১১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬
ভুল অস্ত্রোপচারে রোগীর জীবন সংকটে, ওল্ডহামের সার্জনকে চিকিৎসা পেশা থেকে বহিষ্কার চাঁদে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে স্পেসএক্সের রকেট, তৈরি হতে পারে বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য অ্যারন রজার্সের বিস্ফোরক অভিযোগ, ডায়ানা রুসিনি-মাইক ভ্রাবেল কাণ্ডে এনএফএল নীতির প্রশ্ন ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় শেষ, বাড়ছে উদ্বেগ ইবোলা আতঙ্কে হাসপাতালে যাচ্ছেন না গর্ভবতী নারীরা, কঙ্গোতে বাড়ছে মাতৃমৃত্যু গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে নতুন জটিলতা, স্পষ্ট ব্যাখ্যা চায় হামাস ট্রাম্প বলছেন আলোচনা চলছে, ইরানের দাবি—কোনো বৈঠকই হচ্ছে না বছরের পর বছর অপেক্ষার পর ফিরছে টিভি সিরিজ, দর্শকের ধৈর্যের পরীক্ষা অভিনয় থেকে গানে স্টর্ম রিডের নতুন পরিচয়, এবার সামনে আসছে তাঁর অন্য এক রূপ মুখ নয়, এবার হাত! তারুণ্য ধরে রাখতে নতুন সৌন্দর্য প্রবণতায় বাড়ছে হাতের যত্ন

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যাত্রীরা

সকালের প্রথম আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ সাভানায় একদল আফ্রিকান হাতি ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে। তাদের সামনে কোনো রাস্তা নেই, নেই মানুষের আঁকা মানচিত্র। তবু তারা যেন জানে কোথায় যেতে হবে। দলের সবচেয়ে প্রবীণ মাদি হাতিটি একবারও থেমে চারপাশে তাকায় না। সে এগিয়ে চলে এমন আত্মবিশ্বাসে, যেন এই পথ তার বহু প্রজন্মের স্মৃতিতে লেখা আছে।

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, উত্তর আমেরিকার আর্কটিক টুন্ড্রায় ক্যারিবুর বিশাল পাল বরফ গলা নদী পেরিয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে ছুটছে। তাদের সামনে জন্ম নিচ্ছে নতুন ঘাস, নতুন জীবন। একই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে একটি হাম্পব্যাক তিমি ধীরে ধীরে উত্তর দিকের ঠান্ডা জল ছেড়ে উষ্ণ সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছে—সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। রাত নামলে আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনে ফলভুক বাদুড় শত শত কিলোমিটার উড়ে যাবে পাকা ফলের সন্ধানে। আর দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে একটি জাগুয়ার নীরবে অনুসরণ করবে সেই পথ, যেদিকে কয়েক ঘণ্টা আগে চলে গেছে হরিণের একটি দল।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিন ঘটে। বেশিরভাগ মানুষ সেগুলো কখনও দেখে না। কিন্তু পৃথিবীর জীবনকে সচল রাখার জন্য এগুলোর গুরুত্ব নদীর প্রবাহ কিংবা ঋতুর পরিবর্তনের মতোই মৌলিক।

আমরা মানুষ নিজেদের ভ্রমণ নিয়ে গর্ব করি। আমরা মহাসাগর পাড়ি দিই, মহাকাশে যাই, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছে যাই। অথচ আমাদের অনেক আগে থেকেই এই গ্রহের প্রকৃত অভিযাত্রীরা নিরন্তর পথ চলেছে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তন তাদের শিখিয়েছে কখন যাত্রা শুরু করতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কোন নদী পার হতে হবে, কোন পাহাড় এড়িয়ে যেতে হবে, আর কখন ফিরে আসতে হবে সেই পুরোনো আবাসভূমিতে।

বিজ্ঞানীরা আজ এই চলাচলকে শুধু “মাইগ্রেশন” বা অভিবাসন বলে বর্ণনা করেন না। তারা একে বলেন মুভমেন্ট ইকোলজি—চলাচলের পরিবেশবিদ্যা। কারণ প্রাণীর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি বৃহত্তর গল্প। সেই গল্প খাদ্যের, জলের, ঋতুর, প্রজননের, শিকারি ও শিকারের, এমনকি বন ও নদীরও।

Trees, rivers and mountains are gaining legal status — but it's not been a quick fix for environment

পৃথিবী আসলে চলমান

আমরা পৃথিবীকে প্রায়ই স্থির মনে করি। বন মানে স্থির গাছ, পাহাড় মানে অচল পাথর, নদী মানে নির্দিষ্ট প্রবাহ। কিন্তু প্রকৃতির ভেতরে সবকিছুই চলমান। বাতাসে ভেসে যায় বীজ। সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় পুষ্টি। নদী বয়ে নিয়ে যায় পলি। আর প্রাণীরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বহন করে জীবনের অদৃশ্য সংযোগ।

একটি হাতি যখন বন পেরিয়ে যায়, তখন সে শুধু নিজের শরীর নিয়ে হাঁটে না। তার সঙ্গে চলতে থাকে শত শত উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ। কারণ তার খাওয়া ফলের বীজ বহু দূরে গিয়ে মাটিতে পড়ে নতুন গাছ জন্মায়। একটি বাদুড় রাতের অন্ধকারে যে ফুলে বসে, তার পরাগ অন্য বনে পৌঁছে যায়। একটি নেকড়ে বা বাঘ যে তৃণভোজী প্রাণী শিকার করে, তার ফলে বনজ উদ্ভিদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে যায়। একটি তিমি গভীর সমুদ্র থেকে পৃষ্ঠে উঠে এসে যে পুষ্টি ছড়িয়ে দেয়, তা অণুজীব থেকে শুরু করে মাছ পর্যন্ত অসংখ্য প্রাণীর জীবনচক্রে প্রভাব ফেলে।

