এক সময় ভারতের বেঙ্গালুরুর আশপাশের গ্রামগুলো ছিল আঙুর, পেয়ারা, চাকোতা, গাজর, নানা ধরনের সবজি ও দেশি ফলের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, পানির সংকট, কৃষিজমি আবাসন ও শিল্পে রূপান্তর এবং শ্রমিকের অভাব—সব মিলিয়ে সেই ঐতিহ্য আজ দ্রুত বিলীন হচ্ছে। কৃষকদের একাংশ কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ জমি বিক্রি করেছেন, আবার অনেকে তুলনামূলক লাভজনক নতুন ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন।
শহরের বিস্তারে হারিয়ে যাচ্ছে আঙুরের বাগান
বেঙ্গালুরুর উত্তরের বেত্তাহালাসুর এলাকায় এখনও দুই একর জমিতে ঐতিহ্যবাহী ‘বেঙ্গালুরু ব্লু’ আঙুর চাষ করেন ৬০ বছর বয়সী কৃষক রামচন্দ্র গৌড়া। কিন্তু তিনি জানান, এক সময় যেখানে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আঙুরের বাগান ছিল, সেখানে এখন বহুতল ভবন আর আবাসিক প্রকল্প গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, প্রায় এক দশক আগে কৃষিজমি দ্রুত আবাসিক এলাকায় রূপ নিতে শুরু করে। অনিশ্চিত বৃষ্টি, পানির ঘাটতি এবং কৃষিতে কম লাভের কারণে অনেকেই জমি বিক্রি করে দেন বা বাড়ি নির্মাণ করেন।
বিপন্ন ‘বেঙ্গালুরু ব্লু’ আঙুর
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত ‘বেঙ্গালুরু ব্লু’ আঙুর একসময় এই অঞ্চলের গর্ব ছিল। কিন্তু আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনে এখন ফলের গুণগত মানও কমে যাচ্ছে।
কৃষকদের মতে, আগে গ্রীষ্ম ছিল সহনীয়, বৃষ্টিও সময়মতো হতো। এখন কখনও তীব্র গরম, কখনও অতিবৃষ্টি, আবার কখনও দীর্ঘ খরা দেখা দিচ্ছে। ফলে ফল পাকতে আগেই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে আঙুর। এতে প্রথম শ্রেণির পরিবর্তে নিম্নমানের ফল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারদরও অনেক কম।
দেশি জাত ছেড়ে বিদেশি ও বাণিজ্যিক জাতের দিকে ঝুঁকছেন কৃষক
নাগাদাসানাহাল্লির কৃষক প্রদীপ প্যাটেল জানান, অনেক কৃষক এখন বেঙ্গালুরু ব্লুর পরিবর্তে আনাব-ই-শাহি, থম্পসন সিডলেস বা রেড গ্লোব জাতের আঙুর চাষ করছেন। এই জাতগুলোর বাজারমূল্য বেশি এবং ক্রেতাদের চাহিদাও তুলনামূলক বেশি।
তার মতে, শহর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য হ্রদ শুকিয়ে গেছে কিংবা দূষিত হয়েছে। ফলে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং অনেক কৃষক ঐতিহ্যবাহী ফসল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পরিসংখ্যানে স্পষ্ট পতনের চিত্র
উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে বেঙ্গালুরু গ্রামীণ জেলায় ১ হাজার ৭১৩ হেক্টর জমিতে বেঙ্গালুরু ব্লু আঙুর চাষ হতো। ২০২৪-২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৩৯ হেক্টরে।
বেঙ্গালুরু শহরাঞ্চলে পতন আরও ভয়াবহ। সেখানে ৮০৩ হেক্টর থেকে কমে মাত্র ১৬২ হেক্টরে নেমে এসেছে এই আঙুরের চাষ।
শহর, বিমানবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের চাপে কৃষিজমি বিলীন
উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১০ সালের পর থেকেই দ্রুত নগরায়ণ এই পরিবর্তনের মূল কারণ। একদিকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিস্তার, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে আবাসন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় হাজার হাজার একর কৃষিজমি হারিয়ে গেছে।
