০৪:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬
জ্বালানি নিরাপত্তায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়ছে ভারত, গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন শুল্কের পরিকল্পনা ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ, প্রায় ৫৮ হাজার শিক্ষার্থীকে আবার পরীক্ষা দিতে বলল মেক্সিকোর শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হরমুজ ও বাব এল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক, শান্তি আলোচনার অনিশ্চয়তা কাটেনি সাইবার প্রতারণা দমনে কঠোর আইন, মৃত্যুদণ্ডের বিধান অনুমোদন করল মিয়ানমারের জান্তা যুক্তরাষ্ট্রের ছাতার নিচে কতটা নিরাপদ জাপানের ইয়েন? রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাঁপল কিয়েভ, নিহত অন্তত ১৭ মিয়ানমারের পাহাড়ে শুরু হয়েছে ২১ শতকের নতুন ‘গ্রেট গেম’  ও বাংলাদেশ    এআই কর্মসংস্থান, ফেডের নতুন দিকনির্দেশনা ও মূল্যস্ফীতির বৈষম্য—বিশ্ব অর্থনীতিতে তিন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন মোদির ভিডিও সরানো বিতর্ক: তিন দিনের মধ্যে ক্ষমা না চাইলে মেটার ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা হারানোর হুঁশিয়ারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাকরি-ঝড়, নতুন ফেড ও ‘দুই গতির’ মূল্যস্ফীতি: বিশ্ব অর্থনীতি কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাকরি-ঝড়, নতুন ফেড ও ‘দুই গতির’ মূল্যস্ফীতি: বিশ্ব অর্থনীতি কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে?

বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে বাজারের প্রতিদিনের শিরোনাম আর প্রকৃত পরিবর্তনের গল্প এক নয়। কোথাও প্রযুক্তি কোম্পানির রেকর্ড মুনাফা, কোথাও শেয়ারবাজারে নতুন উচ্চতা, কোথাও আবার ভূরাজনৈতিক সংঘাতের উত্তেজনা। কিন্তু এই দৃশ্যপটের আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আরও গভীর তিনটি প্রবণতা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে শ্রমবাজারের রূপান্তর, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত পুনর্বিন্যাস এবং এমন এক মূল্যস্ফীতি, যা ধনী-গরিবকে সমানভাবে আঘাত করছে না।

রয়টার্সের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মাইক ডোলান এই তিনটি বিষয়কে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা এনবিইআর (NBER), মরগ্যান স্ট্যানলি এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নও একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ এখন কেবল প্রবৃদ্ধি নয়; বরং প্রযুক্তি, নীতি ও বৈষম্যের নতুন সমীকরণ।

এআই: উৎপাদনশীলতার প্রতিশ্রুতি, নাকি চাকরির সংকট?

গত দুই বছরে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে জেনারেটিভ এআই। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, অ্যামাজন থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে ডেটা সেন্টার, চিপ ও এআই অবকাঠামো নির্মাণে।

এই বিনিয়োগের ইতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা হলেও এর অন্য পিঠটি এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মরগ্যান স্ট্যানলি তাদের “AI Disruption Tracker”-এ দেখিয়েছে, যেসব পেশা এআই দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে বেকারত্বের হার ইতোমধ্যে সাধারণ শ্রমবাজারের তুলনায় বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চ এআই-প্রভাবিত পেশাগুলোর বেকারত্ব প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

ঋণের শর্ত যাচাইয়ে আইএমএফ মিশনের বৈঠক শুরু আজ

এখনও এটি গণহারে চাকরি হারানোর পরিস্থিতি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বেকারত্ব এখনও ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রবণতাটি স্পষ্ট—এআই কেবল কর্মীদের সহায়তা করছে না; কিছু ক্ষেত্রে তাদের প্রতিস্থাপনও শুরু করেছে।

আইএমএফও তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় সতর্ক করেছে, উন্নত অর্থনীতিতে প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে এআই দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার তুলনামূলক কম হলেও, সেখানেও দক্ষতা ও আয়ের বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তৈরি পোশাক, সেবা খাত, হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার এবং প্রশাসনিক বহু কাজ ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির আওতায় চলে আসতে পারে।

প্রযুক্তি যত এগোবে, দক্ষতার চাহিদাও তত বদলাবে

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই কিছু চাকরি বিলুপ্ত করেছে, আবার নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এবার পরিবর্তনের গতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোটি কোটি নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করলেও একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রচলিত চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মেশিনের নয়; বরং এআই ব্যবহার করতে পারে এমন মানুষ বনাম যারা পারে না—এই বিভাজনের মধ্যে।