অর্থাৎ, প্রাণীদের চলাচল পৃথিবীর অদৃশ্য রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। রক্ত যেমন শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে অক্সিজেন বহন করে, তেমনি প্রাণীরা বহন করে বীজ, পুষ্টি, জিনগত বৈচিত্র্য এবং জীবনের ধারাবাহিকতা।

যাত্রার ভাষা

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—তারা পথ খুঁজে পায় কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে গবেষণা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রাণীরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করতে পারে। কেউ সূর্যের অবস্থান দেখে, কেউ নক্ষত্রের, কেউ গন্ধের, কেউ নদীর প্রবাহের। হাতিরা বহু বছর আগের খরার স্মৃতি মনে রাখতে পারে। অভিজ্ঞ মাদি হাতিরা জানে কোন মৌসুমে কোন জলাধারে এখনও পানি থাকে। নেকড়েরা পাহাড়ি উপত্যকার বাতাসে শিকারের গন্ধ ধরে। বাদুড় শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অন্ধকারে পথ খুঁজে নেয়।

Forest elephants play in the salt marshes of the Dzanga Sangha reserve

অর্থাৎ, তাদের মানচিত্র কাগজে আঁকা নয়; সেটি লেখা থাকে স্মৃতিতে, প্রবৃত্তিতে এবং প্রকৃতির সংকেতে।

এই জ্ঞান বই থেকে শেখা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বিবর্তনের উত্তরাধিকার।

যে যাত্রা শুধু নিজের জন্য নয়

প্রকৃতিতে খুব কম ঘটনাই একক কোনো প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একটি হাতির পথচলা শেষ পর্যন্ত হাতির গল্প নয়। সেটি বনের গল্প। একটি বাদুড়ের রাতের উড়ান কেবল খাদ্যের গল্প নয়; সেটি আগামী মৌসুমের ফলের গল্প। একটি তিমির সমুদ্রযাত্রা শুধু প্রজননের নয়; সেটি সমুদ্রের উৎপাদনশীলতার গল্প।

এই কারণেই পরিবেশবিদরা আজ ক্রমশ একটি নতুন উপলব্ধির কথা বলছেন। তারা বলছেন, সংরক্ষণ মানে শুধু প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; তাদের চলার স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।

একটি জাতীয় উদ্যান, একটি সংরক্ষিত বন কিংবা একটি অভয়ারণ্য গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয়। যদি সেই বন অন্য বনের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, যদি একটি নদী পার হওয়ার পথ কংক্রিটের দেয়ালে আটকে যায়, যদি শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত অভিবাসনপথের মাঝখানে উঠে দাঁড়ায় একটি মহাসড়ক, তাহলে কাগজে সংরক্ষণ থাকলেও প্রকৃতির ছন্দ ভেঙে যেতে শুরু করে।

আর ঠিক এখানেই এসে মিলিত হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান ও এক গভীর উদ্বেগ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে জিপিএস কলার বসিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক তথ্যভান্ডার তৈরি করেছেন, যা আগে কখনও সম্ভব ছিল না। প্রথমবারের মতো তাঁরা দেখতে পেরেছেন—প্রাণীরা শুধু কোথায় যায় তা নয়, কোথায় আর যেতে পারছে না।

সেই আবিষ্কারই আজ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত নতুন গবেষণার কেন্দ্রে। আর সেই গবেষণার ফল বলছে, পৃথিবীর মানচিত্র হয়তো বড়ই আছে, কিন্তু বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পৃথিবী দ্রুত ছোট হয়ে আসছে।

যখন মানুষের পৃথিবী বড় হয়, প্রাণীদের পৃথিবী ছোট হয়ে আসে

একসময় বন্য প্রাণীর চলাচল নিয়ে গবেষণা মানে ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। কোনো হাতির পায়ের ছাপ অনুসরণ করা, দূরবীন হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা, কিংবা রেডিও কলারের ক্ষীণ সংকেত ধরে পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে যাওয়া। একটি প্রাণী এক মৌসুমে কোথায় গেল, কেন গেল, আবার ফিরল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে কখনও কখনও লেগে যেত বছরের পর বছর।

আজ সেই চিত্র বদলে গেছে।

No photo description available.

স্যাটেলাইট, জিপিএস কলার, রিমোট সেন্সিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞানীদের সামনে এমন এক পৃথিবী খুলে দিয়েছে, যেখানে হাজার হাজার প্রাণীর প্রতিটি পদক্ষেপ ডিজিটাল মানচিত্রে ফুটে ওঠে। কোনো হাতি দিনে কত কিলোমিটার হাঁটল, একটি নেকড়ে কখন পাহাড়ি উপত্যকা পার হলো, একটি ভালুক কখন মানুষের বসতির কাছাকাছি এলো—সবই এখন তথ্য।

এই বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করেই সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাটি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর দীর্ঘমেয়াদি চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন একটি চিত্র পেয়েছেন, যা একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং উদ্বেগজনক।

তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে, মানুষ যেখানে বেশি, সেখানে প্রাণীদের পৃথিবী ছোট।

একটি রাস্তা শুধু রাস্তা নয়

আমরা সাধারণত একটি নতুন মহাসড়ককে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখি। সেটি দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ দেয়, ব্যবসা বাড়ায়, শহরকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু একই রাস্তা একটি হাতির কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

ধরা যাক, কয়েক শত বছর ধরে একটি হাতির পাল বর্ষা এলেই একটি বন থেকে আরেকটি বনে যায়। মাঝখানে একটি নদী, তারপর খোলা তৃণভূমি। হঠাৎ সেই পথের ওপর তৈরি হলো চার লেনের মহাসড়ক।

মানুষের কাছে এটি একটি অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু হাতির কাছে এটি এমন একটি বাধা, যা হয়তো তার পূর্বপুরুষেরা কখনও কল্পনাও করেনি।

কিছু প্রাণী ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়। অনেকেই পারে না। কেউ ফিরে যায়। কেউ মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কেউ মারা যায়।

ফলে যে যাত্রাপথ হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির অংশ ছিল, সেটি কয়েক বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে।

