ফরিদপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং আরও ১০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মুহাম্মদ মিয়াজী।
তিনি মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, তদন্তে অভিযুক্ত ১১ জন ডিবি সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যু ও তদন্তের সূত্রপাত
মধুখালী উপজেলার পশ্চিম গন্ধারদিয়া এলাকার বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তকে গত ২০ জুন ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে তার বাড়ির সামনে থেকে ডিবি পুলিশ আটক করে।
পুলিশের দাবি, ডিবি হেফাজতে থাকাকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরদিন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
প্রান্ত ফরিদপুর ল’ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ফরিদপুর সুগার মিলে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতেন।
মাদক মামলায় অসঙ্গতির অভিযোগ
ঘটনার পরদিন ২১ জুন অভিযানে অংশ নেওয়া উপপরিদর্শক (এসআই) আহাদুজ্জামান মধুখালী থানায় একটি মাদক মামলা করেন। মামলায় দাবি করা হয়, অভিযানের সময় প্রান্তর কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয় এবং তিনি নিজেই তা নিজের কাছে থাকার কথা স্বীকার করেন।
তবে পরে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযানের ঘটনাটি দিনের আলোতে ঘটেছে। ভিডিওতে প্রান্তকে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখা গেলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়, তিনি প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা বের করে দেন।
এছাড়া মামলায় উল্লেখ করা দুই সাক্ষী তদন্তকারীদের জানান, তারা উদ্ধার অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। পরে বিভ্রান্তি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের দিয়ে নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়।

পরিবারের ঘুষ দাবির অভিযোগ
প্রান্তর মা খাদিজা আক্তার অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আটকের রাতেই ডিবি সদস্যরা ৬৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে পরদিন সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলা হয়।
তার দাবি, তিনি টাকা নিয়ে পৌঁছালেও ছেলেকে জীবিত ফিরে পাননি; বরং তার মরদেহ গ্রহণ করতে হয়।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ
ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর জেলা পুলিশ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. শামসুল আজম এবং জেলা বিশেষ শাখার (এসবি) ওসি মোশাররফ হোসেন।
পুলিশ সুপার জানান, তদন্তে অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক কর্মকর্তার কোনো না কোনো মাত্রায় দায়িত্ব পাওয়া গেছে। তাই প্রত্যেকের ভূমিকা পৃথকভাবে নির্ধারণে বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে তিনি মাদক উদ্ধারের দাবি, অভিযানের সময় নিয়ে অসঙ্গতি, সাক্ষীদের উপস্থিতি কিংবা প্রান্তর পরিবারের ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘটনার পর ডিবির তৎকালীন ওসি এবং অভিযানে অংশ নেওয়া বাকি ১০ পুলিশ সদস্যকে ফরিদপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
ফরিদপুরে হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় ডিবির সাবেক ওসি-সহ ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে জেলা পুলিশের তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















