ইউক্রেনের প্রধান কৌঁসুলি রুসলান ক্রাভচেঙ্কো অবৈধ কল সেন্টারকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর কার্যালয়ে অর্থ পাচারের একটি চক্র সক্রিয় ছিল বলে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী তদন্তকারীরা দাবি করার পর এ পদত্যাগের ঘটনা ঘটল।
কার্যালয়ে তদন্তকারীদের তল্লাশি
সপ্তাহান্তে ইউক্রেনের দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত সংস্থার সদস্যরা ক্রাভচেঙ্কোর কার্যালয়ে তল্লাশি চালান। তদন্তকারীদের ভাষ্য, তাঁর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নেতৃত্বে এমন একটি অর্থ পাচার চক্র শনাক্ত করা হয়েছে, যারা অবৈধ কল সেন্টারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করত।
ইউক্রেনের জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো ও বিশেষায়িত দুর্নীতিবিরোধী কৌঁসুলি কার্যালয় জানিয়েছে, এসব কল সেন্টার ফোন প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। চক্রটি বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে বলেও তদন্তকারীদের দাবি।
তদন্তকারীদের মতে, অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে সম্পত্তি, গয়না ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী কেনা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন ক্রাভচেঙ্কো

রোববার সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিবৃতিতে ক্রাভচেঙ্কো অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং কোনো ধরনের অনিয়মে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।
এর এক দিন পরই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, নিজের পদকে তিনি ‘রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার হতে দিতে চান না। একই সঙ্গে আগের এক বিবৃতিতে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউক্রেনের সংসদকে তাঁদের আস্থার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে জেলেনস্কি এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
যুদ্ধের মধ্যেও দুর্নীতির অভিযোগ
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলার মধ্যেও ইউক্রেনে দুর্নীতির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহলের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে ইউক্রেনে জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো ও বিশেষায়িত দুর্নীতিবিরোধী কৌঁসুলি কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও দেশটিতে দুর্নীতি এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

২০২৫ সালে জেলেনস্কি এই দুটি সংস্থার স্বাধীনতা সীমিত করার উদ্যোগ নিলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ইউক্রেনের ইউরোপীয় অংশীদাররাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। সাতটি দেশের জোটের রাষ্ট্রদূতরা সতর্ক করে বলেছিলেন, এমন পদক্ষেপ ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
পরবর্তী সময়ে ব্যাপক চাপের মুখে জেলেনস্কি দুটি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার স্বাধীনতা পুনর্বহাল করেন। তবে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের প্রতি তাঁর সরকারের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ মহল নিয়েও প্রশ্ন
গত মাসে জাতীয় দুর্নীতি দমন ব্যুরো জানায়, তারা তিন মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আত্মসাতের একটি পরিকল্পনা শনাক্ত করেছে। ওই অর্থ অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক এক জ্বালানি মন্ত্রীর জামিনের অর্থ হিসেবে ব্যবহারের কথা ছিল।
জেলেনস্কির কার্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও এতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। পরে ওই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়।

ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ গত মাসে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে সম্ভাব্য দুর্নীতি সম্পর্কে জেলেনস্কি কতটা জানতেন, সে প্রশ্নের উত্তর তাঁকেই দিতে হবে।
তবে ফেদোরভ একই সঙ্গে স্পষ্ট করে বলেন, জেলেনস্কি ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিতে জড়িত—এমন কোনো প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। তিনি জানান, জেলেনস্কির সঙ্গে কাজ করার পুরো সময়ে এমন কোনো নির্দেশ তিনি পাননি, যা আইন বা তাঁর নিজের নৈতিকতার বিরুদ্ধে যায়।
৩৫ বছর বয়সী ক্রাভচেঙ্কো দায়িত্বে থাকাকালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তিনি ইউক্রেনের শাসনব্যবস্থায় একটি ‘ব্যবস্থাগত সংকট’ তৈরি হয়েছে বলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে আসছিলেন।
ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রার্থী দেশ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর লড়াই চালানো দেশটির সদস্যপদ পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ফলে প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়কে ঘিরে নতুন এই দুর্নীতির অভিযোগ কিয়েভের জন্য রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক—দুই দিক থেকেই বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
ইউক্রেনের প্রধান কৌঁসুলির পদত্যাগ ঘিরে অবৈধ কল সেন্টার, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ দেশটির শাসনব্যবস্থা এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















