মানব বিবর্তনের বৃক্ষে অসংখ্য প্রজাতি
আমাদের প্রজাতির উৎপত্তির ইতিহাস পুনর্গঠন করতে নানা ধরনের প্রমাণের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ—যেমন হাড় ও প্রাচীন নিদর্শন—এছাড়া রয়েছে আণবিক প্রমাণ, যেমন প্রাচীন ডিএনএ, এবং অতীতের জলবায়ু ও পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য।
গত কয়েক দশকে এ ক্ষেত্রে আবিষ্কারের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মানব বিবর্তনের ইতিহাস আরও বহু দূর অতীতে প্রসারিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে এটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, নতুন নতুন প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে যেখানে আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষরা বাস করতেন, পাশাপাশি মানব পরিবারের বৃক্ষে যুক্ত হয়েছে একের পর এক নতুন প্রজাতি।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নথি অসম্পূর্ণ হওয়ায় কোনো বৈশিষ্ট্য বা প্রজাতি প্রথম কখন এবং কোথায় আবির্ভূত হয়েছিল, কিংবা কতদিন টিকে ছিল—তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। কোনো কিছুর সবচেয়ে পুরোনো পরিচিত নিদর্শন সবসময় তার প্রকৃত আবির্ভাবের সময় নির্দেশ করে না। তাই এই সময়রেখায় অনেক ক্ষেত্রেই বিস্তৃত সময়সীমা ব্যবহার করা হয়েছে এবং যেসব তারিখ নিয়ে বেশি অনিশ্চয়তা রয়েছে, সেখানে প্রশ্নচিহ্ন দেওয়া হয়েছে।
৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে
প্রাইমেটদের উদ্ভব
বানর, এপ এবং মানুষ—সবাই যে বৃহৎ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, সেই প্রাইমেট গোষ্ঠীর উদ্ভব এই সময়ে। প্রথম দিকের প্রাইমেট ছিল আকারে ছোট এবং জীবনের বেশির ভাগ সময় গাছে কাটাত। তাদের চেহারা অনেকটা বর্তমানের ট্রি শ্রু বা কাঠবিড়ালির মতো ছিল।
প্রাইমেট ঠিক কখন প্রথম বিবর্তিত হয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়। তারা হয়তো ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষে ঘটে যাওয়া গণবিলুপ্তির আগে, অথবা পরে আবির্ভূত হয়। ওই সময় পৃথিবীতে একটি বিশাল গ্রহাণু আঘাত হেনে অধিকাংশ ডাইনোসরসহ অসংখ্য প্রাণীকে বিলুপ্ত করে দেয়। কেবল পাখিরাই ডাইনোসরদের মধ্যে টিকে থাকে।
বিভিন্ন প্রাইমেটের ডিএনএ তুলনা করে করা জিনগত গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, প্রাইমেটদের উদ্ভব সম্ভবত এই গণবিলুপ্তির আগেই। কিন্তু জীবাশ্মে তাদের উপস্থিতি দেখা যায় বিলুপ্তির পর। তাছাড়া প্রথমদিকের সব প্রাণীকে প্রকৃত প্রাইমেট বলা যায় কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, গণবিলুপ্তির মাত্র এক লাখ বছরের কিছু বেশি সময় পরে উত্তর আমেরিকায় পারগেটোরিয়াস নামে এক ধরনের প্রাণী বাস করত। তারা ছিল প্লেসিয়াডাপিফর্ম, যারা প্রাইমেটদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।
প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে এসে নিঃসন্দেহে প্রকৃত প্রাইমেটের উপস্থিতি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব চীনে পাওয়া আর্কিসেবাস এবং আমেরিকা ও ইউরেশিয়ায় বিস্তৃত টেইয়ারদিনা গণের একাধিক প্রজাতি।
এই সময় পৃথিবীতে প্যালিওসিন–ইওসিন তাপীয় সর্বোচ্চ অবস্থা নামে এক বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটে। এর ফলে উষ্ণমণ্ডলীয় বনভূমি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় এবং প্রাথমিক প্রাইমেটদের জন্য বিশাল আবাসস্থল তৈরি হয়।
৩ কোটি থেকে ১ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে
আফ্রিকায় এপদের আবির্ভাব
জিনগত গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, এপদের সঙ্গে বানরদের বিভাজন সম্ভবত ৩ কোটি বছর আগেই ঘটে। তবে জীবাশ্ম প্রমাণ কিছুটা পরে পাওয়া যায়।
বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন এপ বা এপসদৃশ প্রাইমেট হলো রুকওয়াপিথেকাস, যা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে বর্তমান তানজানিয়ায় বাস করত। মিশরে পাওয়া ১ কোটি ৭০ লাখ বছরের পুরোনো মাসরিপিথেকাস সম্ভবত আজকের সব জীবিত এপের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের খুব কাছাকাছি ছিল।
এরপর কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে আফ্রিকায় এপদের বিস্তার ঘটে। প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে কেনিয়ায় নাকোলাপিথেকাস, এবং ১ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে নিয়ানজাপিথেকাস বাস করত। পরে আফ্রিকায় এপের সংখ্যা কমে যায়—অথবা অন্তত তাদের জীবাশ্মের সন্ধান খুব কম পাওয়া যায়।
২ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে
ঘাসভূমির বিস্তার
পূর্ব আফ্রিকায় ঘাসের বিস্তার শুরু হয় এবং আগে যেখানে ঘন বন ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে সাভানা গড়ে ওঠে। এর ফলে নতুন ধরনের আবাসস্থল সৃষ্টি হয়। তবে এপ ও পরবর্তী হোমিনিনরা ঠিক কখন এবং কীভাবে এই নতুন পরিবেশে বসবাস শুরু করেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৭০ লাখ বছর আগে
ইউরেশিয়ায় এপদের বিস্তার
প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বছর আগে কিছু এপ আফ্রিকা ছেড়ে ইউরেশিয়ায় প্রবেশ করে এবং সেখানে সফলভাবে বিস্তার লাভ করে। ইউরেশিয়ার এপদের মধ্যে আরও সোজা হয়ে দাঁড়ানোর প্রবণতা এবং বাঁকানো, শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে সক্ষম আঙুলের বিকাশ ঘটে—যা আজও বৃহৎ এপদের মধ্যে দেখা যায়।
এই অঞ্চলের এপরা ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। স্পেনে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ বছর আগে পিয়েরোলাপিথেকাস বাস করত। এর হাত ছিল উল্লম্বভাবে গাছে ওঠার উপযোগী, তাই সম্ভবত এটি ডাল থেকে ডালে দোল খেতে পারত না।
একই সময়ে ড্রাইওপিথেকাস-এর মধ্যে আধুনিক গরিলার সঙ্গে অনেক মিল দেখা যায়। অন্যদিকে হিস্পানোপিথেকাস গাছের ডালে দোল খাওয়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ বছর আগে বাস করা বুরোনিয়াস সম্ভবত পরিচিত সবচেয়ে ছোট আকারের এপ, যার ওজন ছিল মাত্র ১০ কিলোগ্রাম।
১ কোটি ২০ লাখ থেকে ৭০ লাখ বছর আগে
সোজা হয়ে হাঁটার সূচনা?
