বিশ্বজুড়ে প্রজাপতিরা দ্রুত তাদের আবাসস্থল বদলাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি শুধু একটি প্রাণীগোষ্ঠীর স্থানান্তরের ঘটনা নয়; বরং পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের আগাম সতর্কসংকেত। নতুন এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার প্রভাবে বহু প্রজাতির প্রজাপতি নতুন এলাকায় চলে যাচ্ছে, আবার অনেক প্রজাতি পুরোনো আবাস হারিয়ে ফেলছে।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় ১০৫টি দেশের ১ হাজার ৭৫৮টি প্রজাতির প্রজাপতির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রতি ১০টি প্রজাতির মধ্যে অন্তত একটি ইতোমধ্যেই তাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি বাড়িয়েছে, কমিয়েছে অথবা উচ্চতা পরিবর্তন করে নতুন পরিবেশে চলে গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল চেঞ্জ ইকোলজি গবেষণাগারের প্রধান ড. শাওয়ান চৌধুরী বলেন, গবেষণায় যে পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে, তার ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। তাঁর ভাষায়, প্রজাপতি প্রকৃতির প্রাথমিক সতর্কবার্তা বহনকারী প্রাণী। তাদের আবাসে এত বড় পরিবর্তন ঘটছে মানে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে গভীর পরিবর্তন চলছে।
বেশিরভাগ প্রজাতির বিস্তৃতি বেড়েছে
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রজাতির অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নতুন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অনেক অঞ্চলে নতুন বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি হওয়ায় তারা সেখানে ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে নতুন এলাকায় যাওয়া সব সময় ইতিবাচক নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রজাপতিরা এমন স্থানে যাচ্ছে, যেখানে পরিবেশ পুরোপুরি উপযোগী নয়। ফলে তাদের সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের পরিচিত এক প্রজাপতির বিস্ময়কর যাত্রা
ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার স্থানীয় প্রজাতি ‘টনি কস্টার’ প্রজাপতি ২০১২ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায়। এরপর থেকে এটি বছরে গড়ে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার গতিতে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এত দ্রুত বিস্তৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

কোথাও বিস্তৃতি, কোথাও বিলুপ্তি
অন্যদিকে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রজাতির বিস্তৃতি কমে গেছে। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ছোট প্রজাপতিগুলোর একটি ‘কুপিডো মিনিমাস’ ইতোমধ্যেই বহু পুরোনো আবাস থেকে হারিয়ে গেছে। অনেক প্রজাতি আবার উঁচু বা নিচু পার্বত্য এলাকায় সরে যাচ্ছে, যাতে তারা উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারে।
গবেষণায় দেখা যায়, নতুন এলাকায় বিস্তৃতি সবচেয়ে বেশি ঘটছে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে। বিপরীতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় অনেক প্রজাতির আবাস সংকুচিত হচ্ছে। উচ্চতা পরিবর্তনের ঘটনাগুলোও মূলত উত্তর গোলার্ধেই বেশি দেখা গেছে।
শুধু জলবায়ু নয়, মানুষের কর্মকাণ্ডও দায়ী
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রধান কারণ হলেও মানুষের কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জার্মানিতে জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়ায় ‘ক্র্যানবেরি ফ্রিটিলারি’ প্রজাপতির আবাস ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে। রোমানিয়ায় কৃষিকাজের ব্যাপক সম্প্রসারণের কারণে ‘ড্যানিউব ক্লাউডেড ইয়েলো’ প্রজাতির বিস্তৃতি কমেছে। অন্যদিকে ব্রাজিলে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে একটি নীল প্রজাপতি নতুন রাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু প্রজাতি এক অঞ্চলে বিস্তৃত হলেও অন্য অঞ্চলে সংকুচিত হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে তাদের টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

দ্রুত নজরদারির আহ্বান
ড. শাওয়ান চৌধুরী বলেন, প্রজাপতিদের চলাচল, নতুন আবাস এবং তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে সমন্বিত বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সংরক্ষণ পরিকল্পনাও নতুনভাবে সাজাতে হবে।
আশার আলোও রয়েছে
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে একসময় বিলুপ্ত বলে ধারণা করা ‘এলথাম কপার’ প্রজাপতির সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। স্থানীয় মানুষ, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ এবং আবাস পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ফলে এই বিপন্ন প্রজাতির শূককীটের সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে সঠিক সংরক্ষণ উদ্যোগ নিলে বিপন্ন প্রজাতিকেও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
প্রজাপতির এই বৈশ্বিক স্থানান্তর শুধু একটি প্রজাতির গল্প নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা গভীরভাবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে বদলে দিচ্ছে, তারই একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