Farmers switch off lights at night to protect wildlife and improve crop-supporting ecosystems | - The Times of India

অদৃশ্য দেয়াল

সব বাধা অবশ্য কংক্রিটের নয়।

কৃষিজমির বেড়া, শিল্পাঞ্চল, খনি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো, এমনকি রাতভর জ্বলে থাকা কৃত্রিম আলোও প্রাণীদের চলাচলে প্রভাব ফেলে। কোথাও তারা পথ বদলে ফেলে, কোথাও সময় বদলে ফেলে। দিনের প্রাণী রাতের অন্ধকারে চলতে শুরু করে, শুধু মানুষের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে।

এটি শুধু আচরণের পরিবর্তন নয়; এটি তাদের শক্তি ব্যয়ের ধরন বদলে দেয়, খাদ্য সংগ্রহের সময় কমিয়ে দেয়, প্রজননের সুযোগ সীমিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো জনসংখ্যাকে দুর্বল করে তুলতে পারে।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন “ল্যান্ডস্কেপ ফ্র্যাগমেন্টেশন”—প্রকৃতিকে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ভাগ করে ফেলা।

একটি বন হয়তো এখনও মানচিত্রে আছে। কিন্তু যদি সেই বন আর পাশের বনের সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে সেটি ধীরে ধীরে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।

জলবায়ু বদলালে পথও বদলায়

প্রাণীরা সব সময় একই পথে চলে না। তারা প্রকৃতির সংকেত অনুসরণ করে।

কোথায় আগে বৃষ্টি হলো, কোথায় ঘাস দ্রুত গজাল, কোথায় নদী শুকিয়ে গেল—এসব তথ্যই তাদের যাত্রা নির্ধারণ করে।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই সংকেতগুলোই বদলে যাচ্ছে।

আর্কটিকে বরফ আগের তুলনায় দ্রুত গলছে। আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে দীর্ঘ খরা বাড়ছে। কোথাও বৃষ্টির সময় পিছিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার অস্বাভাবিক বন্যা নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

ফলে প্রাণীরা নতুন পথ খুঁজছে। কিন্তু সেই নতুন পথের মাঝখানে প্রায়ই রয়েছে মানুষের তৈরি শহর, সড়ক, রেললাইন কিংবা কৃষিজমি।

অর্থাৎ, প্রকৃতি তাদের সামনে নতুন দরজা খুলছে, আর মানুষ একই সময়ে অনেক পুরোনো দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।

World Elephant Day: World's shrinking for elephants | Prothom Alo

বাংলাদেশের আয়নায়

এই বৈশ্বিক গল্প বাংলাদেশের জন্যও অপরিচিত নয়।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের এশীয় হাতিরা বহুদিন ধরে নির্দিষ্ট করিডর ব্যবহার করে এক বন থেকে আরেক বনে যাতায়াত করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে দ্রুত জনবসতি, সড়ক, রিসোর্ট, কৃষিজমি ও অন্যান্য অবকাঠামো সেই করিডরের অনেক অংশকে সংকুচিত করেছে।

ফলাফল স্পষ্ট। মানুষ ও হাতির সংঘর্ষ বেড়েছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে, প্রাণহানি ঘটছে, আর প্রতিবারই সংঘাতের কেন্দ্রে থাকে একই প্রশ্ন—প্রাণীরা কি মানুষের এলাকায় ঢুকছে, নাকি মানুষই তাদের পুরোনো পথের ওপর বসতি গড়ে তুলেছে?

এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের নয়। আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বহু দেশ একই বাস্তবতার মুখোমুখি।

তাই সংরক্ষণবিজ্ঞান আজ একটি নতুন ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে—ওয়াইল্ডলাইফ করিডর। শুধু বন সংরক্ষণ নয়, বনগুলোর মধ্যে নিরাপদ সংযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চলাচলের স্বাধীনতা হারালে একটি প্রাণীর বেঁচে থাকা যেমন কঠিন হয়, তেমনি দুর্বল হয়ে পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্র।

কিন্তু যদি সমাধান শুধু আরও বেশি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা না হয়, তাহলে কী হতে পারে সেই নতুন পথ? আর প্রকৃতি ও উন্নয়নের মধ্যে আদৌ কি কোনো ভারসাম্য সম্ভব?

 পৃথিবীকে কি আবার প্রাণীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব?

প্রকৃতির ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন মানুষ ভেবেছে—কোনো একটি ক্ষতি আর পূরণ করা সম্ভব নয়। একসময় ইউরোপের বহু নদীকে মৃতপ্রায় বলা হতো। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ প্রেইরি হারিয়ে যাবে বলেও ধারণা ছিল। অনেক বন্যপ্রাণীকে মনে করা হয়েছিল, তারা আর কখনও ফিরে আসবে না।

কিন্তু সংরক্ষণবিজ্ঞানের ইতিহাস আরেকটি শিক্ষা দেয়—প্রকৃতি সুযোগ পেলে ফিরে আসতে জানে।

গত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেছেন, যা একসময় কল্পনার মতো শোনাত। সেটি হলো বন্যপ্রাণীর জন্য অবাধ চলাচলের পথ ফিরিয়ে দেওয়া

The Netherlands built green bridges over highways so deer, badgers, and wildlife can cross safely-reconnecting forests split by roads.

