কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে আবারও আলোচনায় এসেছে এমন একটি অ্যাপের ধারণা, যেখানে একজন ব্যবহারকারী দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রায় সব ডিজিটাল সেবা এক জায়গায় পাবেন। একসময় এই ধারণা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় সাফল্য পায়নি। তবে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সেই পরিকল্পনাই নতুনভাবে সামনে আনছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো।
আলাদা সেবা নয়, এক প্ল্যাটফর্মে সবকিছু
সম্প্রতি কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের আলাদা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রকল্প বন্ধ করে সেগুলোর সুবিধা মূল অ্যাপের মধ্যে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারীকে আরও বিস্তৃত সেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মের এই অ্যাপের মূল লক্ষ্য হবে ব্যবহারকারীর বিভিন্ন কাজকে একই জায়গায় নিয়ে আসা। আলাদা আলাদা অ্যাপে ঘুরে কাজ করার পরিবর্তে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারীই তথ্য খুঁজে দেওয়া, যোগাযোগ, পরিকল্পনা, নথি ব্যবস্থাপনা, অর্থ লেনদেন এবং অন্যান্য ডিজিটাল কাজ সহজ করে দিতে পারবে।

এশিয়ায় সফল, যুক্তরাষ্ট্রে কেন নয়?
চীনের বহুল ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় অ্যাপকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘সবকিছু একসঙ্গে’ অ্যাপের সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। একই ধরনের মডেল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশেও জনপ্রিয় হয়েছে। সেখানে একটি অ্যাপ দিয়েই মানুষ বার্তা আদান-প্রদান, অর্থ পরিশোধ, কেনাকাটা, খাবার অর্ডার, পরিবহনসহ নানা সেবা গ্রহণ করে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে একই ধারণা কখনও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো সেখানে অনলাইন কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আগে থেকেই শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছিল। ফলে নতুন একটি অ্যাপের পক্ষে সব সেবা একত্র করে বাজার দখল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি বদলে দিতে পারে সেই বাস্তবতা?
এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ দেখছে। যদি একজন ব্যবহারকারী প্রতিদিনের সব কাজ একটি বুদ্ধিমান সহকারীর মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতের এই অ্যাপ শুধু বিভিন্ন সেবা একত্র করবে না; বরং ব্যবহারকারীর কাজ বুঝে পরামর্শ দেবে, সময়সূচি তৈরি করবে, প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে দেবে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার মধ্যে সমন্বয়ও করবে।

আগেও হয়েছে চেষ্টা
কয়েক বছর আগে একটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ‘সবকিছুর অ্যাপ’-এ রূপান্তরের পরিকল্পনার ঘোষণা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরে সেই প্ল্যাটফর্মে আর্থিক সেবা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত সেটি প্রত্যাশিত মাত্রায় পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
এতে বোঝা যায়, একটি মাত্র অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের সব ডিজিটাল চাহিদা পূরণ করা প্রযুক্তিগতভাবে যতটা সম্ভব, বাস্তবে ব্যবহারকারীর অভ্যাস পরিবর্তন করাটা ততটাই কঠিন।
সুবিধার পাশাপাশি বাড়ছে উদ্বেগ
একটি অ্যাপে যত বেশি সেবা যুক্ত হবে, তত বেশি তথ্যও সেখানে জমা হবে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সব কাজ একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ব্যবহারকারী ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, একটি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী মানুষের দৈনন্দিন কাজকে অনেক বেশি সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে সক্ষম হবে।
বিনিয়োগের ফল দেখানোর নতুন সুযোগ
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। সেই বিনিয়োগ থেকে বাস্তব আয় ও ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর চাপও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ‘সবকিছু একসঙ্গে’ অ্যাপ তাদের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে দিতে পারে।
আগের প্রচেষ্টাগুলো প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগে এই ধারণা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এবার সত্যিই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে কি না, যা ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন ডিজিটাল জীবনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ‘সবকিছু একসঙ্গে’ অ্যাপের ধারণা নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ফিরছে। তবে ব্যবহারকারীর আস্থা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং বাজারের প্রতিযোগিতা—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে এই মডেল কতটা সফল হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