এই সময় ইউরেশিয়ার কিছু এপ সম্ভবত দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটা শুরু করে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে মানব বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি—দ্বিপদ চলন—আফ্রিকার পরিবর্তে ইউরেশিয়াতেই শুরু হয়েছিল।
তবে এই ধারণা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কারণ, প্রমাণের বেশির ভাগই অসম্পূর্ণ জীবাশ্মের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, জার্মানিতে ১ কোটি ১৬ লাখ বছর আগে বাস করা ডানুভিয়াস-এর পায়ের হাড়ে সোজা হয়ে হাঁটার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একইভাবে, হাঙ্গেরির ১ কোটি বছর পুরোনো রুডাপিথেকাস-এর পেলভিস বা শ্রোণিচক্র এমনভাবে গঠিত ছিল, যা নমনীয় কোমরের ইঙ্গিত দেয়—দ্বিপদ চলনের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
তবে যদি এসব এপ সত্যিই দুই পায়ে হাঁটতও, তবু তারা যে মানুষের সরাসরি পূর্বপুরুষ ছিল, এমনটি নিশ্চিত নয়। কারণ, বিভিন্ন এপ গোষ্ঠীতে আলাদাভাবে দ্বিপদ চলনের বিবর্তন ঘটতে পারে।
১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৫৫ লাখ বছর আগে
সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ (Last Common Ancestor)
এই সময়ের কোনো এক পর্যায়ে বাস করত মানুষের এবং আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী জীবিত আত্মীয়—শিম্পাঞ্জি ও বনোবো—সবার সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ (LCA)। এই অজ্ঞাত প্রাণী থেকেই একদিকে মানুষের বংশধারা, অন্যদিকে শিম্পাঞ্জি ও বনোবোর বংশধারা পৃথক হয়ে যায়।
জিনগত তথ্য বলছে, এই পূর্বপুরুষ সম্ভবত অন্তত ৭০ লাখ বছর আগে বাস করত। তবে এটি আরও পুরোনো—প্রায় ১ কোটি বছর আগের—হতে পারে, আবার তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক, অর্থাৎ ৫৫ লাখ বছর আগেরও হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, এই বিভাজন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে দুটি বংশধারার পৃথকীকরণ ঘটে।
এই পূর্বপুরুষ কোথায় বাস করত, সেটিও এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। সবচেয়ে প্রাচীন নিশ্চিত হোমিনিনের জীবাশ্ম আফ্রিকায় পাওয়া যাওয়ায় অনেক গবেষক আফ্রিকাকেই এর আবাসস্থল মনে করেন। তবে অন্য একদল গবেষক ইউরেশিয়ার পক্ষে যুক্তি দেন। উভয় অঞ্চলের জীবাশ্ম-তথ্যই অসম্পূর্ণ।
কেনিয়ায় পাওয়া ৯৮ লাখ বছর পুরোনো নাকালিপিথেকাস হয়তো এই সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের খুব কাছাকাছি ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর পরিচয় জানা যায় মাত্র একটি চোয়ালের হাড় এবং কয়েকটি দাঁতের মাধ্যমে।
৭০ লাখ বছর আগে
সাহেলানথ্রোপাস
বর্তমান চাদের ভূখণ্ডে বাস করত সাহেলানথ্রোপাস চ্যাডেনসিস, যাকে বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন হোমিনিন হিসেবে ধরা হয়।
তবে এ সম্পর্কে আমাদের তথ্য অত্যন্ত সীমিত। কারণ, এখন পর্যন্ত মাত্র ছয় থেকে নয়জন ব্যক্তির অল্প কিছু হাড় একই ছোট এলাকায় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত “তুমাই” (Toumaï) নামে পরিচিত একটি করোটি, নিচের চোয়ালের কিছু অংশ, কয়েকটি দাঁত, একটি উরুর হাড় (ফিমার) এবং দুটি বাহুর হাড় (আলনা)।
২০০২ সালে এই প্রজাতির পরিচয় প্রকাশের পর থেকেই বিতর্ক চলছে। একদল গবেষক মনে করেন এটি দুই পায়ে হাঁটত। অন্যদের মতে, সেই দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ফলে কেউ একে হোমিনিন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন, আবার কেউ মনে করেন এটি মানুষের পূর্বপুরুষের চেয়ে এপদের সঙ্গেই বেশি সম্পর্কিত।
৬০ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩০ লাখ বছর আগে
ট্রাখিলোসের পদচিহ্ন
ভূমধ্যসাগরের ছোট দ্বীপ ট্রাখিলোসে রহস্যময় একজোড়া পদচিহ্নের সন্ধান পাওয়া গেছে।
কিছু গবেষকের মতে, এগুলো দুই পায়ে হাঁটা কোনো হোমিনিনের পদচিহ্ন। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে বোঝা যায় যে প্রাথমিক হোমিনিনরা আফ্রিকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
তবে এই পদচিহ্ন কার এবং ঠিক কখন তৈরি হয়েছিল—এ নিয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য নেই।
৬০ লাখ বছর আগে
ওরোরিন
বর্তমান কেনিয়ায় বাস করত ওরোরিন টুগেনেনসিস।
এর পায়ের হাড় থেকে ধারণা করা হয়, এটি দুই পায়ে হাঁটতে পারত। পূর্ণবয়স্কদের উচ্চতা ছিল প্রায় ১.১ থেকে ১.৪ মিটার।
তবে এদের বাহু ছিল এপদের মতোই লম্বা এবং আঙুল ছিল বাঁকানো, যা গাছে ওঠার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল।
৫৮ লাখ থেকে ৪৪ লাখ বছর আগে
আরডিপিথেকাস
এই সময় পূর্ব আফ্রিকায় বাস করত আরডিপিথেকাস।
তারা সোজা হয়ে হাঁটতে পারলেও পায়ের বড় আঙুল ছিল বৃহৎ এপদের মতো ধরতে সক্ষম, ফলে গাছে ওঠাও সহজ ছিল। তাদের মস্তিষ্ক ছিল ছোট এবং দাঁতের গঠন থেকে বোঝা যায়, তারা বিভিন্ন ধরনের খাদ্য গ্রহণ করত।
এই গণের দুটি প্রজাতি পরিচিত।
প্রথমটি আরডিপিথেকাস কাদাব্বা, যা ৫৮ লাখ বছর আগে বাস করত। এর জীবাশ্ম খুবই সীমিত। এদের ক্যানাইন দাঁত এপদের মতো বড় ছিল, তবে পরবর্তী কয়েক মিলিয়ন বছরে এই দাঁত ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়।