ফেডের নতুন অধ্যায়: শুধু সুদের হার নয়, বদলাচ্ছে চিন্তার কাঠামো

Understanding How Central Banks Control Inflation Through Monetary Policy

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বে।

এবার ফেডের নতুন চেয়ার কেভিন ওয়ার্শ পাঁচটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছেন। এসব দল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগ পদ্ধতি, ব্যালান্স শিট, তথ্য বিশ্লেষণ, উৎপাদনশীলতা এবং মূল্যস্ফীতির কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করবে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কানাডিয়ান অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম হোয়াইট।

২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের বহু আগে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে শুধু ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলেই চলবে না; সম্পদের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণনির্ভর বুদবুদও নজরদারিতে রাখতে হবে। সে সময় তার সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায়নি। পরে সাবপ্রাইম সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর মন্দায় ঠেলে দেয়।

এখন যখন প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারমূল্য, এআই বিনিয়োগ এবং আর্থিক বাজারে নতুন উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, তখন হোয়াইটের মতো অর্থনীতিবিদদের উপস্থিতি ফেডের ভবিষ্যৎ নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

মূল্যস্ফীতি সবার জন্য এক নয়

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, মূল্যস্ফীতি গরিবদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়।

কিন্তু এনবিইআরের সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে আরও সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

অর্থনীতিবিদ কুনাল সাঙ্গানির গবেষণায় দেখা গেছে, একই ব্র্যান্ডের সস্তা পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ে। উৎপাদকরা উৎপাদন ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপ বিভিন্ন পণ্যে সমান অঙ্কে যোগ করায় কমদামের পণ্যে শতকরা মূল্যবৃদ্ধি বেশি হয়।

What is Inflation And How It is Measured?

২০২১ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বেড়েছে।

এই ঘটনাকে অনেক অর্থনীতিবিদ এখন “চিপফ্লেশন” বা “সস্তা পণ্যের মূল্যস্ফীতি” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব আয়ের স্তরভেদে এক নয়।

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও বিদ্যুতে ব্যয় করে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দেয়।

একই সময়ে উচ্চ আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশ বিনিয়োগ, সম্পদ ও সেবাখাতে ব্যয় হওয়ায় তাদের ওপর চাপের ধরন ভিন্ন।

এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা এখন শুধু গড় মূল্যস্ফীতির হার নয়, কোন শ্রেণির মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—সেটিও নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বপ্ন

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন।

প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে, নাকি দ্রুতগতিতে প্রচলিত চাকরি কমিয়ে দেবে?

দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কি আগের মতো শুধু ভোক্তা মূল্যস্ফীতির দিকে তাকিয়ে থাকবে, নাকি সম্পদবাজারের ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দেবে?

তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতিতে কি বিভিন্ন আয়ের মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার পার্থক্য আরও বেশি বিবেচনায় আসবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের জন্য নয়; বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির পরিবর্তন, বৈশ্বিক সুদের হার এবং আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতির ঢেউ—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব অর্থনীতি তাই এখন এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; প্রযুক্তি, নীতির দূরদর্শিতা এবং সামাজিক বৈষম্য—এই তিনটির ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

জনপ্রিয় সংবাদ

জ্বালানি নিরাপত্তায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গড়ছে ভারত, গ্যাস ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন শুল্কের পরিকল্পনা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাকরি-ঝড়, নতুন ফেড ও ‘দুই গতির’ মূল্যস্ফীতি: বিশ্ব অর্থনীতি কোন মোড়ে দাঁড়িয়ে?

০৩:০৯:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে বাজারের প্রতিদিনের শিরোনাম আর প্রকৃত পরিবর্তনের গল্প এক নয়। কোথাও প্রযুক্তি কোম্পানির রেকর্ড মুনাফা, কোথাও শেয়ারবাজারে নতুন উচ্চতা, কোথাও আবার ভূরাজনৈতিক সংঘাতের উত্তেজনা। কিন্তু এই দৃশ্যপটের আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আরও গভীর তিনটি প্রবণতা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে শ্রমবাজারের রূপান্তর, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত পুনর্বিন্যাস এবং এমন এক মূল্যস্ফীতি, যা ধনী-গরিবকে সমানভাবে আঘাত করছে না।

রয়টার্সের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মাইক ডোলান এই তিনটি বিষয়কে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা এনবিইআর (NBER), মরগ্যান স্ট্যানলি এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নও একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ এখন কেবল প্রবৃদ্ধি নয়; বরং প্রযুক্তি, নীতি ও বৈষম্যের নতুন সমীকরণ।

এআই: উৎপাদনশীলতার প্রতিশ্রুতি, নাকি চাকরির সংকট?

