১০:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
জীবাণু অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়, নতুন হুমকি বায়োসন্ত্রাস কোরিয়ার ছোঁয়ায় নতুন স্বাদের ইনারি-সুশি: ভুট্টা, টোফু আর ঝাল মাখনের অনন্য মেলবন্ধন উত্তর কোরিয়া-রাশিয়ার সামরিক জোটে বদলে যাচ্ছে ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা সমীকরণ টানা পঞ্চম মাসে টয়োটার বৈশ্বিক বিক্রি কমল, চাপ বাড়ছে গাড়ি শিল্পে ইরানকে থামাতে পারবে কি চীন? উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা বিমসটেককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নেপাল, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে নতুন উদ্যোগ ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কুমামোতো, ফিরছে পরিবহন ও শিল্প কার্যক্রম পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকে পড়ল অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল বিমসটেককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নেপাল, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে নতুন উদ্যোগ গাড়িতে ধূমপানের ভুলে বদলে গেল জীবন, পুলিশে জানানো সেই চালককেই এখন ধন্যবাদ সাবেক আসক্তের

ভালোবাসার ভিড়েও কেন মানুষ একা? নিঃসঙ্গতার বীজ লুকিয়ে থাকে শৈশবের অদৃশ্য ক্ষতে

মানুষের চারপাশে পরিবার আছে, বন্ধু আছে, প্রিয়জন আছে—তবু বুকের ভেতর বাসা বাঁধে গভীর এক নিঃসঙ্গতা। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই অনুভব করেন, কেউ যেন সত্যিকার অর্থে তাঁর মনের কথা জানে না, তাঁর অনুভূতির পাশে দাঁড়ায় না। দীর্ঘদিন ধরে এই নিঃসঙ্গতার কারণ হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, নগরায়ণ কিংবা ব্যস্ততাকে দায়ী করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর শিকড় অনেক গভীরে—মানুষের শৈশবে।

শৈশবের অদেখা ক্ষত, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের নিঃসঙ্গতা

বিশ্বজুড়ে নিঃসঙ্গতা এখন কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো সময় গভীর নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এই অনুভূতি শুধু মানসিক কষ্টই বাড়ায় না, হৃদ্‌রোগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

তবে প্রশ্নটি থেকেই যায়—একই রকম পরিবেশে থেকেও কেন একজন মানুষ নিজেকে ভালোবাসায় ঘেরা মনে করেন, আর অন্যজন অনুভব করেন গভীর একাকিত্ব?

পরিবারের ভেতর থেকেও কেন জন্ম নেয় একাকিত্ব

আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা, যৌথ পরিবার বা ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধন মানুষকে নিঃসঙ্গ হতে দেয় না। বাস্তবতা কিন্তু অনেক সময় ভিন্ন। একই ছাদের নিচে থেকেও বহু মানুষ অনুভব করেন, তাঁদের অনুভূতি কেউ বোঝে না, তাঁদের ভয়, কষ্ট কিংবা দুর্বলতা প্রকাশ করার নিরাপদ কোনো জায়গা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকালে যদি কেউ বারবার অবহেলা, উপেক্ষা, কঠোর সমালোচনা কিংবা শর্তসাপেক্ষ ভালোবাসার মুখোমুখি হয়, তবে সে ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃত অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে শেখে। বাইরে থেকে সে হয়তো হাসিখুশি, প্রাণবন্ত কিংবা সফল বলে মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গড়ে ওঠে এক অদৃশ্য দেয়াল। সেই দেয়ালই পরবর্তী জীবনে মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অদৃশ্য মানসিক আঘাতের দীর্ঘ ছায়া

শৈশবের মানসিক আঘাত সব সময় চোখে দেখা যায় না। শারীরিক নির্যাতনের মতো স্পষ্ট চিহ্ন না থাকলেও বারবার অবহেলিত হওয়া, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব না পাওয়া কিংবা নিরাপদ আবেগিক পরিবেশের অভাব একটি শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।

সময়ের সঙ্গে সেই শিশু বড় হলেও তার মনে থেকে যায় অবিশ্বাস, আত্মসংশয় এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। ফলে সম্পর্কের মধ্যে থেকেও সে নিজের অনুভূতি গোপন রাখে। মানুষের ভিড়েও তখন তার মনে হয়, সে যেন সম্পূর্ণ একা।