যখন সেতু শুধু মানুষের জন্য নয়

নেদারল্যান্ডসে মহাসড়কের ওপর সবুজে ঢাকা বিশেষ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো মানুষ নয়, ব্যবহার করে হরিণ, শিয়াল, বন্য শূকর, ব্যাজার ও অন্যান্য প্রাণী। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে পাহাড়ি সড়কের ওপর তৈরি হয়েছে ‘ওয়াইল্ডলাইফ ওভারপাস’ এবং নিচে নির্মিত হয়েছে বিশেষ আন্ডারপাস। ক্যামেরা বসিয়ে দেখা গেছে, কিছু বছরের মধ্যেই হাজার হাজার প্রাণী নিরাপদে এসব পথ ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

প্রথমে এগুলোকে ব্যয়বহুল প্রকল্প মনে হয়েছিল। পরে গবেষণায় দেখা যায়, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষ কমেছে, প্রাণহানি কমেছে, যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতিও কমেছে। অর্থাৎ, প্রকৃতিকে পথ ফিরিয়ে দেওয়া শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানুষের অর্থনীতির জন্যও লাভজনক।

আফ্রিকার কিছু দেশে হাতির করিডর সংরক্ষণের জন্য গ্রাম, সংরক্ষিত বন ও কৃষিজমির মধ্যে নতুন ধরনের ভূমি-পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোথাও বেড়া সরানো হয়েছে, কোথাও বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে, কোথাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ উদ্যোগের অংশীদার করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের একটি সাধারণ বার্তা আছে—প্রাণীদের থামিয়ে দিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেও নিরাপদ থাকতে পারে না।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানচিত্র

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো, পৃথিবীকে আলাদা আলাদা সংরক্ষিত এলাকার সমষ্টি হিসেবে দেখলে হবে না। একটি জাতীয় উদ্যান, একটি বন বা একটি অভয়ারণ্য আলাদাভাবে যতই সমৃদ্ধ হোক, যদি সেটি অন্য প্রাকৃতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই বিচ্ছিন্নতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

একটি তরুণ পুরুষ বাঘ নতুন এলাকা খুঁজতে চায়। একটি হাতির পাল খরার সময় নতুন পানির উৎসে যেতে চায়। একটি নেকড়ের দল নতুন শিকারের সন্ধানে পাহাড় পেরোতে চায়। যদি তারা কোথাও যেতে না পারে, তাহলে একই অঞ্চলের ছোট একটি জনসংখ্যার মধ্যেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রজনন চলতে থাকে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যায়, রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সংরক্ষণ তাই আজ শুধু প্রাণী গণনার বিষয় নয়; এটি সংযোগের বিজ্ঞান।

Why Is Bangladesh so Dense and Threatened by Sea Level Rise?

বাংলাদেশের সামনে যে সুযোগ

বাংলাদেশের আয়তন ছোট, জনসংখ্যা ঘন, উন্নয়নের চাপ তীব্র। তবু এই বাস্তবতা সংরক্ষণের সম্ভাবনাকে বাতিল করে না।

বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এশীয় হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথ চিহ্নিত করে সেগুলোকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি। একইভাবে সুন্দরবনের সঙ্গে সংযুক্ত জলাভূমি, বনাঞ্চল ও নদীপথের পরিবেশগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এর অর্থ এই নয় যে উন্নয়ন থেমে যাবে। বরং উন্নয়নের নকশায় শুরু থেকেই প্রকৃতির চলাচলের জায়গা রাখা হবে। একটি নতুন মহাসড়ক নির্মাণের আগে যেমন যানবাহনের প্রবাহ হিসাব করা হয়, তেমনি বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। একটি রেললাইন কোথায় যাবে, একটি শিল্পাঞ্চল কোথায় গড়ে উঠবে—এসব সিদ্ধান্তেও পরিবেশগত সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব।

এটি শুধু পরিবেশনীতি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতি, দুর্যোগ সহনশীলতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার কৌশল।

মানুষও তো এক যাত্রী

এই গল্পের সবচেয়ে গভীর সত্যটি হয়তো এখানেই।

মানুষ নিজেকেও একসময় ছিল যাযাবর। আমরা নদী অনুসরণ করেছি, বন পেরিয়েছি, ঋতুর সঙ্গে চলেছি। সভ্যতা গড়ার পরে আমরা স্থায়ী হয়েছি, শহর বানিয়েছি, রাস্তা বানিয়েছি। কিন্তু সেই উন্নয়নের ভেতরেই কখনও কখনও আমরা ভুলে গেছি, এই পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নির্মিত নয়।

একটি হাতি যখন বহু প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত পথ ধরে হাঁটে, তখন সেটি কেবল একটি প্রাণীর সিদ্ধান্ত নয়; সেটি লক্ষ বছরের বিবর্তনের স্মৃতি। একটি তিমি যখন হাজার হাজার কিলোমিটার সাঁতরে সন্তান জন্ম দিতে যায়, তখন সেটি কেবল একটি প্রজননযাত্রা নয়; সেটি সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতা। একটি বাদুড় যখন রাতের আকাশে অদৃশ্য পথ ধরে উড়ে যায়, তখন সে শুধু নিজের ক্ষুধা মেটায় না; অগণিত গাছের ভবিষ্যৎও বহন করে।

Forest elephant at Langoue Bai in the Ivindo national park, Gabon

আমরা প্রায়ই প্রকৃতিকে স্থির বলে কল্পনা করি। কিন্তু প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার চলমান থাকা। নদী বয়ে চলে, বাতাস বইতে থাকে, ঋতু বদলায়, প্রাণীরা যাত্রা করে। এই চলাচল থেমে গেলে পৃথিবীও ধীরে ধীরে বদলে যায়।

সায়েন্স-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাটি শেষ পর্যন্ত শুধু প্রাণীদের নিয়ে নয়। এটি মানুষের জন্যও একটি আয়না।

আমরা যত নতুন শহর নির্মাণ করছি, ততই নতুন সীমান্ত তৈরি করছি। যত রাস্তা বানাচ্ছি, ততই কোথাও না কোথাও একটি প্রাচীন যাত্রাপথ ভেঙে দিচ্ছি। উন্নয়ন ও সংরক্ষণকে মুখোমুখি দাঁড় করানো সহজ, কিন্তু টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হলে এই দুইয়ের মধ্যে নতুন সমঝোতা খুঁজে বের করতেই হবে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের পৃথিবীকে বিচার করা হবে শুধু কত উঁচু ভবন বানানো হয়েছে, কত কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মিত হয়েছে বা কত দ্রুত অর্থনীতি বেড়েছে—এসব দিয়ে নয়। বিচার করা হবে আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে:

আমরা কি এমন একটি পৃথিবী রেখে যেতে পেরেছি, যেখানে একটি হাতি এখনও তার পূর্বপুরুষের পথ ধরে হাঁটতে পারে, একটি তিমি নিরাপদে মহাসাগর পাড়ি দিতে পারে, আর একটি বাদুড় রাতের আকাশে উড়ে গিয়ে আগামী প্রজন্মের বন রোপণ করতে পারে?

