অন্য কোনো দেশের মুদ্রানীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের ঘটনা খুবই বিরল। সাধারণত কোনো দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলেই ওয়াশিংটন এমন পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপগুলোতে সেই ধরনের জরুরি পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তবুও তিনটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের মুদ্রাকে সরাসরি সহায়তা করেছে বা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র এমন করছে কেন? অন্য একটি দেশের মুদ্রা কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা, কিংবা সাময়িকভাবে ডলারের বিনিময়ে সেই দেশের মুদ্রা দেওয়ার ব্যবস্থা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যে মুদ্রার দাম ক্রমাগত কমছে, সেটিকে সমর্থন করা আরও ব্যয়বহুল হতে পারে। তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতির পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?
এর পেছনে নিছক মানবিক সহায়তা বা উদারতা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন নিজের নীতিগুলোকে এগিয়ে নিতে এবং ঘনিষ্ঠ মিত্রদের পুরস্কৃত করতেও মুদ্রাবাজারকে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ মুদ্রাবাজার এখন শুধু অর্থনৈতিক নীতির হাতিয়ার নয়; এর মাধ্যমে প্রকাশ্যভাবে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এসব পদক্ষেপ থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। বাজারের শক্তি যদি প্রশাসনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিপরীতে যায়, তাহলে সরকার সেই বাজারশক্তির বিরুদ্ধেও লড়াই করতে প্রস্তুত। তবে এ ধরনের হস্তক্ষেপেরও সীমা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আর্থিক বাজারের শক্তিই হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।

আর্জেন্টিনার পেসো থেকে শুরু
গত অক্টোবর মাসে ট্রাম্প প্রশাসন আর্জেন্টিনার পেসোকে সহায়তা করেছিল। সে সময় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা নির্বাচনের আগে পেসোর মূল্য দ্রুত কমছিল। মিলেই ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃঢ় মতাদর্শিক মিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পেসো কেনা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ মিলেই যদি অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হতেন, তাহলে পেসোর মূল্য আরও ভয়াবহভাবে পড়ে যেতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার্কিন সমর্থন সফল হয়। পেসোকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নির্বাচনে মিলেইয়ের অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
এরপর মিলেই সরকার ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট বাস্তবায়ন করে। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সরকারি ঘাটতির অবসান ঘটে এবং সরকারি ঋণও নিম্নমুখী হতে শুরু করে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কমে এবং পেসোর অবস্থানও স্থিতিশীল হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বার্তা
এর কিছুদিন পর ইরান যুদ্ধ শুরু হলে ওয়াশিংটন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকার একটি সম্ভাব্য মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার কথা প্রকাশ করে। এই ব্যবস্থায় আমিরাত ডিরহামের বিনিময়ে ডলার পাওয়ার সুযোগ পেতে পারত।
যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। তবুও এই আলোচনাকে প্রকাশ্যে আনা হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেওয়ার জন্য। বার্তাটি ছিল—সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার এবং প্রয়োজনের সময় সে দেশ আমেরিকার সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।
এবার লক্ষ্য জাপানের ইয়েন
এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জাপান সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করছে। লক্ষ্য জাপানের ইয়েনের মূল্যকে শক্তিশালী করা।
হস্তক্ষেপের আগে এক বছরের মধ্যে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য ১০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল। সমন্বিতভাবে ইয়েন কেনার ফলে মুদ্রাটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইয়েনের পতন নিয়ে জাপানের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইয়েন দুর্বল হলে বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইয়েনভিত্তিক সম্পদ থেকে দূরে সরে গেলে জাপান সরকারের ঋণের সুদের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছেন। কিন্তু এতে এমনিতেই বিশাল সরকারি ঋণের বোঝা আরও বাড়তে পারে। জাপানের সরকারি ঋণ দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের দ্বিগুণেরও বেশি। এই ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে গেলে তাকাইচির পরিকল্পনাগুলোই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ইয়েনকে বাঁচিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কোথায়?
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাপান এখন মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের সবচেয়ে বড় বিদেশি মালিক।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ইয়েন কেনার জন্য ডলার সংগ্রহ করতে তাদের কিছু মার্কিন সরকারি ঋণপত্র বিক্রি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের সুদের হার বাড়াতে হতে পারে। কারণ অন্য বিনিয়োগকারীদের এসব ঋণপত্র কিনতে আকৃষ্ট করতে বেশি সুদ দিতে হবে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে মার্কিন ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও ঋণের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয়ও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাপান থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। কিন্তু ইয়েন যদি আরও দুর্বল হতে থাকে, তাহলে জাপানি পণ্যের দাম কমে যাবে। ফলে দুর্বল ইয়েনের কারণে জাপানি পণ্যের সস্তা হয়ে যাওয়ার সুবিধা মার্কিন শুল্ককে কার্যত নিষ্প্রভ করে দিতে পারে।

