত্ব এত সহজ হয়েছিল।

বেস্ট নাকি একসময় তাকে বলেছিলেন, তার সঙ্গে এভাবে আগে কেউ কথা বলেনি। দুজনে একসঙ্গে মাছ ও আলুর ভাজা খেতেন, গল্প করতেন।

ডেভিড বাউইয়ের সঙ্গেও ছিল গভীর বন্ধুত্ব

সংগীতজগতের সঙ্গেও পল স্মিথের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। একবার পল ম্যাকার্টনি তাকে শব্দপরীক্ষার পর নিজের হাতে তৈরি পনিরের স্যান্ডউইচ খাইয়েছিলেন।

তবে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বন্ধুত্বগুলোর একটি ছিল ডেভিড বাউইয়ের সঙ্গে। আশির দশক থেকে দুজনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব। বাউই ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী মানুষ। পল কোথায় কী বই রাখছেন, কী দেখছেন—সবকিছু নিয়েই তার আগ্রহ ছিল।

পরবর্তীতে বাউইয়ের শেষ অ্যালবামের সঙ্গে প্রকাশের জন্য একটি টি-শার্টের নকশাও তৈরি করেছিলেন পল। তখনই তিনি কিছুটা আঁচ করেছিলেন যে বাউই অসুস্থ। সুইজারল্যান্ডে তার ঘন ঘন যাতায়াতও পলের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।

পড়াশোনায় সমস্যা থাকলেও থামেননি

পল স্মিথের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার শৈশব। তিনি জানান, বিদ্যালয়জীবনে তার পাঠ-সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টি শনাক্ত হয়নি। ফলে বই পড়া তার কাছে কখনোই সহজ ছিল না।

১৯৯২ সালে একটি জনপ্রিয় বেতার অনুষ্ঠানে নিজের পছন্দের বই বলতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের একটি শিশুদের বার্ষিক সংকলন। কারণ সেখানে তার পছন্দের চরিত্র রজার দ্য ডজারের গল্পের ১৬টি পৃষ্ঠা ছিল।

Getty Images A three-way split showing three models (two male and one female, centre) wearing colourful Paul Smith designs on the catwalk

তবে পড়তে অসুবিধা তাকে কখনো নিজের ভাবনা প্রকাশ থেকে থামাতে পারেনি। বক্তৃতার সময় তিনি লিখিত বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলেন।

সেই রঙিন ডোরাই হয়ে উঠল পরিচয়ের প্রতীক

পল স্মিথের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য তার বহু রঙের ডোরাকাটা নকশা। ১৯৯২ সালের বসন্তের পোশাক সংগ্রহে প্রথম এই ডোরা ব্যবহার করা হয়েছিল। ক্রেতাদের ব্যাপক আগ্রহের কারণে পরে সেটিই বারবার ফিরে আসে।

সময়ের সঙ্গে ডোরার রং ও বিন্যাসে এসেছে অসংখ্য পরিবর্তন। পল নিজেও মজা করে বলেন, একসময় ভাবতে হয়—একই ডোরার আর কত ধরনের বিন্যাস করা সম্ভব!

কিন্তু ৩৫ বছর ধরে সেই ডোরার জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, তার আশঙ্কার কারণ খুব একটা ছিল না।

এখনো দোকানের মেঝেতে দাঁড়ান পল

লন্ডনের প্রধান দোকানে এখনো সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা নিজে কাজ করেন পল স্মিথ। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন। কেউ কেউ প্রথমে বুঝতেই পারেন না, যার সঙ্গে কথা বলছেন তিনিই সেই পল স্মিথ।

Paul Smith Archives David Bowie pictured with Sir Paul Smith

পরিচয় জানার পর তাদের প্রতিক্রিয়াও বিচিত্র—কেউ বলেন, আশির দশক থেকেই তার দোকানে কেনাকাটা করেন, কেউ প্রশংসা করেন তার চশমার, আবার কেউ মজা করে বলেন, অন্তত এখন নিশ্চিত হওয়া গেল তিনি বাস্তব মানুষ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নন!

এভাবেই নিজের নামের ব্র্যান্ডের মাঝেও তিনি আজও একজন সাধারণ বিক্রেতার মতো ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। কারণ পোশাক সম্পর্কে তার জ্ঞান সরাসরি নিজের নকশা ও কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে।

সাফল্যের মন্ত্র—ধৈর্য, সৌজন্য আর আনন্দ

৮০ বছর বয়সে নিজের জীবন নিয়ে বই লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পল স্মিথ। বইটির নাম ‘থ্রেডস: মাই লাইফ ইন স্টাইল’। তরুণদের জন্য তার সবচেয়ে বড় বার্তা—সাফল্যের জন্য এক লাফে অনেক দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

তার নিজের জীবনও তার প্রমাণ। একটি ছোট জানালাবিহীন দোকান থেকে শুরু করে আজ বিশ্বের বহু দেশে পরিচিত একটি ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান—এই দীর্ঘ পথ তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।

রঙিন ডোরা তাকে পরিচিতি দিয়েছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সহজে মেশার ক্ষমতা, হাস্যরস, সৌজন্য, কৌতূহল এবং কাজের প্রতি ভালোবাসাই তাকে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

Paul Smith Archives Sir Paul Smith pictured with a bicycle in Tuscany in the mid 1990s

 

Sir Paul Smith showing BBC reporter Colin Paterson the walls of his London office, which are packed with artworks