কারণ শেষ পর্যন্ত, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভ্রমণকারীদের গল্প আসলে তাদের নয়—এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের গল্প।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভুল অস্ত্রোপচারে রোগীর জীবন সংকটে, ওল্ডহামের সার্জনকে চিকিৎসা পেশা থেকে বহিষ্কার

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যাত্রীরা

১০:৩৭:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

সকালের প্রথম আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ সাভানায় একদল আফ্রিকান হাতি ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে। তাদের সামনে কোনো রাস্তা নেই, নেই মানুষের আঁকা মানচিত্র। তবু তারা যেন জানে কোথায় যেতে হবে। দলের সবচেয়ে প্রবীণ মাদি হাতিটি একবারও থেমে চারপাশে তাকায় না। সে এগিয়ে চলে এমন আত্মবিশ্বাসে, যেন এই পথ তার বহু প্রজন্মের স্মৃতিতে লেখা আছে।

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, উত্তর আমেরিকার আর্কটিক টুন্ড্রায় ক্যারিবুর বিশাল পাল বরফ গলা নদী পেরিয়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরে ছুটছে। তাদের সামনে জন্ম নিচ্ছে নতুন ঘাস, নতুন জীবন। একই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে একটি হাম্পব্যাক তিমি ধীরে ধীরে উত্তর দিকের ঠান্ডা জল ছেড়ে উষ্ণ সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছে—সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। রাত নামলে আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনে ফলভুক বাদুড় শত শত কিলোমিটার উড়ে যাবে পাকা ফলের সন্ধানে। আর দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে একটি জাগুয়ার নীরবে অনুসরণ করবে সেই পথ, যেদিকে কয়েক ঘণ্টা আগে চলে গেছে হরিণের একটি দল।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিন ঘটে। বেশিরভাগ মানুষ সেগুলো কখনও দেখে না। কিন্তু পৃথিবীর জীবনকে সচল রাখার জন্য এগুলোর গুরুত্ব নদীর প্রবাহ কিংবা ঋতুর পরিবর্তনের মতোই মৌলিক।

আমরা মানুষ নিজেদের ভ্রমণ নিয়ে গর্ব করি। আমরা মহাসাগর পাড়ি দিই, মহাকাশে যাই, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছে যাই। অথচ আমাদের অনেক আগে থেকেই এই গ্রহের প্রকৃত অভিযাত্রীরা নিরন্তর পথ চলেছে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তন তাদের শিখিয়েছে কখন যাত্রা শুরু করতে হবে, কোথায় থামতে হবে, কোন নদী পার হতে হবে, কোন পাহাড় এড়িয়ে যেতে হবে, আর কখন ফিরে আসতে হবে সেই পুরোনো আবাসভূমিতে।

বিজ্ঞানীরা আজ এই চলাচলকে শুধু “মাইগ্রেশন” বা অভিবাসন বলে বর্ণনা করেন না। তারা একে বলেন মুভমেন্ট ইকোলজি—চলাচলের পরিবেশবিদ্যা। কারণ প্রাণীর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি বৃহত্তর গল্প। সেই গল্প খাদ্যের, জলের, ঋতুর, প্রজননের, শিকারি ও শিকারের, এমনকি বন ও নদীরও।

Trees, rivers and mountains are gaining legal status — but it's not been a quick fix for environment

পৃথিবী আসলে চলমান

আমরা পৃথিবীকে প্রায়ই স্থির মনে করি। বন মানে স্থির গাছ, পাহাড় মানে অচল পাথর, নদী মানে নির্দিষ্ট প্রবাহ। কিন্তু প্রকৃতির ভেতরে সবকিছুই চলমান। বাতাসে ভেসে যায় বীজ। সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় পুষ্টি। নদী বয়ে নিয়ে যায় পলি। আর প্রাণীরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বহন করে জীবনের অদৃশ্য সংযোগ।

একটি হাতি যখন বন পেরিয়ে যায়, তখন সে শুধু নিজের শরীর নিয়ে হাঁটে না। তার সঙ্গে চলতে থাকে শত শত উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ। কারণ তার খাওয়া ফলের বীজ বহু দূরে গিয়ে মাটিতে পড়ে নতুন গাছ জন্মায়। একটি বাদুড় রাতের অন্ধকারে যে ফুলে বসে, তার পরাগ অন্য বনে পৌঁছে যায়। একটি নেকড়ে বা বাঘ যে তৃণভোজী প্রাণী শিকার করে, তার ফলে বনজ উদ্ভিদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে যায়। একটি তিমি গভীর সমুদ্র থেকে পৃষ্ঠে উঠে এসে যে পুষ্টি ছড়িয়ে দেয়, তা অণুজীব থেকে শুরু করে মাছ পর্যন্ত অসংখ্য প্রাণীর জীবনচক্রে প্রভাব ফেলে।

অর্থাৎ, প্রাণীদের চলাচল পৃথিবীর অদৃশ্য রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। রক্ত যেমন শরীরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে অক্সিজেন বহন করে, তেমনি প্রাণীরা বহন করে বীজ, পুষ্টি, জিনগত বৈচিত্র্য এবং জীবনের ধারাবাহিকতা।

যাত্রার ভাষা

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—তারা পথ খুঁজে পায় কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে গবেষণা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রাণীরা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করতে পারে। কেউ সূর্যের অবস্থান দেখে, কেউ নক্ষত্রের, কেউ গন্ধের, কেউ নদীর প্রবাহের। হাতিরা বহু বছর আগের খরার স্মৃতি মনে রাখতে পারে। অভিজ্ঞ মাদি হাতিরা জানে কোন মৌসুমে কোন জলাধারে এখনও পানি থাকে। নেকড়েরা পাহাড়ি উপত্যকার বাতাসে শিকারের গন্ধ ধরে। বাদুড় শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অন্ধকারে পথ খুঁজে নেয়।

