জার্মান রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে ‘ফায়ারওয়াল’ বা রাজনৈতিক প্রতিরোধক দেয়ালকে উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হয়েছে, সেটিই এখন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্যাক্সনি-আনহাল্টের সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল সেই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। সেখানে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সংখ্যাটি শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনী ফল নয়; এটি জার্মানির প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি জমে থাকা অসন্তোষেরও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
এএফডির বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে দলটিকে চরম ডানপন্থী কিংবা ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। দলটির রাজনৈতিক শিকড়, এর কিছু সদস্যের বিতর্কিত অবস্থান এবং নানা উগ্র বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন থাকার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেখান থেকে এএফডিকে ভোট দেওয়া প্রত্যেক মানুষকে উগ্র মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে বিবেচনা করা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক সরলীকরণ।
কারণ নির্বাচনে ভোট দেওয়া মানুষের বড় অংশই কোনো চরম রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তারা সাধারণ নাগরিক—যাদের জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, অর্থনীতি কিংবা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেই উদ্বেগকে উপহাস করে বা ভোটারদের অজ্ঞ কিংবা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখিয়ে মূলধারার দলগুলো তাদের মন জয় করতে পারবে না।
ভোটারকে অবজ্ঞা করলে ডানপন্থাই লাভবান হয়

এই প্রবণতা শুধু জার্মানির সমস্যা নয়। ব্রিটেনে ব্রেক্সিটের পর এবং বর্তমানে রিফর্ম পার্টির সমর্থকদের নিয়েও একই ধরনের তাচ্ছিল্য দেখা যায়। কোনো ভোটারকে তার পছন্দের কারণে হেয় করা হলে সে সাধারণত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে না। বরং মূলধারার রাজনীতির প্রতি তার অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।
অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ, অবৈধ অভিবাসন বন্ধের দাবি কিংবা দ্রুত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে অস্বস্তিকে কেবল অসহিষ্ণুতা বা উগ্রতার লক্ষণ হিসেবে দেখলে বাস্তব সমস্যাগুলো আড়াল হয়ে যায়। রাজনীতির কাজ হলো এসব উদ্বেগের কারণ খুঁজে দেখা এবং কার্যকর উত্তর দেওয়া। ভোটারকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া নয়।
ফ্রান্সের অভিজ্ঞতাও একই সতর্কবার্তা দেয়। ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জ্যাক শিরাকের কাছে জ্যঁ-মারি ল্য পেন মাত্র ১৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। শিরাকের ৮২ শতাংশ ভোট নিঃসন্দেহে ছিল বিশাল জয়। কিন্তু সেই ফলাফলের অন্য দিকটি ছিল—একটি কঠোর ডানপন্থী দলের পক্ষে ১৮ শতাংশ ভোটার দাঁড়িয়েছিলেন। তখন যদি সেই ভোটারদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, পরবর্তী উত্থান হয়তো এত দ্রুত ঘটত না।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে এগোয়। ২০১৭ সালে ল্য পেনের মেয়ে মেরিন ল্য পেন প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়ে ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছান। ২০২২ সালে ন্যাশনাল র্যালি নামে পুনর্গঠিত দলটির ভোট আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ শতাংশে। এখন তিনি আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত।
জার্মানিতেও একই আত্মতুষ্টির ঝুঁকি
জার্মানির প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করেছে, এএফডির সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করার যে ‘ব্রান্ডমাউয়ার’ বা রাজনৈতিক দেয়াল রয়েছে, সেটি যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফল সেই আত্মবিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

কেউ বলতে পারেন, এটি তুলনামূলক ছোট একটি রাজ্য এবং এএফডি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দলটি সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তিনটি আসন পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু এমন যুক্তি দিয়ে নির্বাচনের তাৎপর্য এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। বিশেষ করে ভোটার উপস্থিতি যখন রেকর্ড ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ভোটার ছাড়া প্রায় সব বয়সী গোষ্ঠীতেই এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরুণদের অবস্থান। ৩০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এএফডি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ এটিকে শুধু বয়স্ক, ক্ষুব্ধ কিংবা পুরোনো রাজনৈতিক মানসিকতার ভোট হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
তরুণ প্রজন্মও ডানদিকে ঝুঁকছে
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সে ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ন্যাশনাল র্যালির সমর্থন প্রায় ৩২ শতাংশ। জার্মানিতে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এএফডির সমর্থন প্রায় ২১ শতাংশ। ব্রিটেনে রিফর্ম পার্টি এখনো তরুণ ভোটারদের মধ্যে তুলনামূলক পিছিয়ে, ৩০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে তাদের সমর্থন প্রায় ৮ শতাংশ। কিন্তু ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিপথের সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবধান স্থায়ী থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখানেই মূলধারার দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। ডানপন্থী দলগুলো শেষ পর্যন্ত ভালো সরকার চালাতে পারবে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু তাদের ভোট বাড়ছে—এটাই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। ইতালি, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মতো দেশে এমন দলগুলো ইতিমধ্যে সরকারে রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে জোটের অংশীদার হিসেবে।
এর অর্থ হলো, ইউরোপের বিপুলসংখ্যক ভোটার মনে করছেন প্রচলিত দলগুলো তাদের সমস্যার যথাযথ সমাধান দিতে পারছে না।
ব্রিটেনের সামনে যে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
ব্রিটেনেও রিফর্ম এবং আরও ডানদিকে থাকা রিস্টোরের মতো দলগুলো মূলত একই অসন্তোষ থেকে শক্তি সংগ্রহ করছে। বিপরীত দিকে গ্রিনস কিংবা ইউর পার্টির মতো দলগুলোও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষের ভিন্ন রাজনৈতিক প্রকাশ।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের মূলধারার দলগুলোর সামনে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। কল্যাণব্যবস্থার ব্যয়, সরকারি ঋণ, আবাসন নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসন—এসব বিষয়ে তাদের বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য নীতি দিতে হবে। শুধু স্লোগান বা নির্বাচনী কৌশল দিয়ে সমস্যাগুলো এড়িয়ে গেলে চলবে না।
সাংস্কৃতিক প্রশ্নেও একই সাহস প্রয়োজন। রাজনীতিকদের নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে যে মতামত বেশি জোরালোভাবে শুনতে পাওয়া যায়, সেটিই যে গোটা দেশের মানুষের অবস্থান—এমন ধারণা বিপজ্জনক। সমাজের বৃহত্তর অংশ কী নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেটি বুঝতে হলে তাদের সঙ্গে সত্যিকার অর্থে কথা বলতে হবে।
ইউরোপের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে শুধু ‘চরমপন্থী’ বলে চিহ্নিত করলেই তার ভোটাররা অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং তাদের উদ্বেগের উত্তর না দিলে সেই ভোট আরও বাড়তে পারে।
গত শতাব্দীতে ব্রিটেন ইংলিশ চ্যানেলের ওপারের ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক চরমতার অনেকটাই এড়িয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু এই শতাব্দীতে সেই ব্যতিক্রম ধরে রাখা যাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সাহস করে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি না হয় এবং ভোটারদের কথা আন্তরিকভাবে না শোনে, তাহলে আজকের ইউরোপ আগামী দিনের ব্রিটেনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক চিত্র হয়ে উঠতে পারে।
আর জার্মানির পরবর্তী পরীক্ষা খুব দূরে নয়। মাসের শেষ দিকে মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্ন রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। সেখানে জনমত জরিপে এএফডি এগিয়ে আছে।
টিম মার্শাল 



