Having multiple personalities prevents loneliness

সম্পর্কের সংখ্যা নয়, সম্পর্কের গভীরতাই আসল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিঃসঙ্গতা সব সময় মানুষের অভাবের কারণে তৈরি হয় না। বরং অনেক সময় এটি জন্ম নেয় এমন সম্পর্ক থেকে, যেখানে নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতি অনুপস্থিত।

কারও পাশে অসংখ্য মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু যদি সে মনে করে নিজের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ করলে তাকে বিচার করা হবে কিংবা প্রত্যাখ্যান করা হবে, তবে সেই সম্পর্ক তার একাকিত্ব দূর করতে পারে না।

সুস্থ আবেগিক পরিবেশই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ

যে শিশুরা এমন পরিবেশে বড় হয়, যেখানে তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, ভুল করলে অপমান নয় বরং সহমর্মিতা পায়, ভয় বা দুঃখ প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে না—তারা বড় হয়ে তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসী ও সম্পর্কনির্ভর মানুষে পরিণত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বড়দেরও নিজেদের অমীমাংসিত মানসিক ক্ষত ও ট্রমার মুখোমুখি হওয়া জরুরি। কারণ এক প্রজন্মের অমীমাংসিত যন্ত্রণা অনেক সময় পরবর্তী প্রজন্মের আবেগিক জীবনে ছায়া ফেলে।

নিঃসঙ্গতার সমাধান শুরু হোক শৈশব থেকেই

নিঃসঙ্গতা মোকাবিলায় শুধু মানুষকে আরও বেশি মেলামেশার পরামর্শ দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সমাধান শুরু হতে পারে তখনই, যখন প্রতিটি শিশু এমন একটি পরিবার ও সমাজে বেড়ে উঠবে, যেখানে তাকে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা হবে, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং নিরাপদ আবেগিক আশ্রয় দেওয়া হবে।

ভারতের মতো বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে শিশুদের মানসিক সুস্থতায় বিনিয়োগ শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি ভবিষ্যতের সামাজিক স্থিতি, সুস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিরও অন্যতম ভিত্তি। তাই নিঃসঙ্গতার কারণ খুঁজতে গিয়ে শুধু বর্তমান জীবনযাত্রার দিকে তাকালে চলবে না; ফিরে তাকাতে হবে শৈশবের দিকে। কারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের সত্যিকারের সংযোগের শুরু সেখান থেকেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

জীবাণু অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়, নতুন হুমকি বায়োসন্ত্রাস

ভালোবাসার ভিড়েও কেন মানুষ একা? নিঃসঙ্গতার বীজ লুকিয়ে থাকে শৈশবের অদৃশ্য ক্ষতে

০৮:৩০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

মানুষের চারপাশে পরিবার আছে, বন্ধু আছে, প্রিয়জন আছে—তবু বুকের ভেতর বাসা বাঁধে গভীর এক নিঃসঙ্গতা। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই অনুভব করেন, কেউ যেন সত্যিকার অর্থে তাঁর মনের কথা জানে না, তাঁর অনুভূতির পাশে দাঁড়ায় না। দীর্ঘদিন ধরে এই নিঃসঙ্গতার কারণ হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, নগরায়ণ কিংবা ব্যস্ততাকে দায়ী করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর শিকড় অনেক গভীরে—মানুষের শৈশবে।

শৈশবের অদেখা ক্ষত, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের নিঃসঙ্গতা

বিশ্বজুড়ে নিঃসঙ্গতা এখন কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো সময় গভীর নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এই অনুভূতি শুধু মানসিক কষ্টই বাড়ায় না, হৃদ্‌রোগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

তবে প্রশ্নটি থেকেই যায়—একই রকম পরিবেশে থেকেও কেন একজন মানুষ নিজেকে ভালোবাসায় ঘেরা মনে করেন, আর অন্যজন অনুভব করেন গভীর একাকিত্ব?