Forest elephants play in the salt marshes of the Dzanga Sangha reserve

অর্থাৎ, তাদের মানচিত্র কাগজে আঁকা নয়; সেটি লেখা থাকে স্মৃতিতে, প্রবৃত্তিতে এবং প্রকৃতির সংকেতে।

এই জ্ঞান বই থেকে শেখা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বিবর্তনের উত্তরাধিকার।

যে যাত্রা শুধু নিজের জন্য নয়

প্রকৃতিতে খুব কম ঘটনাই একক কোনো প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একটি হাতির পথচলা শেষ পর্যন্ত হাতির গল্প নয়। সেটি বনের গল্প। একটি বাদুড়ের রাতের উড়ান কেবল খাদ্যের গল্প নয়; সেটি আগামী মৌসুমের ফলের গল্প। একটি তিমির সমুদ্রযাত্রা শুধু প্রজননের নয়; সেটি সমুদ্রের উৎপাদনশীলতার গল্প।

এই কারণেই পরিবেশবিদরা আজ ক্রমশ একটি নতুন উপলব্ধির কথা বলছেন। তারা বলছেন, সংরক্ষণ মানে শুধু প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; তাদের চলার স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।

একটি জাতীয় উদ্যান, একটি সংরক্ষিত বন কিংবা একটি অভয়ারণ্য গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয়। যদি সেই বন অন্য বনের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, যদি একটি নদী পার হওয়ার পথ কংক্রিটের দেয়ালে আটকে যায়, যদি শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত অভিবাসনপথের মাঝখানে উঠে দাঁড়ায় একটি মহাসড়ক, তাহলে কাগজে সংরক্ষণ থাকলেও প্রকৃতির ছন্দ ভেঙে যেতে শুরু করে।

আর ঠিক এখানেই এসে মিলিত হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান ও এক গভীর উদ্বেগ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে জিপিএস কলার বসিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক তথ্যভান্ডার তৈরি করেছেন, যা আগে কখনও সম্ভব ছিল না। প্রথমবারের মতো তাঁরা দেখতে পেরেছেন—প্রাণীরা শুধু কোথায় যায় তা নয়, কোথায় আর যেতে পারছে না।

সেই আবিষ্কারই আজ বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত নতুন গবেষণার কেন্দ্রে। আর সেই গবেষণার ফল বলছে, পৃথিবীর মানচিত্র হয়তো বড়ই আছে, কিন্তু বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পৃথিবী দ্রুত ছোট হয়ে আসছে।

যখন মানুষের পৃথিবী বড় হয়, প্রাণীদের পৃথিবী ছোট হয়ে আসে

একসময় বন্য প্রাণীর চলাচল নিয়ে গবেষণা মানে ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। কোনো হাতির পায়ের ছাপ অনুসরণ করা, দূরবীন হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা, কিংবা রেডিও কলারের ক্ষীণ সংকেত ধরে পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে যাওয়া। একটি প্রাণী এক মৌসুমে কোথায় গেল, কেন গেল, আবার ফিরল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে কখনও কখনও লেগে যেত বছরের পর বছর।

আজ সেই চিত্র বদলে গেছে।

No photo description available.

স্যাটেলাইট, জিপিএস কলার, রিমোট সেন্সিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিজ্ঞানীদের সামনে এমন এক পৃথিবী খুলে দিয়েছে, যেখানে হাজার হাজার প্রাণীর প্রতিটি পদক্ষেপ ডিজিটাল মানচিত্রে ফুটে ওঠে। কোনো হাতি দিনে কত কিলোমিটার হাঁটল, একটি নেকড়ে কখন পাহাড়ি উপত্যকা পার হলো, একটি ভালুক কখন মানুষের বসতির কাছাকাছি এলো—সবই এখন তথ্য।

এই বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করেই সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাটি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর দীর্ঘমেয়াদি চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন একটি চিত্র পেয়েছেন, যা একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং উদ্বেগজনক।

তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে, মানুষ যেখানে বেশি, সেখানে প্রাণীদের পৃথিবী ছোট।

একটি রাস্তা শুধু রাস্তা নয়

আমরা সাধারণত একটি নতুন মহাসড়ককে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখি। সেটি দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ দেয়, ব্যবসা বাড়ায়, শহরকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু একই রাস্তা একটি হাতির কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।

ধরা যাক, কয়েক শত বছর ধরে একটি হাতির পাল বর্ষা এলেই একটি বন থেকে আরেকটি বনে যায়। মাঝখানে একটি নদী, তারপর খোলা তৃণভূমি। হঠাৎ সেই পথের ওপর তৈরি হলো চার লেনের মহাসড়ক।

মানুষের কাছে এটি একটি অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু হাতির কাছে এটি এমন একটি বাধা, যা হয়তো তার পূর্বপুরুষেরা কখনও কল্পনাও করেনি।

কিছু প্রাণী ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়। অনেকেই পারে না। কেউ ফিরে যায়। কেউ মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কেউ মারা যায়।

ফলে যে যাত্রাপথ হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির অংশ ছিল, সেটি কয়েক বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে।

Farmers switch off lights at night to protect wildlife and improve crop-supporting ecosystems | - The Times of India

অদৃশ্য দেয়াল

সব বাধা অবশ্য কংক্রিটের নয়।

কৃষিজমির বেড়া, শিল্পাঞ্চল, খনি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো, এমনকি রাতভর জ্বলে থাকা কৃত্রিম আলোও প্রাণীদের চলাচলে প্রভাব ফেলে। কোথাও তারা পথ বদলে ফেলে, কোথাও সময় বদলে ফেলে। দিনের প্রাণী রাতের অন্ধকারে চলতে শুরু করে, শুধু মানুষের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে।

