জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি। প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দলটি নির্বাচনে প্রথম হয়েছে। এই ফল শুধু রাজ্যটির রাজনীতিতেই নয়, পুরো জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনেই নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এএফডি। ৮৩ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় দলটি পেয়েছে ৩৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের জন্য তাদের এখন অন্য দলের আইনপ্রণেতাদের সমর্থন প্রয়োজন।
মের্জের দলকে নাড়িয়ে দিয়েছে ফল
এই নির্বাচনের ফলকে নিজের দলের জন্য ভয়াবহ ধাক্কা হিসেবে দেখছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জ। তিনি বলেছেন, এই ফল তার দলকে ‘ভিত থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে’।
তবে পদত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন মের্জ। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরও সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা থেকে সরে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
মের্জের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল জোটের জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষের সুযোগ নিয়েই এএফডি ভোটারদের বড় অংশকে নিজেদের দিকে টানতে পেরেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এএফডির সামনে সরকার গঠনের কঠিন সমীকরণ
এএফডির জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—৩৯টি আসন নিয়ে কীভাবে সরকার গঠন করবে তারা।
জার্মানির মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এএফডির সঙ্গে সরকার গঠন বা আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা এড়িয়ে চলেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই নীতিকে ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল সেই নীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।
এএফডির জাতীয় সহ-নেতা টিনো ক্রুপাল্লা রক্ষণশীল দলের আইনপ্রণেতাদের প্রতি সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, দলীয় বিভাজন ভুলে একটি ‘মধ্য-ডান রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ গড়ে তোলার সময় এসেছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়া নিয়ে মের্জের কঠোর অবস্থান
এএফডি জার্মানির ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনেরও দাবি জানিয়ে আসছে দলটি।
কিন্তু মের্জ স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচনী ফলের কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন নিয়ে তার অবস্থান পরিবর্তন হবে না। তার ভাষায়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের স্বাধীনতা ও মূল্যবোধ রক্ষা করা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ইউক্রেনকে সমর্থন বন্ধ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না; বরং আরও খারাপ হতে পারে।

বামপন্থী দলই হতে পারে এএফডির সম্ভাব্য সঙ্গী
জার্মানির রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এএফডির সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখানো একমাত্র দলটি হলো জনতুষ্টিবাদী বামপন্থী বিএসডব্লিউ।
দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও ব্যাপক অভিবাসনবিরোধিতা এবং ইউক্রেনকে জার্মানির সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল রয়েছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করে তারা।
ফলে এএফডি সরকার গঠনের চেষ্টা করলে বিএসডব্লিউর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পুরোনো পূর্ব জার্মানির স্মৃতিও বড় কারণ
স্যাক্সনি-আনহাল্ট সাবেক পূর্ব জার্মানির একটি তুলনামূলক দরিদ্র রাজ্য। নির্বাচনে এএফডির সাফল্যের পেছনে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের হতাশা যেমন কাজ করেছে, তেমনি সাবেক পূর্ব জার্মানির জীবন নিয়ে এক ধরনের স্মৃতিকাতরতাও ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এএফডি প্রচারে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শহর, কঠোর অভিবাসননীতি এবং জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে।
ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ
জার্মানির নির্বাচনী ফল নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স ও পোল্যান্ড এরই মধ্যে ফলাফল নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ ল্যসকিউর এই ফলকে ‘খুবই উদ্বেগজনক সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ইউরোপের কয়েকজন উগ্র ডানপন্থী নেতা এএফডির সাফল্যকে পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে
এএফডির জাতীয় সহ-নেতা অ্যালিস ভাইডেল এই ফলকে দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তিনি ইতিমধ্যেই ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে অন্তত ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন তাই শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণ নয়। এটি জার্মানির মূলধারার রাজনীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ কতটা গভীর হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এএফডি জাতীয় ক্ষমতার কতটা কাছে যেতে পারে—তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