যেসব এলাকা একসময় ফলের জন্য পরিচিত ছিল, সেগুলো এখন শহরের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়েছে।
পেয়ারার বাগানও হারাচ্ছে অস্তিত্ব
একসময় দেবানাহাল্লি, ইয়েলাহাঙ্কা ও চিক্কাবল্লাপুর এলাকায় লাল পেয়ারার ব্যাপক চাষ হতো। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টি, পানির সংকট এবং জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই চিত্রও বদলে গেছে।
কৃষকদের অনেকে এখন পেয়ারার পরিবর্তে অন্য ফলের দিকে ঝুঁকেছেন। কেউ আবার কৃষিকাজই ছেড়ে দিয়েছেন।
জামুনে মিলছে নতুন সম্ভাবনা
কিছু কৃষক অবশ্য নতুন সুযোগও খুঁজে পেয়েছেন। প্রদীপ প্যাটেলের পরিবার উন্নত কলম পদ্ধতিতে তিনটি নতুন জাতের জামুন উদ্ভাবন করেছে, যেগুলোর বাজারমূল্য অত্যন্ত বেশি।
পাইকারি বাজারেই প্রতি কেজি কয়েকশ রুপিতে বিক্রি হওয়ায় এই ফল তাদের ভালো আয় এনে দিচ্ছে। তবে এমন সফলতার উদাহরণ খুবই সীমিত।
বিলুপ্তির পথে দেবানাহাল্লির ঐতিহ্যবাহী চাকোতা
দেবানাহাল্লির জিআই স্বীকৃত চাকোতা আজ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। কৃষক শিবানাপুরা রমেশ বহু বছর ধরে এই বিরল জাত সংরক্ষণ করে আসছেন। তার দাবি, তাদের পরিবারের বাগানের একটি চাকোতা গাছের ফলই একসময় মহাত্মা গান্ধীকে পরিবেশন করা হয়েছিল।
সরকারি উদ্যোগে এই ফল সংরক্ষণের জন্য কলম তৈরি করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হলেও খুব কম মানুষই এখন এই ফলের চাষে আগ্রহী।
সবজি চাষেও একই সংকট
আনেকাল, হোসকোটে এবং আশপাশের এলাকায় একসময় বিপুল পরিমাণ গাজর ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদিত হতো। কিন্তু শিল্পাঞ্চল, আবাসন, দূষিত পানি এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতির কারণে কৃষিজ উৎপাদনের মান কমে গেছে।
অন্যদিকে জমির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের কাছে জমি বিক্রি করা কিংবা ভাড়া দেওয়া এখন কৃষিকাজের চেয়ে বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে।
শ্রমিকের সংকট কৃষিকে আরও দুর্বল করছে
গ্রামাঞ্চলের বহু শ্রমিক এখন শহরে নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। নিয়মিত মাসিক আয়ের নিশ্চয়তা থাকায় তারা আর মৌসুমি কৃষিশ্রমে ফিরতে চান না।
ফলে কৃষকদের শ্রমিক সংকটে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
দেশি বীজ হারানোর আশঙ্কা
কৃষকদের মতে, উচ্চফলনশীল সংকর বীজের প্রসারের ফলে বহু দেশীয় ফল ও সবজির জাত ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। আগে যে দেশি বীজ বহু বছর ধরে ফলন দিত, এখন তার জায়গা নিয়েছে এমন সংকর বীজ, যা বারবার কিনতে হয়।
কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দেশি বীজ সংরক্ষণের চেষ্টা চালালেও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ পুরোপুরি থামানো সম্ভব না হলেও ঐতিহ্যবাহী ফল ও সবজির জাত সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। তা না হলে বেঙ্গালুরুর পরিচয় বহনকারী বহু দেশি ফল ও সবজি আগামী প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাস হয়েই থেকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