এটি শুধু আচরণের পরিবর্তন নয়; এটি তাদের শক্তি ব্যয়ের ধরন বদলে দেয়, খাদ্য সংগ্রহের সময় কমিয়ে দেয়, প্রজননের সুযোগ সীমিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো জনসংখ্যাকে দুর্বল করে তুলতে পারে।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন “ল্যান্ডস্কেপ ফ্র্যাগমেন্টেশন”—প্রকৃতিকে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দ্বীপে ভাগ করে ফেলা।

একটি বন হয়তো এখনও মানচিত্রে আছে। কিন্তু যদি সেই বন আর পাশের বনের সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে সেটি ধীরে ধীরে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।

জলবায়ু বদলালে পথও বদলায়

প্রাণীরা সব সময় একই পথে চলে না। তারা প্রকৃতির সংকেত অনুসরণ করে।

কোথায় আগে বৃষ্টি হলো, কোথায় ঘাস দ্রুত গজাল, কোথায় নদী শুকিয়ে গেল—এসব তথ্যই তাদের যাত্রা নির্ধারণ করে।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই সংকেতগুলোই বদলে যাচ্ছে।

আর্কটিকে বরফ আগের তুলনায় দ্রুত গলছে। আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে দীর্ঘ খরা বাড়ছে। কোথাও বৃষ্টির সময় পিছিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার অস্বাভাবিক বন্যা নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

ফলে প্রাণীরা নতুন পথ খুঁজছে। কিন্তু সেই নতুন পথের মাঝখানে প্রায়ই রয়েছে মানুষের তৈরি শহর, সড়ক, রেললাইন কিংবা কৃষিজমি।

অর্থাৎ, প্রকৃতি তাদের সামনে নতুন দরজা খুলছে, আর মানুষ একই সময়ে অনেক পুরোনো দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।

World Elephant Day: World's shrinking for elephants | Prothom Alo

বাংলাদেশের আয়নায়

এই বৈশ্বিক গল্প বাংলাদেশের জন্যও অপরিচিত নয়।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের এশীয় হাতিরা বহুদিন ধরে নির্দিষ্ট করিডর ব্যবহার করে এক বন থেকে আরেক বনে যাতায়াত করে। কিন্তু গত কয়েক দশকে দ্রুত জনবসতি, সড়ক, রিসোর্ট, কৃষিজমি ও অন্যান্য অবকাঠামো সেই করিডরের অনেক অংশকে সংকুচিত করেছে।

ফলাফল স্পষ্ট। মানুষ ও হাতির সংঘর্ষ বেড়েছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে, প্রাণহানি ঘটছে, আর প্রতিবারই সংঘাতের কেন্দ্রে থাকে একই প্রশ্ন—প্রাণীরা কি মানুষের এলাকায় ঢুকছে, নাকি মানুষই তাদের পুরোনো পথের ওপর বসতি গড়ে তুলেছে?

এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের নয়। আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বহু দেশ একই বাস্তবতার মুখোমুখি।

তাই সংরক্ষণবিজ্ঞান আজ একটি নতুন ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে—ওয়াইল্ডলাইফ করিডর। শুধু বন সংরক্ষণ নয়, বনগুলোর মধ্যে নিরাপদ সংযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চলাচলের স্বাধীনতা হারালে একটি প্রাণীর বেঁচে থাকা যেমন কঠিন হয়, তেমনি দুর্বল হয়ে পড়ে পুরো বাস্তুতন্ত্র।

কিন্তু যদি সমাধান শুধু আরও বেশি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা না হয়, তাহলে কী হতে পারে সেই নতুন পথ? আর প্রকৃতি ও উন্নয়নের মধ্যে আদৌ কি কোনো ভারসাম্য সম্ভব?

 পৃথিবীকে কি আবার প্রাণীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব?

প্রকৃতির ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন মানুষ ভেবেছে—কোনো একটি ক্ষতি আর পূরণ করা সম্ভব নয়। একসময় ইউরোপের বহু নদীকে মৃতপ্রায় বলা হতো। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ প্রেইরি হারিয়ে যাবে বলেও ধারণা ছিল। অনেক বন্যপ্রাণীকে মনে করা হয়েছিল, তারা আর কখনও ফিরে আসবে না।

কিন্তু সংরক্ষণবিজ্ঞানের ইতিহাস আরেকটি শিক্ষা দেয়—প্রকৃতি সুযোগ পেলে ফিরে আসতে জানে।

গত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেছেন, যা একসময় কল্পনার মতো শোনাত। সেটি হলো বন্যপ্রাণীর জন্য অবাধ চলাচলের পথ ফিরিয়ে দেওয়া

The Netherlands built green bridges over highways so deer, badgers, and wildlife can cross safely-reconnecting forests split by roads.

যখন সেতু শুধু মানুষের জন্য নয়

নেদারল্যান্ডসে মহাসড়কের ওপর সবুজে ঢাকা বিশেষ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো মানুষ নয়, ব্যবহার করে হরিণ, শিয়াল, বন্য শূকর, ব্যাজার ও অন্যান্য প্রাণী। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে পাহাড়ি সড়কের ওপর তৈরি হয়েছে ‘ওয়াইল্ডলাইফ ওভারপাস’ এবং নিচে নির্মিত হয়েছে বিশেষ আন্ডারপাস। ক্যামেরা বসিয়ে দেখা গেছে, কিছু বছরের মধ্যেই হাজার হাজার প্রাণী নিরাপদে এসব পথ ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

প্রথমে এগুলোকে ব্যয়বহুল প্রকল্প মনে হয়েছিল। পরে গবেষণায় দেখা যায়, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষ কমেছে, প্রাণহানি কমেছে, যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতিও কমেছে। অর্থাৎ, প্রকৃতিকে পথ ফিরিয়ে দেওয়া শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানুষের অর্থনীতির জন্যও লাভজনক।