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে পরিচিত প্রজাতি হলো আরডিপিথেকাস রামিডাস, যা ৪৪ লাখ বছর আগে বাস করত। এর একটি স্ত্রী কঙ্কাল “আরডি” নামে পরিচিত।
আরডি হলো মানুষের অন্যতম প্রাচীন প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কাল। এটি আমাদের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
প্রথম দিকের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, আরডি শিম্পাঞ্জির তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন ছিল। সেখান থেকে ধারণা করা হয়, মানুষের ও শিম্পাঞ্জির সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষও আধুনিক শিম্পাঞ্জির মতো ছিল না।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণা দেখায়, আরডির হাত গাছের ডালে দোল খাওয়ার জন্য যথেষ্ট উপযোগী ছিল, যা আধুনিক শিম্পাঞ্জির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রাখে।
৪২ লাখ থেকে ১৯ লাখ বছর আগে
অস্ট্রালোপিথেকাস
এই সময় আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাস করত অস্ট্রালোপিথেকাস।
তাদের মধ্যে এপদের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়ে গিয়েছিল। যেমন—তুলনামূলক ছোট মস্তিষ্ক এবং গাছে ওঠার উপযোগী লম্বা ও শক্তিশালী বাহু।
অন্যদিকে তাদের কঙ্কাল স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে তারা নিয়মিত দুই পায়ে হাঁটত। এছাড়া তাদের হাতিয়ার তৈরি ও ব্যবহারেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অনেক গবেষকের মতে, অস্ট্রালোপিথেকাসের কিছু প্রজাতি থেকেই পরবর্তীকালে হোমো গণের উদ্ভব ঘটে।
আফ্রিকায় একই সময়ে অস্ট্রালোপিথেকাসের একাধিক প্রজাতি সহাবস্থান করত।
সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত প্রজাতি অস্ট্রালোপিথেকাস আনামেনসিস, যা প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় বাস করত। ধারণা করা হয়, পরবর্তী অধিকাংশ বা সব অস্ট্রালোপিথেকাস প্রজাতির পূর্বপুরুষ ছিল এটি।
পরে পূর্ব আফ্রিকায় দেখা যায় অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস। এই প্রজাতির বহু জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল থেকে পাওয়া “লুসি”।
একই সময়ে সেখানে অস্ট্রালোপিথেকাস ডেইরেমেডা নামের আরেকটি গোষ্ঠীও বাস করত। তাদের চোয়াল ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী, যা ইঙ্গিত দেয় তারা অপেক্ষাকৃত শক্ত ও কঠিন খাদ্য খেত।
অস্ট্রালোপিথেকাস শুধু পূর্ব আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
বর্তমান চাদের মধ্য আফ্রিকায় বাস করত অস্ট্রালোপিথেকাস বাহরেলগাজালি। অন্যান্য অস্ট্রালোপিথেকাসের তুলনায় তাদের খাদ্যতালিকা ছিল সীমিত এবং তারা প্রধানত ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ খেত।
দক্ষিণ আফ্রিকায়ও আরও কয়েকটি প্রজাতি ছিল। এর মধ্যে একটি অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস, যার সবচেয়ে পরিচিত জীবাশ্ম টাউং শিশু। আরেকটি বিখ্যাত জীবাশ্ম “লিটল ফুট”—যাকে কেউ এই একই প্রজাতির, আবার কেউ অস্ট্রালোপিথেকাস প্রমিথিউস নামে আলাদা প্রজাতির বলে মনে করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার আরেকটি প্রজাতি অস্ট্রালোপিথেকাস সেডিবা। তারা প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার বছর আগেও টিকে ছিল। অর্থাৎ, তারা পৃথিবীতে মানুষের প্রাথমিক হোমো সদস্যদের সঙ্গে একই সময়ে বসবাস করেছিল। তবুও তাদের দীর্ঘ বাহুসহ গাছে ওঠার উপযোগী অনেক অস্ট্রালোপিথেকাস বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন ছিল।
৩৫ লাখ থেকে ৩২ লাখ বছর আগে
কেনিয়ানথ্রোপাস
মানব বিবর্তনের সবচেয়ে কম বোঝা হোমিনিনদের একটি হলো কেনিয়ানথ্রোপাস। তারা বর্তমান কেনিয়ার লোমেকউই (Lomekwi) এলাকায় বাস করত।
এদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত, কারণ মাত্র কয়েকটি জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া একটি করোটি। এদের গালের হাড় ছিল বেশ উঁচু এবং দাঁত তুলনামূলকভাবে ছোট—যা মানুষের সঙ্গে মিল রয়েছে।
তবে জীবাশ্ম এতই অল্প যে অনেক গবেষক এখনো নিশ্চিত নন, কেনিয়ানথ্রোপাসকে সত্যিই আলাদা একটি গণ (genus) হিসেবে গণ্য করা উচিত কি না।
৩৩ লাখ বছর আগে
প্রাচীনতম পাথরের হাতিয়ার
বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে পুরোনো পাথরের হাতিয়ার কেনিয়ার লোমেকউই এলাকায় পাওয়া গেছে।
এই লোমেকউইয়ান হাতিয়ারগুলো ছিল অত্যন্ত সাধারণ ধরনের। একটি পাথর আরেকটি পাথরের ওপর আঘাত করে ধারালো খণ্ড আলাদা করা হতো। এর থেকেও পুরোনো হাতিয়ারের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে প্রাণীর হাড়ে কাটা দাগের দাবি করা হয়েছে, যদিও তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এই হাতিয়ার কোন হোমিনিন তৈরি করেছিল, কিংবা মানুষ কীভাবে প্রথম হাতিয়ার বানানো শিখেছিল—তা স্পষ্ট নয়। একটি ধারণা হলো, প্রথমে তারা প্রকৃতিতে পাওয়া ধারালো পাথর ব্যবহার করত, পরে নিজেরাই নতুন পাথরের হাতিয়ার বানানোর কৌশল উদ্ভাবন করে।
৩০ লাখ বছর আগে
সাভানার বিস্তার
কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকা সাভানা অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এর ফলে হোমিনিনরা এমন পরিবেশে বসবাস করতে শুরু করে যেখানে বনভূমি ও উন্মুক্ত তৃণভূমি—দুই ধরনের আবাসস্থলই পাশাপাশি ছিল।
২৮ লাখ থেকে ১৪ লাখ বছর আগে
প্যারান্থ্রোপাস
এই সময় পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করত প্যারান্থ্রোপাস।
মানব বিবর্তনের তুলনামূলক পরবর্তী সময়ে আবির্ভূত হলেও তাদের দেহে এপদের অনেক বৈশিষ্ট্য বজায় ছিল। মস্তিষ্ক ছিল ছোট এবং মুখ ছিল থালার মতো চ্যাপ্টা। এর কারণ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী চোয়ালের পেশি এবং বড় দাঁত।
একসময় তাদের “নাটক্র্যাকার ম্যান” নামে ডাকা হতো। কিন্তু এখন জানা গেছে, তারা শক্ত বাদাম ভাঙার জন্য নয়; বরং ঘাসের মতো শক্ত ও আঁশযুক্ত উদ্ভিদ চিবিয়ে খাওয়ার জন্য এই ধরনের দাঁত ব্যবহার করত।
বর্তমানে প্যারান্থ্রোপাসের তিনটি প্রজাতি পরিচিত।
প্যারান্থ্রোপাস রোবাস্টাস দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করত, আর প্যারান্থ্রোপাস ইথিওপিকাস এবং প্যারান্থ্রোপাস বোইসেই বাস করত পূর্ব আফ্রিকায়।
তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, প্যারান্থ্রোপাসের সঙ্গে হোমো গণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
এপসদৃশ শরীর থাকা সত্ত্বেও ক্রমশ প্রমাণ মিলছে যে তারাও হাতিয়ার তৈরি ও ব্যবহার করত। তাদের হাত ছিল শক্তিশালী ও দক্ষ। এছাড়া তাদের জীবাশ্মের সঙ্গে ওল্ডোয়ান ধরনের পাথরের হাতিয়ারও পাওয়া গেছে।
প্রায় ২৮ লাখ বছর আগে
হোমো গণের সূচনা
এই সময় আফ্রিকায় প্রথম হোমো গণের আবির্ভাব ঘটে।
সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্ম অত্যন্ত সীমিত—ইথিওপিয়ার লেদি-গেরারু এলাকা থেকে পাওয়া একটি নিচের চোয়ালের হাড় এবং কয়েকটি দাঁত।
এই ভাঙা চোয়াল ও দাঁত থেকে ধারণা করা হয়, আধুনিক মানুষ যে হোমো বংশের একমাত্র জীবিত প্রতিনিধি, সেই বংশের সূচনা আগে ধারণার তুলনায় অন্তত চার লাখ বছর আগেই হয়েছিল।
এই জীবাশ্মের বয়স প্রায় ২৮ লাখ বছর। এর আগে হোমো গণের সবচেয়ে পুরোনো জীবাশ্মের বয়স ধরা হতো প্রায় ২৪ লাখ বছর।
২৬ লাখ বছর আগে
ওল্ডোয়ান প্রযুক্তি
এই সময়ে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন ওল্ডোয়ান পাথরের হাতিয়ারের ব্যবহার শুরু হয়।
তানজানিয়ার ওল্ডুভাই (ওল্ডুপাই) গিরিখাত-এর নাম অনুসারে এই প্রযুক্তির নামকরণ করা হয়েছে।
এ ধরনের হাতিয়ার ছোট পাথর থেকে ধারালো খণ্ড আলাদা করে তৈরি করা হতো। দেখতে সাধারণ হলেও এগুলো তৈরি করতে পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং দক্ষতার প্রয়োজন ছিল।
ওল্ডোয়ান প্রযুক্তি এক মিলিয়নেরও বেশি বছর ধরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
অনেক নৃতত্ত্ববিদ একসময় মনে করতেন, কেবল হোমো গণের সদস্যরাই এই হাতিয়ার বানাত।
কিন্তু সবচেয়ে প্রাচীন ওল্ডোয়ান হাতিয়ার প্যারান্থ্রোপাস-এর জীবাশ্মের সঙ্গেও পাওয়া গেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, প্যারান্থ্রোপাসও সম্ভবত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করত।
২০ লাখ থেকে ১৮ লাখ বছর আগে
হোমো হ্যাবিলিস
এই সময় পূর্ব আফ্রিকায় বাস করত হোমো হ্যাবিলিস।
মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এটি অন্যতম পরিচিত প্রজাতি হলেও এর জীবাশ্ম খুবই অসম্পূর্ণ। ফলে এদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত।
বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ করোটির সংখ্যা খুবই কম। অনেক সময় যেসব জীবাশ্ম অন্য কোথাও খাপ খায় না, সেগুলোকেই হোমো হ্যাবিলিস হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এদের বাহু এখনো তুলনামূলকভাবে লম্বা ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা জীবনের একটি বড় অংশ গাছে কাটাত।
হোমো হ্যাবিলিসকে প্রায়ই প্রথম হোমো প্রজাতি বলা হয়।
সম্ভবত তারা ২০ লাখ বছরেরও আগে থেকেই ছিল। তবে এর আগের সম্ভাব্য জীবাশ্মগুলো এতটাই অসম্পূর্ণ যে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
২৮ লাখ বছর আগের লেদি-গেরারুর চোয়াল এবং ২৩ লাখ বছর আগের AL 666-1 নামে পরিচিত উপরের চোয়ালের হাড় সম্ভবত হোমো গণের হলেও সেগুলো পুরোপুরি হোমো হ্যাবিলিস-এর সঙ্গে মেলে না।
২০ লাখ বছর আগে
হোমো ইরেক্টাস
এই সময় হোমো ইরেক্টাস-এর প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়।
মানব বিবর্তনের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী হোমিনিনদের একটি। প্রায় ২০ লাখ বছর ধরে তারা পৃথিবীতে টিকে ছিল।
সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্ম পাওয়া গেছে ইথিওপিয়ার উচ্চভূমি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রিমোলেন এলাকা থেকে।
পরে উত্তর আফ্রিকাতেও তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে আলজেরিয়ার তিঘেন্নিফ এলাকায় প্রায় সাত লাখ বছর আগের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।
পূর্ববর্তী হোমিনিনদের তুলনায় হোমো ইরেক্টাসের মস্তিষ্ক ছিল অনেক বড়।
তাদের বাহু ছিল ছোট এবং পা ছিল দীর্ঘ, ফলে দেহের গঠন আধুনিক মানুষের সঙ্গে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এছাড়া বিখ্যাত “নারিওকোটোমে বালক”-এর জীবাশ্ম থেকে ধারণা করা হয়, তাদের শৈশবও আগের হোমিনিনদের তুলনায় দীর্ঘ ছিল।
