পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। পা যেন নিজের ওজনই আর বহন করতে চায় না। মাথা ঘুরে ওঠে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, আর মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—আমি কি পারব?
অনেকের কাছে উচ্চতা মানেই রোমাঞ্চ। কিন্তু কারও কারও কাছে সেটাই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। সেই আতঙ্ককে জয় করার জন্যই এক ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে গেলেন এমন এক অভিযানে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নিজের ভয়কে অতিক্রম করার নতুন পরীক্ষা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাডিরনড্যাক পর্বতমালার মনোমুগ্ধকর গিরিখাত ‘অসেবল চ্যাজম’-এ তিনি অংশ নেন একটি বিশেষ পাহাড়ি অভিযানে। এই অভিযানের নাম ‘ভিয়া ফেরাতা’—একটি নিরাপদ পাহাড়ি আরোহনপথ, যেখানে লোহার ধাপ, ঝুলন্ত সেতু ও নিরাপত্তা দড়ির সহায়তায় খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
ভয়ের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত
গিরিখাতের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে সামনে ঝুলন্ত সরু সেতুটি দেখে তাঁর শরীর কাঁপতে শুরু করে। নিচে তীব্র স্রোতের নদী, চারদিকে উঁচু পাথরের দেয়াল। নিরাপত্তা বেল্ট শরীরে বাঁধা থাকলেও মনে হচ্ছিল, সামান্য ভুলেই যেন সব শেষ হয়ে যাবে।
তবু পেছনে ফেরার সুযোগ ছিল না। সামনে এগোনোই একমাত্র পথ।
এই অভিযানে অংশ নেওয়ার কারণ ছিল রোমাঞ্চ খোঁজা নয়। বরং বহু বছরের উচ্চতাভীতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজেই নিজেকে ধীরে ধীরে কঠিন পাহাড়ি পথে নিয়ে গেছেন। কখনও খাড়া পাথরের ওপর উঠে, কখনও বিপজ্জনক পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে।
এই ভিয়া ফেরাতা ছিল সেই দীর্ঘ অনুশীলনেরই পরবর্তী ধাপ।
ভয় কাটানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, উচ্চতাভীতি দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতির একটি হলো ধাপে ধাপে সেই ভয়ের মুখোমুখি হওয়া।
অর্থাৎ ভয় থেকে পালিয়ে নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশে ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে নিয়ে গেলে মস্তিষ্ক নতুনভাবে শেখে—আতঙ্কের মধ্যেও নিরাপদ থাকা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, এই ধরনের নিয়মিত অনুশীলনে অধিকাংশ মানুষই উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারেন। তবে শর্ত একটাই—নিজেকেই সাহস করে সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পর্যটনের আকর্ষণ
আজ যেটি রোমাঞ্চপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণ, তার জন্ম কিন্তু যুদ্ধের প্রয়োজন থেকে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির ডলোমাইট পর্বতমালায় সৈন্যদের চলাচলের সুবিধার জন্য পাহাড়ে লোহার ধাপ, তার ও ঝুলন্ত পথ তৈরি করা হয়েছিল। পরে সেই পথই ধীরে ধীরে পরিণত হয় নিরাপদ পাহাড়ি অভিযানের বিশেষ ব্যবস্থায়।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের পথ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাহাড়ে ওঠার বিশেষ দক্ষতা না থাকলেও প্রশিক্ষক ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের সহায়তায় সাধারণ মানুষও এই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
প্রতিটি পদক্ষেপ যেন নতুন যুদ্ধ
অভিযানের শুরুতেই অংশগ্রহণকারীদের শেখানো হয় কীভাবে নিরাপত্তার হুক কখনও সম্পূর্ণ খুলে না রেখে একটির পর একটি বদলাতে হবে।
এরপর শুরু হয় প্রকৃত পরীক্ষা।
প্রথম ঝুলন্ত সেতুতেই তাঁর পা কাঁপতে থাকে। তিনি নিজেকে বোঝাতে থাকেন—আরও কয়েক কদম, তারপর আবার কয়েক কদম। পুরো পথ নয়, ছোট ছোট অংশে ভাগ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
প্রতিবার নিরাপত্তার হুক এক তার থেকে আরেক তারে সরানোর সময় তাঁর মনে হচ্ছিল যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি সম্পূর্ণ শূন্যে ঝুলে আছেন।
পরে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেন, উচ্চতায় মানুষের মস্তিষ্ক আশপাশে স্থির কোনো অবলম্বন না পেলে ভারসাম্য নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তখন শরীরও অস্থির হয়ে ওঠে, যদিও বাস্তবে নিরাপত্তার ঝুঁকি খুবই কম থাকে।
কেউ ভালোবাসে, কেউ ভয় পায়
অভিযানের অন্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সবার অভিজ্ঞতা এক নয়।
কেউ পাহাড়ের উচ্চতা দারুণ উপভোগ করেন। কেউ আবার তাঁর মতোই এখনও ভয় পান, যদিও আগের তুলনায় অনেক কম।
এক নারী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতীয় উদ্যানে কঠিন পাহাড়ি পথে হেঁটে তিনি নিজের ভয় অনেকটাই কমিয়েছেন। কিন্তু এখনও উচ্চতায় দাঁড়ালে অস্বস্তি পুরোপুরি দূর হয়নি।
এই অভিজ্ঞতা লেখকের কাছে নতুন উপলব্ধি এনে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, সাহসী মানুষ মানেই ভয়হীন মানুষ নয়। বরং ভয়কে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাই আসল সাহস।

শেষ সেতুতেই বদলে গেল অনুভূতি
অভিযানের শেষ অংশটি ছিল সবচেয়ে কঠিন।
নদীর অনেক ওপরে ঝুলে থাকা একটি সেতু পার হতে হচ্ছিল। শুরুতে আবারও আতঙ্ক গ্রাস করেছিল তাঁকে। কিন্তু ধীরে ধীরে মাঝপথে পৌঁছে তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন—পা আর কাঁপছে না।
প্রথমবারের মতো তিনি নিচের উত্তাল নদীর দিকে শান্তভাবে তাকাতে পারলেন। চারপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্যও উপভোগ করতে শুরু করলেন।
সেই মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করলেন, সাহস মানে ভয়কে মুছে ফেলা নয়। সাহস মানে ভয়ের উপস্থিতি সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যাওয়া।
ভয় কখনও পুরোপুরি হারায় না
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চতাভীতি কিংবা অন্য কোনো ভয় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়—এমনটি সব সময় ঘটে না।
বরং মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বারবার নিরাপদভাবে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আতঙ্কের তীব্রতা কমতে থাকে। মানুষ শিখে যায়, ভয় পেলেও সে এগিয়ে যেতে সক্ষম।
এই শিক্ষাই মানুষকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত সেই পাহাড়ি সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে লেখক উপলব্ধি করেন, সবচেয়ে বড় বিজয় পাহাড় জয় করা নয়—নিজের ভয়কে অতিক্রম করার শক্তি অর্জন করা। কারণ সাহস জন্মগত নয়; সাহস তৈরি হয় প্রতিবার ভয়কে সামনে রেখে আরেকটি পদক্ষেপ এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















