ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে, যার আওতায় সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রতিবেদনটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে ইরান এই কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে আনে। তেহরানের দাবি, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় আগ্রহী হলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ থামানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
আরাকচির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবে সম্মত হলে সাত দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার পাশাপাশি বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘাত থামানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর উভয় পক্ষের সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে বৃহত্তর আলোচনা শুরু হতে পারে।
এই আলোচনার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও থাকতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে তেহরান এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। রয়টার্সকে এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রস্তাব গ্রহণ করলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো বিষয়ে ইরান কোনো ছাড় দেবে না।
ইরানের প্রস্তাবের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দেশটির ওপর আরোপিত কিছু কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাহার করতে হবে। আরাকচির বক্তব্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় করা এবং দেশটির ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে।
এর আগে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ইরান তার দাবিগুলো পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প তার কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ইরানে নতুন করে বোমা হামলা চালানোর সম্ভাবনাকেই তিনি বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছেন।
তবে রয়টার্স বলেছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ওই প্রতিবেদন তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের শান্তি উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথে দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্থিরতা ইতোমধ্যে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে।
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির দুই পাশে অবস্থান করছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রণালিটি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও। একই সময়ে লোহিত সাগর ও ইয়েমেনের আশপাশে হামলা বাড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির বিকল্প পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরাকচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানকে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে হওয়া সমঝোতা সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
সৌদি আরব ঘিরেও বাড়ছে সামরিক চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর হামলাও সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা ইয়েমেনের হুথিদের ছোড়া রিয়াদমুখী দুটি ড্রোন এবং খামিস মুশাইতমুখী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র intercept করেছে। হুথিরা জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথে হামলা চালিয়ে আসছে।
এই হামলা সৌদি আরবের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও নতুন চাপ তৈরি করছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যখন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত, তখন লোহিত সাগর হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির বিকল্প পথও অনিরাপদ হয়ে পড়লে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
সৌদি আরবের পাশে তুরস্ক ও পাকিস্তান
পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদারে দেশটির মিত্ররাও সক্রিয় হচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা শুক্রবার রিয়াদে বৈঠক করেছেন।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর এক দিন আগে সৌদি, পাকিস্তানি ও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোর মধ্যে বৈঠক করেন।
ফলে ইরানের শান্তি প্রস্তাব সামনে আসার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে তেহরান হরমুজ প্রণালি খুলে যুদ্ধ থামানোর প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ইয়েমেনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন যদি ইরানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় যায়, তাহলে সাত মাস ধরে চলা সংঘাত থামানোর নতুন কূটনৈতিক পথ তৈরি হতে পারে। আর প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়ে সামরিক অভিযান আবারও জোরদার হলে হরমুজ প্রণালি, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।