১৮ লাখ বছর আগে
আফ্রিকার বাইরে প্রথম যাত্রা
এই সময় প্রথমবারের মতো কিছু হোমিনিন আফ্রিকা ছেড়ে ইউরেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হলো হোমো ইরেক্টাস। তারা ১৮ লাখ বছর আগে বর্তমান জর্জিয়ায় পৌঁছে যায়।
এরপর তাদের একটি অংশ পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ১৭ থেকে ১৬ লাখ বছর আগে চীনে পৌঁছায় এবং আরও পরে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।
জাভার জনসংখ্যাই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে ছিল—প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার বছর আগেও সেখানে তাদের উপস্থিতি ছিল।
আশ্চর্যের বিষয়, পশ্চিম বা মধ্য ইউরোপে হোমো ইরেক্টাসের জীবাশ্ম খুবই কম পাওয়া গেছে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলের সিমা দেল এলেফান্তে থেকে কিছু মুখের হাড় পাওয়া গেলেও সেগুলো নিশ্চিতভাবে হোমো ইরেক্টাস বলে শনাক্ত করা যায়নি।
আফ্রিকার বাইরে এরও আগে অভিবাসনের দাবি করা হয়েছে, তবে সেই প্রমাণ এখনো বিতর্কিত। যদিও অন্যান্য প্রাণীও একই সময়ে এই পথ পাড়ি দিয়েছিল, তাই এমন যাত্রা অসম্ভব ছিল না।
১৮ লাখ থেকে ১৪ লাখ বছর আগে
আগুনের ব্যবহার
এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ান্ডারওয়ার্ক গুহা এবং কেনিয়ার কয়েকটি স্থানে হোমিনিনদের আগুন ব্যবহারের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও লেভান্ত অঞ্চলের আরও কিছু সাম্প্রতিক প্রত্নস্থলেও একই ধরনের চিহ্ন মিলেছে।
তবে এই প্রাথমিক আগুনগুলোর অনেকই সম্ভবত প্রাকৃতিক দাবানল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। নিজেরা আগুন জ্বালানোর সবচেয়ে পুরোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় ৪ লাখ বছর আগে ব্রিটেনে।
হোমিনিনরা সম্ভবত রান্নার কাজে আগুন ব্যবহার করত। রান্না করা খাবার বেশি পুষ্টিকর হওয়ায় তা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া প্রায় ৩ লাখ বছর আগে পাথরের হাতিয়ার তৈরির উপকরণ পরিবর্তন করতেও আগুন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৭ লাখ বছর আগে
আশুলীয়ান পাথরের হাতিয়ার
এই সময় আশুলীয়ান (Acheulean) প্রযুক্তির প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায়।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে পরিচিত হাতিয়ার হলো অশ্রুবিন্দুর মতো আকৃতির হাতকুঠার। এগুলো ওল্ডোয়ান প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ও জটিল ছিল এবং তৈরি করতে উচ্চতর দক্ষতার প্রয়োজন হতো।
গবেষকদের ধারণা, হোমো ইরেক্টাস-ই প্রথম এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছিল।
১৩ লাখ থেকে প্রায় ৫ লাখ বছর আগে
রহস্যময় পূর্বপুরুষ ‘Ancestor X’
এই সময়ের কোনো এক পর্যায়ে বাস করত এমন এক অজানা মানব-পূর্বপুরুষ, যাকে গবেষকেরা আপাতত “Ancestor X” নামে উল্লেখ করেন।
এই প্রাণীই আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স), নিয়ান্ডারথাল (হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস) এবং ডেনিসোভানদের সর্বশেষ অভিন্ন পূর্বপুরুষ।
কিন্তু এই প্রাণীটি আসলে কোন প্রজাতির ছিল, তা এখনো জানা যায়নি।
কেউ মনে করেন এটি হোমো আন্টেসেসর, আবার কেউ হোমো হাইডেলবার্গেনসিস-এর পক্ষে মত দেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাবই নিশ্চিতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এটির সময়কাল নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
আধুনিক মানুষ, নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানের জিনোম তুলনা করে ধারণা করা হয়, এই পূর্বপুরুষ ৫ থেকে ৭ লাখ বছর আগে বাস করত।
কিন্তু কিছু জীবাশ্ম আরও পুরোনো সময়ের ইঙ্গিত দেয়।
মরক্কোতে পাওয়া প্রায় ৭ লাখ ৭৩ হাজার বছর পুরোনো কিছু হোমিনিনের মধ্যে আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের বৈশিষ্ট্য যেমন আছে, তেমনি আরও প্রাচীন হোমো ইরেক্টাস-এর বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়।
আরও বিস্ময়কর হলো চীনের ইউনশিয়ান–২ নামে পরিচিত একটি করোটি, যার বয়স ৯ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১১ লাখ বছরের মধ্যে। এটি যদি সত্যিই ডেনিসোভানের হয়, তাহলে Ancestor X-এর অস্তিত্ব তারও আগে ছিল।
৯ লাখ ৪৯ হাজার থেকে ৭ লাখ ৭২ হাজার বছর আগে
হোমো আন্টেসেসর
হোমো আন্টেসেসর বর্তমান স্পেনের উত্তরাঞ্চলে বাস করত। পশ্চিম ইউরোপে বসবাসকারী এটিই সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত হোমিনিন।
এই প্রজাতির জীবাশ্ম এখন পর্যন্ত মাত্র একটি স্থান—গ্রান দোলিনা গুহা—থেকেই পাওয়া গেছে।
পাশের সিমা দেল এলেফান্তে এলাকা থেকে ১১ থেকে ১৩ লাখ বছর পুরোনো একটি নিচের চোয়ালের হাড়ও উদ্ধার হয়েছে। তবে সেটি হোমো আন্টেসেসরের, নাকি অন্য কোনো হোমো প্রজাতির—তা নিশ্চিত নয়।
এই প্রজাতির মুখ ছিল তুলনামূলকভাবে সমতল, যা আধুনিক মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাই কেউ কেউ মনে করেন, এটি আমাদের প্রত্যক্ষ পূর্বপুরুষ হতে পারে।
৭ লাখ ৭৪ হাজার থেকে ১ লাখ ২৯ হাজার বছর আগে
মধ্য প্লাইস্টোসিনের ধাঁধা