পরিবারের ভেতর থেকেও কেন জন্ম নেয় একাকিত্ব

আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা, যৌথ পরিবার বা ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধন মানুষকে নিঃসঙ্গ হতে দেয় না। বাস্তবতা কিন্তু অনেক সময় ভিন্ন। একই ছাদের নিচে থেকেও বহু মানুষ অনুভব করেন, তাঁদের অনুভূতি কেউ বোঝে না, তাঁদের ভয়, কষ্ট কিংবা দুর্বলতা প্রকাশ করার নিরাপদ কোনো জায়গা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকালে যদি কেউ বারবার অবহেলা, উপেক্ষা, কঠোর সমালোচনা কিংবা শর্তসাপেক্ষ ভালোবাসার মুখোমুখি হয়, তবে সে ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃত অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে শেখে। বাইরে থেকে সে হয়তো হাসিখুশি, প্রাণবন্ত কিংবা সফল বলে মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গড়ে ওঠে এক অদৃশ্য দেয়াল। সেই দেয়ালই পরবর্তী জীবনে মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অদৃশ্য মানসিক আঘাতের দীর্ঘ ছায়া

শৈশবের মানসিক আঘাত সব সময় চোখে দেখা যায় না। শারীরিক নির্যাতনের মতো স্পষ্ট চিহ্ন না থাকলেও বারবার অবহেলিত হওয়া, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব না পাওয়া কিংবা নিরাপদ আবেগিক পরিবেশের অভাব একটি শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।

সময়ের সঙ্গে সেই শিশু বড় হলেও তার মনে থেকে যায় অবিশ্বাস, আত্মসংশয় এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। ফলে সম্পর্কের মধ্যে থেকেও সে নিজের অনুভূতি গোপন রাখে। মানুষের ভিড়েও তখন তার মনে হয়, সে যেন সম্পূর্ণ একা।

Having multiple personalities prevents loneliness

সম্পর্কের সংখ্যা নয়, সম্পর্কের গভীরতাই আসল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিঃসঙ্গতা সব সময় মানুষের অভাবের কারণে তৈরি হয় না। বরং অনেক সময় এটি জন্ম নেয় এমন সম্পর্ক থেকে, যেখানে নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার অনুভূতি অনুপস্থিত।

কারও পাশে অসংখ্য মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু যদি সে মনে করে নিজের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ করলে তাকে বিচার করা হবে কিংবা প্রত্যাখ্যান করা হবে, তবে সেই সম্পর্ক তার একাকিত্ব দূর করতে পারে না।

সুস্থ আবেগিক পরিবেশই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ

যে শিশুরা এমন পরিবেশে বড় হয়, যেখানে তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, ভুল করলে অপমান নয় বরং সহমর্মিতা পায়, ভয় বা দুঃখ প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে না—তারা বড় হয়ে তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসী ও সম্পর্কনির্ভর মানুষে পরিণত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বড়দেরও নিজেদের অমীমাংসিত মানসিক ক্ষত ও ট্রমার মুখোমুখি হওয়া জরুরি। কারণ এক প্রজন্মের অমীমাংসিত যন্ত্রণা অনেক সময় পরবর্তী প্রজন্মের আবেগিক জীবনে ছায়া ফেলে।

নিঃসঙ্গতার সমাধান শুরু হোক শৈশব থেকেই

নিঃসঙ্গতা মোকাবিলায় শুধু মানুষকে আরও বেশি মেলামেশার পরামর্শ দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সমাধান শুরু হতে পারে তখনই, যখন প্রতিটি শিশু এমন একটি পরিবার ও সমাজে বেড়ে উঠবে, যেখানে তাকে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা হবে, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং নিরাপদ আবেগিক আশ্রয় দেওয়া হবে।

ভারতের মতো বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে শিশুদের মানসিক সুস্থতায় বিনিয়োগ শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি ভবিষ্যতের সামাজিক স্থিতি, সুস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিরও অন্যতম ভিত্তি। তাই নিঃসঙ্গতার কারণ খুঁজতে গিয়ে শুধু বর্তমান জীবনযাত্রার দিকে তাকালে চলবে না; ফিরে তাকাতে হবে শৈশবের দিকে। কারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের সত্যিকারের সংযোগের শুরু সেখান থেকেই।