ভিডিও গেমকে অনেকেই বসে বসে কাটানো সময় হিসেবে দেখেন। কিন্তু পেশাদার ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের জন্য এই খেলা ক্রমেই এমন এক পেশায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে দীর্ঘ সময়ের অনুশীলন, একটানা বসে থাকা, হাতের দ্রুত ও পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া এবং মানসিক চাপ শরীরের ওপর বড় ধরনের ক্ষতি ফেলতে পারে। ফলে খেলোয়াড়দের অকাল অবসর ঠেকাতে এখন অনেক দলকেই চিকিৎসক, শারীরিক প্রশিক্ষক ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ নিয়ে আলাদা সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে।
২৫ বছরেই থেমে গেল উজির ক্যারিয়ার
চীনের জনপ্রিয় ই-স্পোর্টস খেলোয়াড় জিয়ান ‘উজি’ জি-হাও ছিলেন লিগ অব লিজেন্ডসের অন্যতম সেরা তারকা। তার অসাধারণ দক্ষতাকে কেন্দ্র করেই দল কৌশল সাজাত। প্রতিযোগিতামূলক খেলায় তিনি পাঁচ লাখ ডলারেরও বেশি পুরস্কার অর্থ আয় করেছিলেন।
কিন্তু ২০২০ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে দীর্ঘদিনের কবজি ও বাহুর সমস্যার কারণে তাকে অবসর নিতে হয়। একই সঙ্গে তার ডায়াবেটিসও ছিল। একজন শীর্ষ খেলোয়াড়ের এমন অকাল বিদায় ই-স্পোর্টসে শারীরিক চোটের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলনের মূল্য
সেরা ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের নিয়মিত অনুশীলন, দলীয় প্রস্তুতি এবং প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অংশ নিতে হয়। দক্ষতা বাড়াতে অনেক খেলোয়াড় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার সামনে কাটান।

এই দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপও কম নয়। ২০২১ সালে পর্তুগালের ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩৭ শতাংশ খেলোয়াড় উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সমস্যায় ভুগেছেন। ৪৫ শতাংশের মধ্যে দেখা গেছে ঘুমের ব্যাঘাত।
শুধু মানসিক চাপ নয়, চোখ ও পেশি-হাড়ের সমস্যাও ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের মধ্যে সাধারণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে ক্লান্তি তৈরি হয় এবং কাছের বা নির্দিষ্ট দূরত্বের বস্তুতে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাও কমতে পারে। পর্দার আলো ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটিয়ে ঘুমের সমস্যাও বাড়াতে পারে।
কবজি, আঙুল ও বৃদ্ধাঙ্গুলিতে বড় ঝুঁকি
দ্রুতগতিতে বারবার বোতাম চাপা, মাউস চালানো কিংবা কিবোর্ড ব্যবহারের কারণে খেলোয়াড়দের হাত ও কবজিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ পড়ে। এর ফলে কবজির স্নায়ু চাপে পড়া, টেন্ডনে প্রদাহ এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই ধরনের চোট শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক হাতের নড়াচড়া কারখানার সমাবেশ লাইনে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা যায়।
দীর্ঘ সময় বসে থাকার বিপদ
ই-স্পোর্টসের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকা। অনেক খেলোয়াড় বিরতি ছাড়াই তিন ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় চেয়ারে বসে থাকতে পারেন। এতে কোমর ও মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং পিঠের ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে।
এর চেয়েও গুরুতর ঝুঁকি হলো গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা। দীর্ঘ সময় নড়াচড়া না করলে পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত ফুসফুসে পৌঁছালে তা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

২০১১ সালে ব্রিটিশ খেলোয়াড় ক্রিস স্ট্যানিফোর্থ এমন একটি জটিলতায় মারা যান। তিনি একটানা প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভিডিও গেম খেলতেন।
বদলে যাচ্ছে ই-স্পোর্টস দলের চিকিৎসাব্যবস্থা
ই-স্পোর্টসের চোট নিয়ে গবেষণা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। শীর্ষ দলগুলো এখন খেলোয়াড়দের জন্য শারীরিক চিকিৎসক, মানসিক কর্মক্ষমতা বিশেষজ্ঞ, ক্রীড়া প্রশিক্ষক এবং ম্যাসাজ থেরাপিস্ট নিয়োগ করছে।
অনেক দল খেলোয়াড়দের একসঙ্গে শরীরচর্চায় যুক্ত করছে। এতে দলের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন ভালো হয়, তেমনি চোটের ঝুঁকিও কমে। প্রতিযোগিতার সময় মেরুদণ্ড, হাত ও পায়ের সঠিক অবস্থান বজায় রাখাও এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখতে উপযোগী চেয়ার ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, শরীরের নড়াচড়া বাড়ানোর অনুশীলন এবং হাত-পায়ের পেশি প্রসারণের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
খেলোয়াড়ের চেয়ে যেন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর সঙ্গে বেশি মিল
ই-স্পোর্টস মূলধারায় জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকেই এটিকে ফুটবল বা বাস্কেটবলের মতো প্রচলিত খেলাধুলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু চোট প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের বাদ্যযন্ত্রশিল্পী বা নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে তুলনা করা আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
কারণ একজন পিয়ানোবাদক ও একজন পেশাদার খেলোয়াড়—দুজনকেই দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়, হাতের সূক্ষ্ম ও দ্রুত নড়াচড়া করতে হয় এবং অনেক সময় সরাসরি প্রশিক্ষকের নির্দেশনা ছাড়াই নিজেদের দক্ষতা ধরে রাখতে হয়।
গবেষণায় ই-স্পোর্টস খেলোয়াড় ও পিয়ানোবাদকদের বাহুর পেশিতে ক্লান্তির ধরনেও মিল পাওয়া গেছে। ফলে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের জন্য ব্যবহৃত হাতের উষ্ণায়ন বা প্রস্তুতিমূলক অনুশীলন ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে কি না, তা নিয়ে আরও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
ফেকারের ফিরে আসা দেখাচ্ছে আশার পথ
ই-স্পোর্টসের শারীরিক চোট যে ক্যারিয়ারের শেষ কথা নয়, তার উদাহরণও রয়েছে। ২০২৩ সালে লিগ অব লিজেন্ডসের তারকা লি ‘ফেকার’ সাং-হিয়ক বাহু ও হাতের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট একটি স্নায়ুর সমস্যায় খেলতে পারেননি।
চিকিৎসার অংশ হিসেবে তার খেলার ভঙ্গি পরিবর্তন এবং নিবিড় শারীরিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রায় এক মাস পর তিনি আবার প্রতিযোগিতায় ফিরতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে তিনি টানা তিনটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও সহায়তা ব্যবস্থার কারণে তার পুরোনো চোটও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
ই-স্পোর্টস যত বড় পেশা ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—শুধু দক্ষতা দিয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিশ্চিত করা যায় না। খেলোয়াড়দের শরীর ও মনের যত্ন, সঠিক বিশ্রাম, ব্যায়াম এবং চোট প্রতিরোধের ব্যবস্থা এখন এই পেশার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আগামী অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে লিগ অব লিজেন্ডসের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হওয়ার কথা। সেখানে ফেকারের মতো তারকারা আবারও মাঠে নামবেন। তবে তাদের সাফল্যের পেছনে শুধু খেলার দক্ষতা নয়, সুস্থ শরীর ধরে রাখার বিজ্ঞানও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, ই-স্পোর্টসের সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেটিই দেখাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