এই সময়কে মধ্য প্লাইস্টোসিন বা চিবানিয়ান যুগ বলা হয়।
মানব বিবর্তনের গবেষণায় একে অনেক সময় “মাডল ইন দ্য মিডল” বা “মধ্যবর্তী জটিল অধ্যায়” বলা হয়। কারণ, এই সময়ের জীবাশ্ম এতটাই বৈচিত্র্যময় ও বিভ্রান্তিকর যে সেগুলোকে নির্দিষ্ট প্রজাতিতে শ্রেণিবদ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন।
এই সমস্যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হোমো হাইডেলবার্গেনসিস।
প্রথমে জার্মানির মাওয়ার এলাকা থেকে প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার বছর পুরোনো একটি নিচের চোয়ালের ভিত্তিতে এই প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।
পরে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন জীবাশ্মকেও এই প্রজাতির বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু এসব দাবির অনেকগুলোই বিতর্কিত। ফলে বর্তমানে অনেক গবেষক মনে করেন, হোমো হাইডেলবার্গেনসিস সম্ভবত কেবল ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল।
প্রায় ৫ লাখ বছর আগে
রঞ্জক, অলংকার ও পোশাকের সূচনা
এই সময় হোমিনিনদের মধ্যে প্রথম রঞ্জক পদার্থ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বিশেষ করে লাল-কমলা রঙের ওখার (ochre) খনিজ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। ধারণা করা হয়, প্রথমে তারা নিজের শরীর রাঙাতেই এই রঙ ব্যবহার করত।
একই সময়ে—সম্ভবত কোনো হোমো ইরেক্টাস—ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে একটি ঝিনুকের খোলসে জিগজ্যাগ নকশা খোদাই করে। এটিই বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন অলংকরণ বা প্রতীকী নকশা।
এ সময় হোমিনিনরা সম্ভবত সাধারণ ধরনের পোশাকও তৈরি ও ব্যবহার শুরু করে।
এর প্রধান প্রমাণ হলো হাইড স্ক্র্যাপার—প্রাণীর চামড়া পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ পাথরের হাতিয়ার। পশম বা চামড়ার পোশাক তৈরির জন্য এই প্রক্রিয়া ছিল অপরিহার্য।
৪ লাখ ৭৬ হাজার বছর আগে
প্রাচীনতম কাঠের নির্মাণ
বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে পুরোনো কাঠের নিদর্শন পাওয়া গেছে জাম্বিয়ার কালাম্বো জলপ্রপাত এলাকায়।
এখানে পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লাগানো কয়েকটি কাঠের গুঁড়ি উদ্ধার হয়েছে, যা সম্ভবত কোনো বড় কাঠামো বা ভবনের অংশ ছিল।
সবচেয়ে পুরোনো পরিচিত কাঠের হাতিয়ার হলো গ্রিসে পাওয়া একটি আকৃতি দেওয়া কাঠের লাঠি, যার বয়স প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার বছর।
তবে গবেষকদের ধারণা, মানুষ এরও বহু আগে কাঠের তৈরি জিনিস ব্যবহার করত। কিন্তু কাঠ সহজেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর কোনো নিদর্শন সংরক্ষিত হয়নি।
৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বছর আগে
নিয়ান্ডারথাল
এই সময় ইউরেশিয়াজুড়ে বাস করত নিয়ান্ডারথাল (হোমো নিয়ান্ডারথালেনসিস)।
তারা নানা ধরনের হাতিয়ার, অলংকার এবং শিল্পবস্তু তৈরি করত। অনেক গবেষকের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বসতি বা স্থায়ী আবাস নির্মাণের প্রথম উদাহরণও সম্ভবত তাদের কাছেই দেখা যায়।
নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে আধুনিক মানুষের সমপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার বহু প্রমাণ রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার বছর আগে তারা ফ্রান্সের ব্রুনিকেল গুহার গভীরে পাথরের বৃত্তাকার কাঠামো নির্মাণ করেছিল।
বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন নিয়ান্ডারথাল জীবাশ্ম পাওয়া গেছে স্পেনের সিমা দে লস হুয়েসোস এলাকা থেকে, যার বয়স প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার বছর।
জিনগত গবেষণা দেখায়, নিয়ান্ডারথালরা মাঝে মাঝে আধুনিক মানুষ এবং ডেনিসোভানদের সঙ্গে আন্তঃপ্রজনন করেছিল।
যদিও কিছু সংকর সন্তানের জিনগত সমস্যা ছিল, তবু পর্যাপ্ত সংখ্যক সন্তান বেঁচে ছিল, যার ফলে তিনটি গোষ্ঠীর জিনোমেই একে অপরের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে।
আজকের পৃথিবীর বহু মানুষের শরীরে এখনো নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ বহমান।
বর্তমানে পরিচিত সর্বশেষ নিয়ান্ডারথাল জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৪০ হাজার বছর। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যেই তাদের বিলুপ্তি ঘটে।
তাদের বিলুপ্তির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, ছোট ও বিচ্ছিন্ন জনসংখ্যা এবং ইউরোপে আধুনিক মানুষের আগমন—সবকটিই ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নিয়ান্ডারথালরা দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় টিকে ছিল।
প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বছর আগে
আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) আবির্ভাব
এই সময় আফ্রিকায় আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স)-এর আবির্ভাব ঘটে।
বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্ম পাওয়া গেছে মরক্কোর জেবেল ইরহুদ থেকে। এসব জীবাশ্মের বয়স আনুমানিক ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার বছরের মধ্যে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্লোরিসবাদ থেকে পাওয়া একটি করোটিও সম্ভবত প্রাথমিক হোমো স্যাপিয়েন্সের। এর বয়স প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার বছর।
