কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় তাদের তৈরি কয়েকটি এআই মডেল অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাস্তব ব্যবস্থায় প্রবেশ করে হ্যাকিং কার্যক্রম চালিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তা পরীক্ষার নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে তারা ঘটনাগুলো শনাক্ত করে। এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই একই ধরনের একটি ঘটনার কথা প্রকাশ করার পর অ্যানথ্রপিক তাদের পুরোনো পরীক্ষাগুলো পুনরায় যাচাই শুরু করে।
পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা ভেঙে ইন্টারনেটে প্রবেশ
অ্যানথ্রপিকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারা মোট এক লাখ ৪১ হাজার ছয়টি নিরাপত্তা মূল্যায়ন পরীক্ষা পর্যালোচনা করে তিনটি ঘটনা খুঁজে পায়, যেখানে তাদের ক্লড এআই মডেল পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সীমাবদ্ধ পরিবেশ থেকে ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
পরীক্ষাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেখানে এআই মডেলগুলোকে একটি কৃত্রিম সাইবার হামলার পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবেশ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল না। ফলে এআই মডেলগুলো বাইরের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত প্রযুক্তি অবকাঠামোয় প্রবেশ করতে পারে।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ঘটনাগুলোর শুরু চলতি বছরের এপ্রিল থেকে। তবে কোন তিনটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
হ্যাকিং পরীক্ষাই পরিণত হয় বাস্তব অনুপ্রবেশে
সাধারণত মানুষের পাশাপাশি এআইয়ের সাইবার সক্ষমতা যাচাই করতে ‘ক্যাপচার দ্য ফ্ল্যাগ’ ধরনের পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। এসব পরীক্ষায় নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে বের করতে বা নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করতে এআইকে বিভিন্ন সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করতে দেওয়া হয়।
তবে অ্যানথ্রপিকের ক্ষেত্রে একটি পুরোনো মডেল ইন্টারনেট উন্মুক্ত থাকার বিষয়টি বুঝতে পারার পরও আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। অন্যদিকে নতুন মডেলটি বুঝতে পারে যে এটি প্রকৃত ইন্টারনেট পরিবেশে চলে এসেছে এবং আক্রমণ বন্ধ করে দেয়।
দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রবেশ
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিল তিনটি ক্লড মডেল—অপাস ৪.৭, মিথোস ৫ এবং একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণা পরীক্ষামূলক মডেল।
এসব মডেল সাধারণত ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত সংস্করণে থাকা নিরাপত্তা সুরক্ষা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্বল পাসওয়ার্ডের মতো সাধারণ নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে এআই মডেলগুলো সংশ্লিষ্ট সিস্টেমে প্রবেশ করেছিল।
নিরাপত্তা তদারকি নিয়ে বাড়ছে চাপ
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে বাস্তব সাইবার হুমকির অনুকরণে এ ধরনের পরীক্ষা চালায়, কারণ শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি বোঝার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, পরীক্ষার নেটওয়ার্ক লগ এবং মূল্যায়ন নথি আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল। তাদের পাশাপাশি আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও শুরুতে এই অনুপ্রবেশ শনাক্ত করতে পারেনি।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে এআই প্রযুক্তির ওপর আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো হচ্ছে। এক হাজার একশর বেশি এআই খাতের কর্মীও সম্প্রতি একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণে একটি সরকারি ব্যবস্থার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শক্তিশালী এআই নিয়ে নতুন সতর্কবার্তা
অ্যানথ্রপিকের এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন প্রতিষ্ঠানটি কয়েক মাস আগে মিথোস নামে একটি নতুন এআই মডেলের ঘোষণা দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির মতে, মডেলটি এত শক্তিশালী ও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে এর প্রকাশ সীমিত রাখা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরীক্ষার পরিবেশের স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন নজরদারি। কারণ পরীক্ষামূলক পরিস্থিতিতে তৈরি করা এআই আচরণ কখন বাস্তব জগতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি তৈরি করবে, তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
Sarakhon Report 

















