জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে অপ্রত্যাশিত দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। দেশটির নিয়োগদাতারা গত মাসে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বদলে ২৩ হাজার চাকরি কমিয়েছে। অথচ অর্থনীতিবিদরা প্রায় ৮০ হাজার নতুন চাকরি যোগ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। শুল্ক, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির বাড়তি দাম, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে এই পরিস্থিতি মার্কিন অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বেকারত্ব কমলেও শ্রমবাজার সংকুচিত
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের শুক্রবার প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, জুলাইয়ে বেকারত্বের হার সামান্য কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। তবে এটিকে শ্রমবাজারের শক্তিশালী হওয়ার সরাসরি লক্ষণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। মূলত বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় বেকারত্বের হার কমেছে।
অবসর নেওয়ার বয়সে পৌঁছানো বেবি বুমার প্রজন্মের বড় অংশ কর্মক্ষেত্র ছাড়ছে। পাশাপাশি কর্মক্ষম বয়সী কিছু মানুষও ভালো চাকরির সুযোগের অপেক্ষায় চাকরি খোঁজা থেকে বিরত থাকছেন। ফলে কর্মরত বা চাকরি খুঁজছেন—এমন মানুষের অনুপাত ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

আগের দুই মাসের হিসাবেও বড় সংশোধন
শুধু জুলাইয়ের পরিসংখ্যান নয়, মে ও জুনের কর্মসংস্থানের হিসাবও সংশোধন করা হয়েছে। দুই মাস মিলিয়ে আগের হিসাবের তুলনায় ১ লাখ ৩ হাজার কম চাকরি তৈরি হয়েছিল বলে নতুন তথ্যে উঠে এসেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বসন্তকাল থেকেই শ্রমবাজারে ধীরগতি তৈরি হচ্ছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্কের কারণে ব্যবসার ব্যয় বাড়া এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেল সরবরাহ ও জ্বালানি ব্যয়ে চাপ তৈরি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রসারণ ও নিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতিও কিছু ক্ষেত্রে নতুন নিয়োগের প্রয়োজন কমাতে পারে।
শিল্পভেদে ভিন্ন চিত্র
জুলাইয়ে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ২২ হাজার নতুন চাকরি যোগ হয়েছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণের বাড়তি চাহিদায় নির্মাণ খাতেও কর্মসংস্থান বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি এবং পেশাগত ও ব্যবসায়িক সেবাতেও নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে।
তবে সরকারি স্কুল ও কমিউনিটি কলেজগুলোতে ৫০ হাজার চাকরি কমেছে। অবসর, শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি এবং মহামারি-পরবর্তী কেন্দ্রীয় সহায়তা শেষ হওয়ার প্রভাব এতে থাকতে পারে। আবার শিক্ষা খাতের মৌসুমি পরিসংখ্যানের কারণেও এই পতন আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে অবকাশ ও আতিথেয়তা খাতে ৪০ হাজার চাকরি কমেছে। বিশ্বকাপ ঘিরে প্রত্যাশিত নিয়োগও তেমন হয়নি। রেস্তোরাঁ, বার ও বিনোদন প্রতিষ্ঠান কর্মী কমিয়েছে। খুচরা ব্যবসা ও অর্থ খাতেও কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে।
মজুরি বৃদ্ধির গতিও কমেছে
জুনে ঘণ্টাপ্রতি গড় মজুরি ছিল ৩৭ দশমিক ৬২ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে মজুরি বেড়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা মহামারি-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ধীরগতির বৃদ্ধি। আগামী সপ্তাহের মূল্যস্ফীতির তথ্য যদি দেখায় যে পণ্যের দাম আবার মজুরির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে, তাহলে ভোক্তাদের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফেডের সুদহার সিদ্ধান্তে নতুন সমীকরণ
দুর্বল কর্মসংস্থানের তথ্য ওয়াল স্ট্রিটে অবশ্য ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, শ্রমবাজারের এই দুর্বলতা সেপ্টেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমাতে পারে।
তবে মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগ। গত সপ্তাহে ফেডের তিন কর্মকর্তা সুদহার বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। আগামী সপ্তাহের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে দুর্বল শ্রমবাজারও সুদহার বৃদ্ধির চাপ পুরোপুরি কমাতে নাও পারে।
তারপরও মার্কিন শ্রমবাজার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ভোক্তা ব্যয় এখনো শক্তিশালী, নতুন বেকারভাতা আবেদনের সংখ্যা কম এবং জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র ৩৩ হাজার ৪২৯টি চাকরি ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে—দুই বছরের মধ্যে যা সর্বনিম্ন মাসিক সংখ্যা।
তবে অর্থনীতিবিদদের কাছে নিয়োগ কমে যাওয়ার সঙ্গে ছাঁটাইও না বাড়ার এই সমীকরণ অস্বাভাবিক। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে চাকরির প্রয়োজনও কমে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। আগামী মাসগুলোতে অভিবাসীদের অস্থায়ী সুরক্ষা বাতিলের প্রভাবও কর্মসংস্থানে পড়তে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