ইয়েন নিয়ে জাপানের পুরোনো অভিজ্ঞতা
মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে জাপানের। কখনো ইয়েনের মূল্য খুব দ্রুত বেড়ে গেলে সেটিকে ঠেকাতে জাপান বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। আবার কখনো ইয়েনের মূল্য কমে গেলে পতন ঠেকাতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে এবার নতুন বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা। এটিই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চিত উপাদান।
যৌথ হস্তক্ষেপ কি সত্যিই কাজ করবে?
মুদ্রাবাজারে কোনো বড় পরিবর্তন ঘটলে বাজার অনেক সময় একদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে যায়। এই অতিরিক্ত ওঠানামা কমিয়ে বাজারকে স্থিতিশীল রাখা মুদ্রাবাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের একটি যৌক্তিক কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত আর্থিক শক্তি যুক্ত হওয়ায় ইয়েনের অস্বাভাবিক ওঠানামা থেকে লাভ করতে চাওয়া জল্পনাকারীরাও পিছিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, কেবল বাজারে হস্তক্ষেপ করে কোনো মুদ্রার দীর্ঘমেয়াদি পতন ঠেকানো কঠিন। এর পেছনে অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন না থাকলে এমন উদ্যোগ সাধারণত শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
আর ইয়েনের সাম্প্রতিক দুর্বলতাকে শুধু বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামার ফল বলা কঠিন। সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপের আগে ২০২০ সাল থেকে ডলারের তুলনায় ইয়েন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মূল্য হারিয়েছে।
জাপান একটি ধনী দেশ হলেও দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ বিপুল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ছিল দুর্বল। এর সঙ্গে তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং ইয়েনের মূল্য আরও কমে যেতে পারে।

এখানে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়। ইয়েন দুর্বল হলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আর মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা আবার ইয়েনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন অন্য অবস্থানে
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার এখনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।
এ কারণে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে স্বল্পমেয়াদি মার্কিন সরকারি ঋণপত্র বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সুদের হারের মধ্যে ইতোমধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন সুদের হার আরও বাড়লে তা ইয়েনের জন্য আরও খারাপ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আপাতদৃষ্টিতে সুবিধাজনকও হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব বড় সমস্যা তৈরি করছে। সরকারি ব্যয় ও ঋণের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ না এলে দেশটি আরও গভীর ঋণের গর্তে ঢুকে পড়তে পারে।

দুই দেশের একই বিপদ
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অর্থনীতির দুই ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি বড় সমস্যা অভিন্ন—দুই দেশেরই সরকারি ঋণের পরিমাণ টেকসই সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ তাই অনেকটা টোকিও ও ওয়াশিংটনের এমন একটি মরিয়া চেষ্টা, যার মাধ্যমে তারা আর্থিক বাজারের দেওয়া সতর্কবার্তা এড়িয়ে যেতে চাইছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারই বাজারের শক্তিকে চিরদিন এড়িয়ে যেতে পারবে না। লাগামহীনভাবে সরকারি ঋণ বাড়াতে থাকলে আর্থিক বাজার একসময় তার মূল্য আদায় করবেই।
সেই কারণেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও জাপার জন্য আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে। মুদ্রাকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর না করলে বাজারের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সামনে আসবেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















