একটি ব্যক্তিগত ভাড়ার গাড়িতে ধূমপানের ছোট্ট একটি ঘটনা যে একজন তরুণের জীবন পুরোপুরি বদলে দিতে পারে, তারই উদাহরণ ২৫ বছর বয়সী জেরোম। একসময় ই-ভেপ বা বিশেষ ধরনের মাদকযুক্ত ভেপে আসক্ত এই তরুণ এখন মনে করেন, তাকে পুলিশের কাছে জানানো সেই চালকই হয়তো তাকে আরও বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।
জেরোম বলছেন, “সেদিন চালক যদি পুলিশে খবর না দিতেন, তাহলে হয়তো আজও আমি ভেপে আসক্ত থাকতাম।” নিজের ভুল বুঝতে পেরে এখন তিনি কৃতজ্ঞ সেই ব্যক্তির প্রতি, যিনি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন।
দুই সপ্তাহে চার হাজার ডলার খরচ, হারিয়েছিলেন নিয়ন্ত্রণ
জেরোমের আসক্তির শুরু হয় ১৯ বছর বয়সে ধূমপান ও ভেপ ব্যবহারের মাধ্যমে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার পর তিনি প্রথমবার কেপড নামের এক ধরনের ভেপ ব্যবহার করেন, যাতে ছিল ইটোমিডেট নামের মাদক উপাদান।
তিনি জানান, প্রথমে বুঝতেই পারেননি যে ভেপটির মধ্যে এই উপাদান মেশানো ছিল। কয়েকবার টান দেওয়ার পরই তিনি এর প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন স্বাদের কেপড কিনতে প্রায় চার হাজার ডলার খরচ করেন তিনি। এমনকি কয়েকজন বন্ধুকেও এসব ভেপ দিয়েছিলেন।
জেরোম বলেন, এটি অনেকটা ঘুমের ওষুধের মতো অনুভূতি তৈরি করত। ভেপ নেওয়ার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। এর প্রভাবে তার ক্ষুধা অনেক কমে যায় এবং মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তার ওজন আট কেজি কমে যায়।
গাড়িতে একটি টান, তারপর পুলিশের কাছে অভিযোগ
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নিজের দাদির বাড়ি থেকে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে একটি ব্যক্তিগত ভাড়ার গাড়িতে ওঠেন জেরোম। গাড়িটি চলার সময় তিনি পেছনের আসনে বসে ভেপ ব্যবহার করেন।
চালক তাকে ভেপ বন্ধ করতে বলেন। কিন্তু জেরোম আরেকবার টান দেন। এতে চালক গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে দেন এবং পুলিশে খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
জেরোম বলেন, “চালক বলেছিলেন তিনি আমাকে ভেপ ব্যবহারের জন্য পুলিশে জানাবেন। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাকে আরেকটি সুযোগ দিতে বলেছিলাম এবং বলেছিলাম ভেপটি ফেলে দেব। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত পুলিশকে জানিয়েছিলেন।”
পুলিশ এসে তার কাছ থেকে বেরি স্বাদের একটি ভেপ এবং ইটোমিডেট মেশানো ভেপ পড জব্দ করে।
এরপর তাকে ৭০০ ডলার জরিমানা করা হয় এবং বাধ্যতামূলক পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

শাস্তি নয়, পুনর্বাসনই বদলে দিল জীবন
প্রথমে জেরোম ভেবেছিলেন শুধু জরিমানা দিয়েই বিষয়টি শেষ হবে। কিন্তু বাধ্যতামূলক পুনর্বাসনে যেতে হবে, তা তিনি আশা করেননি।
তবে এখন তিনি মনে করেন, এই পুনর্বাসনই তাকে আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছে।
জেরোম বলেন, “পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি ভাগ্যবান। চালক আমাকে পুলিশে জানিয়েছিলেন বলেই হয়তো আমি আজ এই অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পেরেছি।”
পুনর্বাসন চলাকালে থাই হুয়া কুয়ান মোরাল চ্যারিটিজের জ্যেষ্ঠ সমাজকর্মী সি কেক কুন তিন মাস ধরে তার সঙ্গে কাজ করেন।
তিনি জানান, শুরু থেকেই জেরোমের মধ্যে আসক্তি ছাড়ার দৃঢ় ইচ্ছা ছিল। তার কাজ ছিল সেই ইচ্ছাকে আরও শক্তিশালী করা।
সমাজকর্মী তাকে বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেন। নিজের পছন্দের রান্নার কাজে মনোযোগ দেওয়া এবং যারা আবার ভেপ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে পারে, এমন বন্ধুদের থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কঠোর আইনেও বাড়ছে নজরদারি
ভেপ ও মাদকযুক্ত ভেপ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরে শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর প্রথমবার ধরা পড়া প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জরিমানা এবং বাধ্যতামূলক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
২০২৬ সালের মে থেকে ভেপ ব্যবহারের সর্বোচ্চ জরিমানা আরও বাড়ানো হয়েছে। মাদকযুক্ত কেপড ব্যবহারের ক্ষেত্রে জরিমানা, কারাদণ্ড বা উভয় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
ইটোমিডেট মূলত হাসপাতালে চিকিৎসার সময় রোগীকে অচেতন করার জন্য ব্যবহৃত একটি ওষুধ। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এটি গ্রহণ করা বিপজ্জনক। ভেপের মাধ্যমে শরীরে নেওয়ার জন্য এটি কখনোই তৈরি করা হয়নি।
পরিবারকে আর কষ্ট দিতে চান না জেরোম
জেরোম এখন আর আগের জীবনে ফিরতে চান না। তিনি বলেন, নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি তার পরিবারও এই অভ্যাস নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল।
তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পেরেছি এই অভ্যাস আমাকে ধ্বংস করছিল। আমি চাই না আমার কারণে আমার পরিবার কষ্ট পাক।”
একটি কঠোর মুহূর্ত, একজন সচেতন চালক এবং একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি—এই তিনটি বিষয়ই বদলে দিয়েছে জেরোমের জীবন। যে মানুষটি একসময় ভেপের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, এখন তিনিই অন্যদের সতর্ক করতে চান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















