প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি রেকর্ডের অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা, খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ধারণা করছে, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এই এল নিনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই এল নিনোর কারণে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে আগাম সতর্কতা, জরুরি সাড়া ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা জোরদার করা গেলে এই মৃত্যুর বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
এল নিনো কী?
এল নিনো হলো প্রাকৃতিকভাবে ঘটা ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ বা ইএনএসও চক্রের উষ্ণ পর্যায়। প্রশান্ত মহাসাগরের এই জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয়। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে যায় এবং মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়।
এর ফলে কোথাও বৃষ্টিপাত বেড়ে বন্যা হতে পারে, আবার অন্য কোনো অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়ে দেখা দিতে পারে খরা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রাও সাধারণত বেড়ে যায়।
কেন এবারের এল নিনোকে এত শক্তিশালী বলা হচ্ছে?
এল নিনোর শক্তি বোঝার অন্যতম প্রধান সূচক হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন বা নোয়ার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর কোনো এল নিনো পর্বে এটিই সর্বোচ্চ তাপমাত্রাগত বিচ্যুতি বলে জানিয়েছে নোয়া। এল নিনো ঘোষণার জন্য যেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রাই যথেষ্ট, সেখানে ১ ডিগ্রি হলে মাঝারি, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি হলে শক্তিশালী এবং ২ ডিগ্রি হলে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হয়।
নোয়া জুনেই আনুষ্ঠানিকভাবে এল নিনো পরিস্থিতি শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছিল। ডব্লিউএমও অবশ্য ‘সুপার এল নিনো’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করে না। সংস্থাটি চলতি মাসে পূর্বাভাস দিয়েছে, এবারের এল নিনো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে পৃথিবীর উষ্ণায়ন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ফলে এল নিনোর সময় যখন অতিরিক্ত উষ্ণতা তৈরি হয়, তখন তার ওপর এই বাড়তি উষ্ণতা যোগ হয়ে তাপপ্রবাহ, খরা ও ভারী বৃষ্টিপাতের মতো চরম পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এবারের এল নিনোর কারণে যে ধরনের চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে, তা ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাভাবিক বাস্তবতার একটি পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।
২০২৭ সাল হতে পারে রেকর্ড উষ্ণ
এল নিনো ও দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মিলিত প্রভাবে ২০২৭ সাল রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএমও।
২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময়ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্মিলিত প্রভাবে ২০২৪ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠেছিল। ওই সময় বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ দাবানল, নেপাল, সুদান ও স্পেনে ব্যাপক বন্যা এবং মেক্সিকো ও সৌদি আরবে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছিল।
কোথায় বন্যা, কোথায় খরা?
এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্য এশিয়ার কিছু এলাকায় সাধারণত বৃষ্টিপাত বাড়ে। এতে আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়।
২০২৪ সালে ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দো সুল রাজ্যে ভয়াবহ বন্যায় ১৮০ জনের বেশি মানুষ মারা যান এবং প্রায় ৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এল নিনোর সময় সাধারণত শুষ্কতা বাড়ে। এতে কৃষি উৎপাদন কমার পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ভারতেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ চাল উৎপাদক দেশটির চলতি বছরের চাল উৎপাদন ২০০৯-১০ সালের পর সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট খাতের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। ওই সময়ও এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট খরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছিল।
বাড়তে পারে খাদ্যসংকট
এল নিনোর আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যনিরাপত্তায়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খরা হলে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে, খাদ্যের দাম বাড়তে পারে এবং পানি ও জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
তাপপ্রবাহে বাড়তে পারে মৃত্যুঝুঁকি
এল নিনো শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আবহাওয়া বদলায় না; এর প্রভাব পৃথিবীর অনেক দূরের এলাকাতেও পৌঁছাতে পারে। ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হতে পারে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষকদের হিসাবে, এবারের এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে নাইজেরিয়ায়—প্রায় ৩১ হাজার ৪০০। এরপর ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০ এবং সুদানে ১৭ হাজার ৬০০ মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে গবেষকেরা বলছেন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, তাপপ্রবাহের সময় জরুরি সেবা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে কয়েক দশক হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
বন্যা-খরা ছাড়াও বদলাতে পারে ঝড়ের গতিপথ
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরণও ব্যাহত হতে পারে।
ফলে কৃষি, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, খাদ্যবাজার এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এবারের এল নিনো কেবল একটি সাময়িক আবহাওয়া পরিস্থিতি নয়—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এটি চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আগামী কয়েক মাসে এর তীব্রতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।












