মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন এক সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে, যার আওতায় উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর চলাচলের ওপর ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক আঞ্চলিক সূত্র সতর্ক করে দিয়েছে, আলোচনা এগোলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনায় কোনো পরিবর্তন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আলোচনায় কী রয়েছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছে, যাতে উপসাগরে প্রবেশকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের জলসীমা ব্যবহার করবে। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, উভয় দিকের যাত্রাপথ নিয়েই মৌলিক সমঝোতার দিকে অগ্রগতি হয়েছে।
তবে আঞ্চলিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, “নিয়ন্ত্রণ” বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে, জাহাজ তদারকির দায়িত্ব কারা পালন করবে এবং কোনো ধরনের ফি আদায় করা হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
ফি আদায় নিয়ে মতপার্থক্য
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান চায় প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের পণ্যমূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায় করতে। অন্যদিকে ওমান তুলনামূলক কম হারে, প্রায় ৩ শতাংশ ফি নিয়ে আলোচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, এই পথ ব্যবহার করতে কোনো ফি আরোপ করা উচিত নয়।
উত্তেজনা এখনো কমেনি
আলোচনার পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার ইরানের ভেতরে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
এই সতর্কবার্তার মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকির কথা তুলে ধরে নতুন সামরিক পদক্ষেপের মূল্য আরও বাড়িয়ে দিতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রস্তাবটি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। তবে অতীতে ওয়াশিংটন বারবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার বা চলাচলের ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ তারা মেনে নেবে না।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক জনসভায় বলেন, তিনি সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিতে চান। একই সময়ে তিনি ইঙ্গিত দেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।
এখনো চূড়ান্ত নয়
যদিও ইরানের কর্মকর্তারা আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করছেন, সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগে এখনো বেশ কিছু জটিল বিষয়ের সমাধান প্রয়োজন। ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে চালু হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথকে ঘিরে চলমান আলোচনা সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আপাতত পরিস্থিতি আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ঘোষণা করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা, ইরানের ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















