বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব বড় ধরনের চাপে পড়েছে। বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন এবং তার ২০ শতাংশ অংশ ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত তীব্র বিরোধিতার মুখে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে ইনফান্তিনোর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি আগামী বছরের নির্বাচনে সহজেই চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। এখন সেই অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে।
তিন দিনের বিরোধে পরিকল্পনার সমাপ্তি
ফিফা এক বিবৃতিতে জানায়, প্রস্তাবটি সদস্যদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করায় তা আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।
এই সিদ্ধান্তের আগে টানা তিন দিন বিশ্ব ফুটবলে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। ইউরোপের ফুটবল সংস্থা উয়েফা ঘোষণা দেয়, প্রস্তাব প্রত্যাহার না করা হলে তারা ফিফার সব কার্যক্রম বর্জন করবে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থার এমন অবস্থানের পর চাপ আরও বেড়ে যায়।

সমালোচনার মুখে ইনফান্তিনো
বিশ্লেষকদের মতে, ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সদস্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই পরিকল্পনা সামনে আনা। অনেক ফুটবল সংগঠন অভিযোগ করেছে, তারা সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের আগ পর্যন্ত বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানত না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কলেজ অব দ্য হলি ক্রসের অর্থনীতির অধ্যাপক ভিক্টর ম্যাথেসন বলেন, বিশ্বকাপের আর্থিক সাফল্যের কারণে এক সপ্তাহ আগেও ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও দূরে সরে যান
বিতর্কের মধ্যে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীও তার অবস্থান থেকে সরে আসেন।
জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করে এই পরিকল্পাকে ফুটবলের জন্য “খারাপ চুক্তি” বলে মন্তব্য করেন। অন্যদিকে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুর অভিযোগ করেন, কর্মীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং এটি ছিল “একজন ব্যক্তির প্রকল্প”।
আগেও বিতর্কে টিকে ছিলেন
২০১৬ সালে দুর্নীতিকাণ্ডের পর সেপ ব্লাটারের স্থলাভিষিক্ত হন ইনফান্তিনো। দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একাধিক বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন।
২০১৮ সালে ক্লাব বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনাও উয়েফার বিরোধিতার মুখে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ নিয়েও তার বিভিন্ন মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে সেসব সংকট তিনি অতিক্রম করতে সক্ষম হন।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন
বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে ইনফান্তিনোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের নাম। এতে স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ চলাকালে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিয়েও আগেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নতুন পরিকল্পনায় সেই সম্পর্ক আবারও আলোচনায় আসে।
নির্বাচন সামনে, অনিশ্চয়তা বাড়ছে
আগামী মার্চে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা কংগ্রেসে সভাপতির নির্বাচন হওয়ার কথা। আগে যেখানে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা যাচ্ছিল না, এখন নতুন প্রার্থী সামনে আসার সম্ভাবনা বেড়েছে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ইনফান্তিনোকে এখনই রাজনীতির বাইরে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ভোটেই সভাপতি নির্বাচিত হন, আর তাদের অনেকেই ফিফার আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
তাদের মতে, ইনফান্তিনো যদি সদস্যদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেন এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভুল স্বীকার করেন, তাহলে এখনও তার ফিরে আসার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। Reuters-এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















