মার্কিন চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভালো সুযোগের আশায় এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে কর্মীদের মধ্যে। একই সময়ে নিয়োগ ও ছাঁটাই—দুটিই কম থাকায় বাজারে তৈরি হয়েছে এক ধরনের স্থবিরতা।
চাকরি আঁকড়ে থাকছেন কর্মীরা
বর্তমানে মার্কিন কর্মীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিজেদের চাকরি ধরে রাখতে চাইছেন। চাকরি ছাড়ার হার ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সংকটের পরের সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। নিয়োগের হারও একইভাবে কম। শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে ভালো সুযোগ কম থাকায় কর্মীরা বর্তমান চাকরি ছাড়তে চাইছেন না।
দেশটিতে এখন মাসে গড়ে প্রায় ৮০ হাজার নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে। আগস্টে ১ লাখ ৬২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৫ সালে মাসে গড়ে মাত্র ১০ হাজার চাকরি তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের তুলনায় বর্তমান কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি এখনো কম।
নতুন সুযোগের দরজা খুলছে না
শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত ও দাপ্তরিক পেশার কর্মীদের মধ্যে চাকরি বদলের প্রবণতা কমেছে। ফলে একজন কর্মী চাকরি না ছাড়লে সেই পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিকে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রম অর্থনীতিবিদ বেটসি স্টিভেনসন একটি রেস্তোরাঁর উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। সব টেবিল আগে থেকেই ভর্তি থাকলে বাইরে অপেক্ষা করা নতুন অতিথিদের বসার সুযোগ আসে না। তেমনি কর্মীরা বর্তমান পদ ছাড়তে না চাইলে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য নতুন পদও তৈরি হয় না।
চাকরি বদলের বদলে নিজেকে অপরিহার্য করছেন অনেকে
কয়েক বছর আগেও বেশি বেতন ও উন্নত ক্যারিয়ারের আশায় প্রতিষ্ঠান বদলানোকে অনেকেই স্বাভাবিক ক্যারিয়ার কৌশল হিসেবে দেখতেন। এখন সেই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান চাকরিতে টিকে থাকাকেই অনেক কর্মী বেশি নিরাপদ ও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযুক্তি খাতের লেখক কিম পোহাস এমন একটি চাকরির সুযোগ দেখেও আবেদন করেননি, যেটিকে একসময় তিনি স্বপ্নের চাকরি মনে করতেন। বর্তমান প্রতিষ্ঠানে তিনি ভালো বেতন, মূল্যায়ন ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। একই সময়ে পরিচিতদের চাকরি হারানোর খবর তাকে ঝুঁকি নিতে আরও নিরুৎসাহিত করেছে।
বরং নিজের চাকরির নিরাপত্তা বাড়াতে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রোগ্রাম তৈরির সরঞ্জাম শেখেন এবং প্রতিষ্ঠানের একটি সফটওয়্যার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। এর ফলও পেয়েছেন—আগামী মাস থেকে তার পদোন্নতি কার্যকর হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও নির্মাণে কর্মসংস্থান বাড়ছে
চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রে যে নতুন চাকরিগুলো তৈরি হয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এসেছে স্বাস্থ্যসেবা খাত থেকে। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের বাড়তি চাহিদায় নির্মাণ খাতেও কর্মসংস্থান বেড়েছে। শুল্ক নিয়ে উদ্বেগের কারণে গত বছর কর্মী হারানো উৎপাদন খাতও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সামগ্রিক বেকারত্বের হার রয়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশে।
তবে উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন। এসব পেশায় কর্মী বদলের হার কম হওয়ায় নতুন পদ খালি হয় কম। বিশেষ করে অভিজ্ঞ কর্মীরা যখন আরও উচ্চপদ খুঁজছেন, তখন তাদের জন্য সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
দীর্ঘদিন ধরে চাকরি খুঁজছেন লাখো মানুষ
প্রায় ২০ লাখ মার্কিন নাগরিক অন্তত ছয় মাস ধরে চাকরির বাজারে আটকে আছেন। আগস্টে বেকারদের মধ্যে ২৭ শতাংশ ২৭ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে চাকরি খুঁজছিলেন। দুই বছর আগে এই হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ।
চাকরিপ্রার্থীদের হতাশার আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে জনমত জরিপে। আগস্টে কর্মরত ও চাকরি খুঁজছেন—এমন মানুষের মাত্র ৩৩ শতাংশ মনে করেছেন, মানসম্মত চাকরি খোঁজার জন্য সময়টি ভালো।
দীর্ঘ চাকরি খোঁজার অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে মানসিকতা
আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে ট্রেক্স দেশাইয়ের নয় মাস সময় লেগেছিল। তিনি ২০০টির বেশি চাকরির আবেদন করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত চাকরি পাওয়ার পর এখন তিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সম্পর্ক গড়ে তোলা, সহকর্মীদের সহযোগিতা করা এবং শিল্পের নতুন পরিবর্তন সম্পর্কে নিজেকে হালনাগাদ রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন।
তরুণদের ওপরও এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। অতীতে প্রতিষ্ঠান বদলের মাধ্যমে বেতন বাড়ানোর সুযোগ তরুণ কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন সেই পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।
২৫ বছর বয়সী মারিয়েম ব্যারিও বর্তমান চাকরি ছাড়তে চান না। তিনি কাজটিতে চ্যালেঞ্জ ও সহায়তা দুটোই পাচ্ছেন, বাড়ি থেকে কাজ করতে পারছেন এবং ভ্রমণের জন্য ছুটিও পাচ্ছেন। বেশি বেতন ভবিষ্যতে তার লক্ষ্য হলেও এই মুহূর্তে বর্তমান চাকরির নিরাপত্তাকেই তিনি বেশি মূল্য দিচ্ছেন।
মার্কিন চাকরির বাজারের এই চিত্র তাই একটি নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে—চাকরি পাওয়ার চেয়ে চাকরি ধরে রাখাই এখন অনেক কর্মীর কাছে বড় অগ্রাধিকার। নতুন সুযোগের অপেক্ষায় থাকা চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও এর অর্থ হলো, কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশের পথ আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