গত দুই বছরে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে জেনারেটিভ এআই। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, অ্যামাজন থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে ডেটা সেন্টার, চিপ ও এআই অবকাঠামো নির্মাণে।

এই বিনিয়োগের ইতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা হলেও এর অন্য পিঠটি এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মরগ্যান স্ট্যানলি তাদের “AI Disruption Tracker”-এ দেখিয়েছে, যেসব পেশা এআই দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে বেকারত্বের হার ইতোমধ্যে সাধারণ শ্রমবাজারের তুলনায় বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চ এআই-প্রভাবিত পেশাগুলোর বেকারত্ব প্রত্যাশিত মাত্রার তুলনায় প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

ঋণের শর্ত যাচাইয়ে আইএমএফ মিশনের বৈঠক শুরু আজ

এখনও এটি গণহারে চাকরি হারানোর পরিস্থিতি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বেকারত্ব এখনও ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রবণতাটি স্পষ্ট—এআই কেবল কর্মীদের সহায়তা করছে না; কিছু ক্ষেত্রে তাদের প্রতিস্থাপনও শুরু করেছে।

আইএমএফও তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় সতর্ক করেছে, উন্নত অর্থনীতিতে প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে এআই দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার তুলনামূলক কম হলেও, সেখানেও দক্ষতা ও আয়ের বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তৈরি পোশাক, সেবা খাত, হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার এবং প্রশাসনিক বহু কাজ ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির আওতায় চলে আসতে পারে।

প্রযুক্তি যত এগোবে, দক্ষতার চাহিদাও তত বদলাবে

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই কিছু চাকরি বিলুপ্ত করেছে, আবার নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এবার পরিবর্তনের গতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোটি কোটি নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করলেও একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রচলিত চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মেশিনের নয়; বরং এআই ব্যবহার করতে পারে এমন মানুষ বনাম যারা পারে না—এই বিভাজনের মধ্যে।

ফেডের নতুন অধ্যায়: শুধু সুদের হার নয়, বদলাচ্ছে চিন্তার কাঠামো

Understanding How Central Banks Control Inflation Through Monetary Policy

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বে।

এবার ফেডের নতুন চেয়ার কেভিন ওয়ার্শ পাঁচটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছেন। এসব দল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগ পদ্ধতি, ব্যালান্স শিট, তথ্য বিশ্লেষণ, উৎপাদনশীলতা এবং মূল্যস্ফীতির কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করবে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কানাডিয়ান অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম হোয়াইট।

২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের বহু আগে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে শুধু ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলেই চলবে না; সম্পদের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণনির্ভর বুদবুদও নজরদারিতে রাখতে হবে। সে সময় তার সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায়নি। পরে সাবপ্রাইম সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর মন্দায় ঠেলে দেয়।

এখন যখন প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারমূল্য, এআই বিনিয়োগ এবং আর্থিক বাজারে নতুন উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, তখন হোয়াইটের মতো অর্থনীতিবিদদের উপস্থিতি ফেডের ভবিষ্যৎ নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

মূল্যস্ফীতি সবার জন্য এক নয়

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, মূল্যস্ফীতি গরিবদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়।

কিন্তু এনবিইআরের সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে আরও সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

অর্থনীতিবিদ কুনাল সাঙ্গানির গবেষণায় দেখা গেছে, একই ব্র্যান্ডের সস্তা পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ে। উৎপাদকরা উৎপাদন ব্যয়ের অতিরিক্ত চাপ বিভিন্ন পণ্যে সমান অঙ্কে যোগ করায় কমদামের পণ্যে শতকরা মূল্যবৃদ্ধি বেশি হয়।

What is Inflation And How It is Measured?

২০২১ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বেড়েছে।

এই ঘটনাকে অনেক অর্থনীতিবিদ এখন “চিপফ্লেশন” বা “সস্তা পণ্যের মূল্যস্ফীতি” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব আয়ের স্তরভেদে এক নয়।

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও বিদ্যুতে ব্যয় করে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দেয়।

একই সময়ে উচ্চ আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশ বিনিয়োগ, সম্পদ ও সেবাখাতে ব্যয় হওয়ায় তাদের ওপর চাপের ধরন ভিন্ন।

এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা এখন শুধু গড় মূল্যস্ফীতির হার নয়, কোন শ্রেণির মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—সেটিও নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বাংলাদেশের ভবিষ্যতের স্বপ্ন

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন।

প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে, নাকি দ্রুতগতিতে প্রচলিত চাকরি কমিয়ে দেবে?

দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কি আগের মতো শুধু ভোক্তা মূল্যস্ফীতির দিকে তাকিয়ে থাকবে, নাকি সম্পদবাজারের ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দেবে?

তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতিতে কি বিভিন্ন আয়ের মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার পার্থক্য আরও বেশি বিবেচনায় আসবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের জন্য নয়; বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তির পরিবর্তন, বৈশ্বিক সুদের হার এবং আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতির ঢেউ—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব অর্থনীতি তাই এখন এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; প্রযুক্তি, নীতির দূরদর্শিতা এবং সামাজিক বৈষম্য—এই তিনটির ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।