মার্কিন ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে। ইরানের একটি মার্কিন নৌযানে হামলার চেষ্টার প্রতিশোধ হিসেবে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরপরই ইরান জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৮টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
মার্কিন হামলায় পাঁচ তেলবাহী জাহাজ
মঙ্গলবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ওমান উপসাগরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির ব্যবহৃত চারটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করা হয়েছে। আরেকটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও খার্গ দ্বীপ ও দক্ষিণ উপকূলের জাস্ক বন্দরের কাছে ইরানি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন হামলার খবর প্রচার করেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, হামলার লক্ষ্যবস্তু জাহাজগুলো আইআরজিসি ও এর আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে ব্যবহৃত বহু বিলিয়ন ডলারের একটি ‘ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ। ওয়াশিংটনের দাবি, এর আগে দুই দিনে দুইবার মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পরই মঙ্গলবারের হামলা চালানো হয়।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন হামলার পর আইআরজিসি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। কুয়েত ও বাহরাইনের আশপাশে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোর ক্রুদের সরে যাওয়ারও সতর্কতা দেওয়া হয়। ওই দুই দেশেই মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ‘ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা’ চালিয়েছে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ারে হামলা করেছে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাৎক্ষণিকভাবে এসব দাবি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বুধবার ভোরে জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ১৮টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এর মধ্যে দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে সংঘাত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, ইরানের প্রতি দুইটি জাহাজে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি জাহাজে আঘাত করবে। অন্যদিকে, ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যাহত করার মাধ্যমে নিজেদের অন্যতম বড় কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
গত শনিবারও দুই দেশ একে অপরের জাহাজে হামলার দাবি করেছিল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, ইরানি হামলার চেষ্টার জবাবে তারা তিনটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে আঘাত করেছে। পরে ইরান মার্কিন জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার দায় স্বীকার করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে আরও ছয়টি জাহাজে হামলার দাবি করে।
ড্রোন নিয়েও পাল্টাপাল্টি দাবি
মঙ্গলবারের তেলবাহী জাহাজে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন চালকবিহীন ডুবোযান জব্দ করার দাবি করে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ সময় গভীর সমুদ্রে নজরদারি ও মাইন শনাক্ত করার মতো কাজে ব্যবহারের জন্য যানটি তৈরি করা হয়েছিল।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত একটি মার্কিন ডুবো ড্রোন এক দিনেরও বেশি আগে ত্রুটির কারণে বিকল হয়েছিল। তাঁর দাবি, এটি পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ মডেলের ড্রোন, যাতে সংবেদনশীল তথ্য বা শ্রেণিবদ্ধ কোনো সরঞ্জাম ছিল না। ইরান সেটি জব্দ করেছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
অর্থনৈতিক চাপের কৌশলেও বাধা
ইরানের ওপর সামরিক চাপ থেকে অর্থনৈতিক চাপের দিকে কৌশল বদলানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ কার্যকর করা এবং তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, এই কৌশল বাস্তবায়ন কতটা কঠিন। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা জটিল, আর এর ফলে চীনসহ ইরানের মিত্র ও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় প্রায় এক মাস শান্ত থাকার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আবারও তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছিল, যাতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি হয় এবং একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