আফ্রিকার কিছু দেশে হাতির করিডর সংরক্ষণের জন্য গ্রাম, সংরক্ষিত বন ও কৃষিজমির মধ্যে নতুন ধরনের ভূমি-পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোথাও বেড়া সরানো হয়েছে, কোথাও বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে, কোথাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ উদ্যোগের অংশীদার করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগের একটি সাধারণ বার্তা আছে—প্রাণীদের থামিয়ে দিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেও নিরাপদ থাকতে পারে না।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানচিত্র

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো, পৃথিবীকে আলাদা আলাদা সংরক্ষিত এলাকার সমষ্টি হিসেবে দেখলে হবে না। একটি জাতীয় উদ্যান, একটি বন বা একটি অভয়ারণ্য আলাদাভাবে যতই সমৃদ্ধ হোক, যদি সেটি অন্য প্রাকৃতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই বিচ্ছিন্নতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

একটি তরুণ পুরুষ বাঘ নতুন এলাকা খুঁজতে চায়। একটি হাতির পাল খরার সময় নতুন পানির উৎসে যেতে চায়। একটি নেকড়ের দল নতুন শিকারের সন্ধানে পাহাড় পেরোতে চায়। যদি তারা কোথাও যেতে না পারে, তাহলে একই অঞ্চলের ছোট একটি জনসংখ্যার মধ্যেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রজনন চলতে থাকে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যায়, রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সংরক্ষণ তাই আজ শুধু প্রাণী গণনার বিষয় নয়; এটি সংযোগের বিজ্ঞান।

Why Is Bangladesh so Dense and Threatened by Sea Level Rise?

বাংলাদেশের সামনে যে সুযোগ

বাংলাদেশের আয়তন ছোট, জনসংখ্যা ঘন, উন্নয়নের চাপ তীব্র। তবু এই বাস্তবতা সংরক্ষণের সম্ভাবনাকে বাতিল করে না।

বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এশীয় হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথ চিহ্নিত করে সেগুলোকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি। একইভাবে সুন্দরবনের সঙ্গে সংযুক্ত জলাভূমি, বনাঞ্চল ও নদীপথের পরিবেশগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এর অর্থ এই নয় যে উন্নয়ন থেমে যাবে। বরং উন্নয়নের নকশায় শুরু থেকেই প্রকৃতির চলাচলের জায়গা রাখা হবে। একটি নতুন মহাসড়ক নির্মাণের আগে যেমন যানবাহনের প্রবাহ হিসাব করা হয়, তেমনি বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। একটি রেললাইন কোথায় যাবে, একটি শিল্পাঞ্চল কোথায় গড়ে উঠবে—এসব সিদ্ধান্তেও পরিবেশগত সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব।

এটি শুধু পরিবেশনীতি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতি, দুর্যোগ সহনশীলতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার কৌশল।

মানুষও তো এক যাত্রী

এই গল্পের সবচেয়ে গভীর সত্যটি হয়তো এখানেই।

মানুষ নিজেকেও একসময় ছিল যাযাবর। আমরা নদী অনুসরণ করেছি, বন পেরিয়েছি, ঋতুর সঙ্গে চলেছি। সভ্যতা গড়ার পরে আমরা স্থায়ী হয়েছি, শহর বানিয়েছি, রাস্তা বানিয়েছি। কিন্তু সেই উন্নয়নের ভেতরেই কখনও কখনও আমরা ভুলে গেছি, এই পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নির্মিত নয়।

একটি হাতি যখন বহু প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত পথ ধরে হাঁটে, তখন সেটি কেবল একটি প্রাণীর সিদ্ধান্ত নয়; সেটি লক্ষ বছরের বিবর্তনের স্মৃতি। একটি তিমি যখন হাজার হাজার কিলোমিটার সাঁতরে সন্তান জন্ম দিতে যায়, তখন সেটি কেবল একটি প্রজননযাত্রা নয়; সেটি সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতা। একটি বাদুড় যখন রাতের আকাশে অদৃশ্য পথ ধরে উড়ে যায়, তখন সে শুধু নিজের ক্ষুধা মেটায় না; অগণিত গাছের ভবিষ্যৎও বহন করে।

Forest elephant at Langoue Bai in the Ivindo national park, Gabon

আমরা প্রায়ই প্রকৃতিকে স্থির বলে কল্পনা করি। কিন্তু প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার চলমান থাকা। নদী বয়ে চলে, বাতাস বইতে থাকে, ঋতু বদলায়, প্রাণীরা যাত্রা করে। এই চলাচল থেমে গেলে পৃথিবীও ধীরে ধীরে বদলে যায়।

সায়েন্স-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাটি শেষ পর্যন্ত শুধু প্রাণীদের নিয়ে নয়। এটি মানুষের জন্যও একটি আয়না।

আমরা যত নতুন শহর নির্মাণ করছি, ততই নতুন সীমান্ত তৈরি করছি। যত রাস্তা বানাচ্ছি, ততই কোথাও না কোথাও একটি প্রাচীন যাত্রাপথ ভেঙে দিচ্ছি। উন্নয়ন ও সংরক্ষণকে মুখোমুখি দাঁড় করানো সহজ, কিন্তু টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হলে এই দুইয়ের মধ্যে নতুন সমঝোতা খুঁজে বের করতেই হবে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের পৃথিবীকে বিচার করা হবে শুধু কত উঁচু ভবন বানানো হয়েছে, কত কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মিত হয়েছে বা কত দ্রুত অর্থনীতি বেড়েছে—এসব দিয়ে নয়। বিচার করা হবে আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে:

আমরা কি এমন একটি পৃথিবী রেখে যেতে পেরেছি, যেখানে একটি হাতি এখনও তার পূর্বপুরুষের পথ ধরে হাঁটতে পারে, একটি তিমি নিরাপদে মহাসাগর পাড়ি দিতে পারে, আর একটি বাদুড় রাতের আকাশে উড়ে গিয়ে আগামী প্রজন্মের বন রোপণ করতে পারে?

কারণ শেষ পর্যন্ত, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভ্রমণকারীদের গল্প আসলে তাদের নয়—এটি আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের গল্প।