পরে ইথিওপিয়ার ওমো কিবিশ থেকে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার বছর এবং হার্তো এলাকা থেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বছর পুরোনো আধুনিক মানুষের জীবাশ্ম উদ্ধার হয়েছে।
এসব প্রমাণ দেখায়, শুরু থেকেই আধুনিক মানুষ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিল এবং তাদের মধ্যে বৈচিত্র্যও ছিল উল্লেখযোগ্য।
প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৩৬ হাজার বছর আগে
হোমো নালেদি
বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকায় বাস করত হোমো নালেদি।
এদের জীবাশ্ম এখন পর্যন্ত একটিমাত্র স্থান—রাইজিং স্টার গুহা—থেকেই পাওয়া গেছে।
এত সাম্প্রতিক সময়ে বাস করলেও হোমো নালেদির মস্তিষ্ক ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট।
তবুও এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে তারা আগুন ব্যবহার করত এবং গুহার দেয়ালে খোদাই করা চিহ্ন তৈরি করেছিল।
সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি হলো, তারা সম্ভবত নিজেদের মৃতদের গুহার ভেতর সমাধিস্থ করত।
যদি তা সত্যি হয়, তাহলে বোঝা যায় ছোট মস্তিষ্কের হোমিনিনদের মধ্যেও মৃত্যু উপলক্ষে আচার বা প্রতীকী আচরণের ধারণা গড়ে উঠেছিল।
প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩২ হাজার বছর আগে
ডেনিসোভান
ডেনিসোভানরা পূর্ব এশিয়ায় বাস করত।
তারা নিয়ান্ডারথালদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিল। সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহা থেকে প্রথম জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হওয়ায় তাদের এই নাম দেওয়া হয়েছে।
মানব বিবর্তনের ইতিহাসে ডেনিসোভানরাই প্রথম হোমিনিন, যাদের পরিচয় মূলত প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।
তাদের দেহ ছিল বড়, দাঁত ছিল মোটা এবং করোটি ছিল শক্তিশালী।
কিন্তু এখন পর্যন্ত খুব অল্পসংখ্যক জীবাশ্ম ও হাতে গোনা কিছু প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। ফলে তাদের দেহের গঠন, জীবনযাপন এবং আচরণ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত।
তারা ঠিক কতদিন টিকে ছিল কিংবা কীভাবে বিলুপ্ত হয়েছিল—তাও এখনো পরিষ্কার নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ডেনিসোভানরা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিল এবং তাদের মধ্যেও বৈচিত্র্য ছিল।
তারা আধুনিক মানুষের সঙ্গে আন্তঃপ্রজনন করেছিল।
ফলে আজও এশিয়ার বহু জনগোষ্ঠীর শরীরে ডেনিসোভানদের জিনগত উত্তরাধিকার বহন করছে।
প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার থেকে ৫০ হাজার বছর আগে
হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে বাস করত ক্ষুদ্রাকৃতির হোমিনিন হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস, যাদের জনপ্রিয় নাম “হবিট”।
লিয়াং বুয়া গুহা থেকে উদ্ধার করা জীবাশ্মে দেখা যায়, তাদের উচ্চতা ছিল মাত্র এক মিটারের মতো।
মস্তিষ্কও ছিল ছোট, তবে তুলনামূলকভাবে উন্নত।
এই প্রজাতির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রাচীন পাথরের হাতিয়ারের বয়স প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার বছর।
একটি প্রচলিত ধারণা হলো, তারা হোমো ইরেক্টাস থেকে বিবর্তিত হয়েছিল এবং দ্বীপে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাসের কারণে তাদের দেহ ক্রমশ ছোট হয়ে যায়।
ফ্লোরেসের আরেকটি স্থান মাতা মেঙ্গে থেকে ৭ লাখ বছর পুরোনো ছোট আকারের হোমিনিনের জীবাশ্মও পাওয়া গেছে, যাদেরকে হবিটদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে পরিচিত সর্বশেষ হবিট জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫০ হাজার বছর।
জলবায়ুর পরিবর্তন এবং আধুনিক মানুষের আগমন সম্ভবত তাদের বিলুপ্তির কারণগুলোর মধ্যে ছিল।
প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার থেকে ৫০ হাজার বছর আগে
হোমো লুজনেনসিস
ফিলিপাইনের লুজন দ্বীপে বাস করত হোমো লুজনেনসিস।
এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি হাড় ও দাঁত পাওয়া গেছে, তাই তাদের সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়।
এদের বয়স নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
কিছু গবেষণায় জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫০ হাজার বছর বলা হলেও, অন্য গবেষণায় তা অন্তত ১ লাখ ৩৪ হাজার বছর পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১ লাখ থেকে ৫০ হাজার বছর আগে
আফ্রিকার বাইরে আধুনিক মানুষের বিস্তার
এই সময় আধুনিক মানুষ আফ্রিকা ছেড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
তারা কেন ঠিক এই সময়ে অভিবাসন শুরু করেছিল, তা নিশ্চিত নয়।
এর আগেও আফ্রিকার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সেই অভিবাসনের কোনো জিনগত চিহ্ন বর্তমান মানুষের মধ্যে টিকে নেই।
গবেষকদের ধারণা, আরব উপদ্বীপ ছিল এই অভিবাসনের প্রধান প্রবেশপথ।
