অত্যন্ত ধনী মানুষের ব্যক্তিগত শেফ হওয়া বাইরে থেকে যতটা বিলাসী মনে হয়, বাস্তবে তার বড় অংশই কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা এবং অবিরাম চাপের। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন পরিচয় গোপন রাখা এক প্রাইভেট শেফ, যিনি তিন দশকের পেশাগত জীবনে মিশেলিন-তারকাখ্যাত রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বিশ্বের ধনকুবেরদের ব্যক্তিগত রান্নাঘর পর্যন্ত কাজ করেছেন।
তিনি জানান, লন্ডনের ডরচেস্টারে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিদেশে একটি মিশেলিন-তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ হিসেবে কাজ করেন। পরে লন্ডনে ফিরে একটি বিলাসবহুল গয়নার প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী শেফ হিসেবে যোগ দেন। সেখানে প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং তাদের অতিথিদের জন্য রান্না করাই ছিল তার দায়িত্ব। কখনও কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের হীরার আংটি কিনতে আসা ক্রেতার জন্যও বিশেষ মধ্যাহ্নভোজ প্রস্তুত করতে হয়েছে।
উন্মুক্ত বাজেট, সীমাহীন চাহিদা

শেফের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় বাজেট কার্যত সীমাহীন ছিল। ট্রাফল মৌসুমে হাজার হাজার পাউন্ড ব্যয়ে সাদা ট্রাফল এবং দামী বারগান্ডি ওয়াইন কেনা হতো। কখনও দুই মালিকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রেস্তোরাঁ থেকে খাবার এনে রূপার থালায় পরিবেশন করতেও হয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব প্রাইভেট শেফ ব্যবসা শুরু করেন। পরিচিতজনের সুপারিশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এজেন্টের মাধ্যমে নতুন ক্লায়েন্ট পান। অনেক সময় মাত্র ৩৬ ঘণ্টার নোটিশে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্য—যেমন সাঁ-ত্রোপে, মিকোনোস, সেন্ট মোরিৎজ বা গস্টাডে—উড়ে যেতে হয়।
বিলাসবহুল ভিলা, কিন্তু কর্মীদের জন্য নয়
তার ভাষায়, বাইরে থেকে ব্যক্তিগত জেট ও বিলাসবহুল ভিলার জীবন আকর্ষণীয় মনে হলেও কর্মীদের বাস্তবতা ভিন্ন। কোটি টাকার ভিলায় অতিথিরা থাকলেও শেফদের অনেক সময় জানালাবিহীন ছোট কক্ষ, এমনকি গ্যারেজের পাশের ঘরেও থাকতে হয়।
গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বিশ্রামের সুযোগ নেই। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বাজার, তারপর ভিলায় গিয়ে রান্না শুরু করতে হয়। প্রতিদিন ভোরে বাজারে গিয়ে তাজা উপকরণ সংগ্রহ, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্নাঘরে প্রস্তুত থাকা—সবই নিয়মিত কাজের অংশ। তার দৈনিক পারিশ্রমিক ৫০০ পাউন্ড, এর সঙ্গে টিপস যোগ হয়।
অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত
ধনী ক্লায়েন্টদের খাদ্যাভ্যাসও প্রায়ই বিস্ময়কর। কেউ ২৫ ধরনের খাদ্য নিষেধাজ্ঞার তালিকা দেন, কেউ আবার বেগুনি রঙের কোনো খাবারই খান না। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নিয়ম বদলে যেতে পারে। অনেক নিরামিষভোজী বা ভেগান অতিথিও পরে স্টেক খেতে চান।
তিনি জানান, সাঁ-ত্রোপেতে একটি সি-বাস মাছের দাম ৫০০ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে, আর ১২টি বিশেষ সাদা স্ট্রবেরির দাম ২০ ইউরো। এক ক্লায়েন্ট প্রতিদিন সকালের নাশতায় একাই ৮০ ইউরোর বেরি খেতেন।
কখনও অতিথিরা আগের রাতে যে মেনু ঠিক করেন, পরদিন সেটি পুরোপুরি বদলে দেন। আবার ৩০ জনের পার্টির জন্য সারাদিন রান্না করেও দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত কেউই আসেননি।
কুকুরের জন্যও বিশেষ মেনু
এক বছর তিনি একটি দম্পতির জন্য ভ্রমণ-সহচর শেফ হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তাদের পোষা কুকুরের জন্যও আলাদা রান্না করতে হতো। বিশেষ নির্দেশ ছিল, কুকুরের জন্য ফিলে স্টেক ও পরিপক্ব পারমেজান চিজ এমন সময়ে পরিবেশন করতে হবে, যখন মালিকেরা নিজেদের মধ্যাহ্নভোজ করবেন।
আরেক ধনী ক্লায়েন্ট তিন মাসের জন্য তাকে সপ্তাহে ১০ হাজার ইউরো বাজেট দিয়েছিলেন মাত্র দুই থেকে চারজনের খাবারের জন্য। একবার হেলিকপ্টারে আসার পথে ক্লায়েন্ট ফোন করে জানান, আগে প্রস্তুত করা সি-বাসের বদলে অতিথি স্টেক চাইছেন। তখন তিনি দ্রুত স্থানীয় হোটেল থেকে ৫০০ পাউন্ড খরচ করে একটি সম্পূর্ণ ফিলে বিফ কিনে এনে কয়েক মিনিটের মধ্যে রান্না শুরু করেন, যাতে অতিথি পৌঁছানোর সময় গ্রিলে মাংসের শব্দ শোনা যায়।

রুচির পরিবর্তন, নতুন প্রবণতা
শেফের মতে, ধনীদের খাদ্যরুচিতেও পরিবর্তন এসেছে। একসময় লবস্টার ও ক্যাভিয়ারের চাহিদা বেশি থাকলেও এখন স্থানীয় উপকরণ, মসলা, সালাদ, শস্যভিত্তিক খাবার এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ওজন কমানোর ওষুধ জনপ্রিয় হওয়ার পর খাবারের পরিমাণও ছোট হয়েছে এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ মেনুর চাহিদা বেড়েছে।
তার পর্যবেক্ষণ, এখন অনেক অতিথির কাছে খাবার শুধু খাওয়ার বিষয় নয়, এটি এক ধরনের প্রদর্শনও। তারা খাবির ছবি তোলেন, সামান্য স্বাদ নেন, প্রশংসা করেন, তারপর টেবিল ছেড়ে চলে যান।
এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, বিশ্বের অতি ধনীদের ব্যক্তিগত রান্নাঘরে বিলাসিতা যেমন সীমাহীন, তেমনি সেই বিলাসের আড়ালে কর্মরত মানুষের জীবনও সমানভাবে কঠোর, অনিশ্চিত এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
দ্য টাইমসে কেটি গ্লাসকে দেওয়া এক পরিচয়-গোপন রাখা প্রাইভেট শেফের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















