মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে তিনটি সংবাদমাধ্যমের আইনি লড়াই আপাতত থামেনি। আদালতের আদেশে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি বাতিল হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত রায় এখনো আসেনি।
২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের ফেডারেল জেলা আদালতের বিচারক টিমোথি কেলি ১৪ দিনের জন্য ওই তিন সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউস প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করেছেন। তবে মামলার মূল প্রশ্ন—এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত দেননি তিনি।
কেন প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দিলেন আদালত
বিচারক কেলির আদেশের মূল ভিত্তি ছিল সাংবিধানিক ‘ন্যায্য প্রক্রিয়া’ বা ডিউ প্রসেসের প্রশ্ন। তার মতে, কোনো সাংবাদিককে হোয়াইট হাউসের প্রেস পরিচয়পত্র বা প্রবেশাধিকার দেওয়ার পর তা বাতিল করতে হলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে আগে বিষয়টি জানানোর এবং নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিতে হয়।
এই ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে আদালত মনে করেছে। ফলে তিনটি সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে করা আইনি চ্যালেঞ্জে তারা সফল হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিচারক মন্তব্য করেন।
তবে কেলি ইচ্ছাকৃতভাবেই মামলার আরও বড় সাংবিধানিক প্রশ্নটি এখনই নিষ্পত্তি করেননি। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনকে অপছন্দ করে তাদের হোয়াইট হাউস থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রথম সংশোধনীর অধিকার লঙ্ঘন করেছে কি না, সেটি এখনো অনির্ধারিত।
বিচারকের যুক্তি ছিল, ডিউ প্রসেসের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই এই মুহূর্তে প্রথম সংশোধনীর প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
২৮ সেপ্টেম্বর গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা
আদালতের দেওয়া ১৪ দিনের সাময়িক সুরক্ষা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে সংবাদমাধ্যমগুলোকে। ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের ‘প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা’ বা প্রিলিমিনারি ইনজাংশনের আবেদন করতে হবে।
এই আবেদন মঞ্জুর হলে মামলাটি চলাকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ তিন সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউস প্রবেশাধিকার দীর্ঘ সময়ের জন্য বহাল থাকতে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসন আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ পাবে। বিচারক কেলি যদি সাময়িক আদেশকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞায় রূপ দেন, ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটনের ফেডারেল আপিল আদালতের কাছে সেটি বাতিলের আবেদন করতে পারে।
ট্রাম্প আগেই আপিলের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন
বিচারকের সিদ্ধান্তের আগেই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি আদালতের রায়ে পরাজিত হলে আপিল করবেন। এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, এই সংবাদমাধ্যমগুলো প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ‘মিথ্যা’ ও ‘কাল্পনিক’ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তার প্রশাসন পরে আদালতে আরও বিস্তৃত যুক্তি তুলে ধরে।
মঙ্গলবার আদালতে দেওয়া এক নথিতে মার্কিন বিচার বিভাগ ওই সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস বলরুম নির্মাণ এবং সাম্প্রতিক রিপাবলিকান মধ্যবর্তী সম্মেলনে অংশগ্রহণের মতো বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে সংবাদমাধ্যমগুলোর আইনজীবীরা এসব যুক্তিকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর তৈরি করা অজুহাত হিসেবে দেখছেন।
একই বিচারকের সামনে ২০১৮ সালের ঘটনাও ছিল
এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারক টিমোথি কেলির আগের অভিজ্ঞতা। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সিএনএনের সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টার হোয়াইট হাউসের প্রেস পরিচয়পত্র বাতিল করা হয়েছিল।
সেই সময় কেলি অ্যাকোস্টার পক্ষে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এরপর হোয়াইট হাউস ওই সাংবাদিককে জানায় যে তার প্রেস পাস পুনর্বহাল করা হয়েছে। পরে অ্যাকোস্টা নিজেই মামলাটি প্রত্যাহার করেন।
বর্তমান মামলায়ও ডিউ প্রসেসের প্রশ্নটি সামনে আসায় ২০১৮ সালের সেই ঘটনার সঙ্গে নতুন মামলার মিল দেখা যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা আবার দেওয়ার সুযোগ কি থাকবে?
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা এখানেই।
তিন সংবাদমাধ্যমের আইনজীবী থিওডোর বুট্রোস আদালতে সতর্ক করেছেন, শুধু ডিউ প্রসেসের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আটকে দিলে ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যতে আরও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে একই সংবাদমাধ্যমগুলোকে আবার নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।
তার আশঙ্কা, প্রশাসন এবার এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত আগের সিদ্ধান্তকেই বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করবে।
বুট্রোস আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে অপসারণের চেষ্টার সঙ্গে বিষয়টির তুলনা করেন। তার বক্তব্যের মূল উদ্বেগ ছিল—শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সংশোধন করা হলে নিষেধাজ্ঞার মূল সাংবিধানিক প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সাময়িক আদেশের পরও প্রশাসনিকভাবে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
সামনে আরও বড় সাংবিধানিক লড়াই
এখন পর্যন্ত আদালতের সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য একটি সাময়িক আইনি সুরক্ষা তৈরি করেছে। কিন্তু এটি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সংঘাতের শেষ নয়।
বরং পরবর্তী ধাপে প্রথম সংশোধনীর অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউসের সংবাদকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি—এই তিনটি বিষয় আরও সরাসরি আদালতের সামনে আসতে পারে।
বুট্রোস বৃহস্পতিবার এমএস নাওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে তাদের প্রথম সংশোধনী-সংক্রান্ত যুক্তিই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে। তার মতে, সরকার এখন জাতীয় নিরাপত্তার যে যুক্তি দিচ্ছে, সেটিকে আদালতে আরও জোরালো করার চেষ্টা করতে পারে।
ফলে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার আপাতত ফিরলেও, ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যকার এই আইনি সংঘাত এখনো অনেক দূর গড়াতে পারে। ২৮ সেপ্টেম্বরের পর আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তই ঠিক করবে, এই সাময়িক বিজয় দীর্ঘমেয়াদি আইনি সুরক্ষায় রূপ নেয় কি না।