ইউরেশিয়ায় পৌঁছে আধুনিক মানুষ ধীরে ধীরে নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের স্থান দখল করে, যদিও তাদের সঙ্গে কিছুটা আন্তঃপ্রজননও ঘটে।
প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষ অস্ট্রেলিয়াতেও পৌঁছে যায়।
এই যাত্রায় একাধিক সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে হয়েছিল।
আমেরিকায় পৌঁছাতে আরও বেশি সময় লেগেছে।
প্রথমে মানুষ উত্তর-পূর্ব রাশিয়ায় বসতি স্থাপন করে এবং পরে বরফে ঢাকা স্থলসেতু পেরিয়ে আলাস্কায় প্রবেশ করে।
এটি ঘটে আনুমানিক ৩৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার বছর আগে।
এরপর তারা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি আমাজন অরণ্য পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
প্রায় ৭৩ হাজার বছর আগে থেকে
গুহাচিত্র ও শৈল্পিক প্রকাশ
এই সময় থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স, এবং সম্ভবত নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানের মতো অন্যান্য হোমিনিনও গুহাচিত্র ও শিলাচিত্র তৈরি করতে শুরু করে।
বর্তমানে পৃথিবীর প্রতিটি জনবসতিপূর্ণ মহাদেশেই এই ধরনের প্রাচীন শৈল্পিক নিদর্শন পাওয়া গেছে।
এই লেখা প্রকাশের সময় পর্যন্ত পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্রের বয়স অন্তত ৬৮ হাজার বছর।
এটি ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের একটি গুহার দেয়ালে আঁকা একটি হাতের ছাপ।
বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন কাহিনিনির্ভর চিত্রও সুলাওয়েসিতেই পাওয়া গেছে।
অন্তত ৫১ হাজার ২০০ বছর আগে আঁকা সেই ছবিতে একটি শূকরকে ঘিরে মানুষের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে।
আর বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে পুরোনো অঙ্কন হলো দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লম্বোস গুহা থেকে পাওয়া একটি পাথরের ওপর লাল ওখার দিয়ে আঁকা কয়েকটি রেখা।
এর বয়স প্রায় ৭৩ হাজার বছর।
প্রায় ৪০ হাজার থেকে ১০ হাজার বছর আগে
প্রতীক থেকে প্রোটো-লেখা
এই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গুহার দেয়ালে বারবার একই ধরনের প্রতীক খোদাই বা আঁকা হতে দেখা যায়।
গবেষকদের ধারণা, এসব প্রতীক হয়তো কোনো ধরনের সংকেত বা কোড ছিল, যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান করা হতো।
এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ লিপি বলা যায় না, কারণ প্রতীকের সংখ্যা ও ব্যবহার ছিল সীমিত।
তবে এগুলোকে প্রকৃত লেখার পূর্বসূরি বা ‘প্রোটো-লেখা’ (Proto-writing) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রায় ৪০ হাজার থেকে ১৪ হাজার বছর আগে
কুকুরের গৃহপালন
এই সময় ইউরেশিয়ার কিছু নেকড়ে ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত কুকুরে রূপান্তরিত হয়। এটাই পৃথিবীর প্রথম গৃহপালিত প্রাণীর আবির্ভাব।
গৃহপালনের ফলে তাদের দেহের আকার ছোট হয়ে আসে এবং ক্যানাইন দাঁতও তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে যায়। এ ছাড়াও শারীরিক গঠনে আরও নানা পরিবর্তন ঘটে।
প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে এসে এসব প্রাথমিক কুকুর আধুনিক কুকুরের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, সে সময় মানুষ তাদের যত্ন নিত এবং সম্ভবত পরিবারের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করত।
একই সময়ে আরও কিছু বন্য প্রাণী মানুষের বসতির আশপাশে বসবাস শুরু করে এবং মানুষের উপস্থিতি থেকে খাদ্যসহ বিভিন্ন সুবিধা নিতে থাকে, যদিও তারা পুরোপুরি গৃহপালিত হয়ে ওঠেনি।
এ ধরনের প্রাণীর মধ্যে ছিল শিয়াল, কবুতর ও সিগাল।
পরবর্তী সহস্রাব্দগুলোতে মানুষ আরও অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদকে গৃহপালিত বা চাষযোগ্য করে তোলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গম, মুরগি এবং বিড়াল—যদিও বিড়ালকে এখনো পুরোপুরি গৃহপালিত প্রাণী বলা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
তবে এসব গৃহপালনের ঘটনা ঘটে মানুষের কৃষিকাজ শুরু হওয়ার পর, অর্থাৎ আরও অনেক পরে।
১২ হাজার থেকে ৪ হাজার বছর আগে
নব্য প্রস্তর যুগ (নিওলিথিক)
এই সময় মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সমাজ শিকার ও খাদ্যসংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিভিত্তিক জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করে।
এই পরিবর্তন প্রায় একই সময়ে, যদিও একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে, পশ্চিম এশিয়ার উর্বর অর্ধচন্দ্রাকার অঞ্চল (Fertile Crescent), আফ্রিকার বিভিন্ন অংশ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া এবং পাপুয়া নিউগিনিতে ঘটে।
কৃষির বিকাশের ফলে মানুষ স্থায়ী গ্রাম ও জনপদ গড়ে তোলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বসতির অনেকগুলো বড় শহরে পরিণত হয় এবং সেখান থেকে জন্ম নেয় শক্তিশালী, স্তরবিন্যস্ত ও সংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা।
প্রায় ৫,৩০০ বছর আগে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ লেখনপদ্ধতি বা লিখিত ভাষার উদ্ভব ঘটে।
মাইকেল মার্শাল 


























