থাইল্যান্ডের ফুকেটের তাং খেন উপসাগরের তীরে বসে পর্দার দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছেন থেরাসাক ‘পপ’ সাকস্রিতাউই। পানির নিচে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া কৃমির মতো একটি অবয়ব দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ওটা পেনওয়াট।’
পেনওয়াট থাইল্যান্ডের হাতে গোনা কয়েকটি বেঁচে থাকা ডুগংয়ের একটি। সমুদ্রগাভী নামেও পরিচিত এই শান্ত স্বভাবের সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো একসময় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের ত্রাং প্রদেশের উপকূলে থাকত। কিন্তু সেখানে খাদ্যের প্রধান উৎস সামুদ্রিক ঘাস দ্রুত কমে যাওয়ায় তাদের একটি দল প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরের ফুকেটের উপকূলে চলে আসে।
ডুগং দেখেই বদলে গেল জীবন
দুই বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন তাং খেন উপসাগরে আসছেন পপ। ড্রোন উড়িয়ে তিনি ডুগংগুলোর সংখ্যা, শারীরিক অবস্থা, চলাফেরা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।
কয়েক বছর আগেও এমন কাজের কথা তার কল্পনাতেও ছিল না। তিনি মূলত একটি ক্যাফে চালাতেন এবং ২০২৪ সালের আগে ডুগং কী, সেটিও জানতেন না। কিন্তু প্রথমবার একটি ডুগং দেখার পর প্রাণীগুলোর প্রতি তার গভীর মমতা তৈরি হয়।
ফুকেটের রাওয়াই সৈকতে একটি ডুগং দেখা গেছে—এমন খবর পেয়ে তিনি সেখানে ছুটে যান। সেটিই ছিল তার জীবনের প্রথম ডুগং দেখা। সেদিনই তিনি ড্রোন উড়িয়ে প্রাণীটির গতিবিধি ধারণ করেন।
পপ আগে থেকেই চমৎকার ছবি তোলার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন জায়গার নান্দনিক দৃশ্য ধারণ করে তার অনুসারীর সংখ্যা ছিল অনেক। কিন্তু ডুগং তাকে অন্যভাবে নাড়া দেয়।
‘আমি ওদের ভালোবেসে ফেলেছিলাম। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, ওরা খুবই সুন্দর,’—বলেন পপ।
পরদিন তিনি আবার সৈকতে ফিরে দেখেন, তার ধারণ করা ভিডিও দেখে অনেক মানুষ সেখানে ডুগং দেখতে চলে এসেছে।
ডুগংয়ের সংকট বুঝতে শুরু করেন পপ
ফুকেটে ডুগং আসার বিষয়টি স্থানীয় মানুষের জন্য আনন্দের হলেও এর পেছনের কারণ ছিল উদ্বেগজনক। পপও শুরুতে জানতেন না কেন প্রাণীগুলো তাদের পুরোনো আবাস ছেড়ে এখানে এসেছে।
পরে তিনি জানতে পারেন, ২০২৪ সালের দিকে ত্রাং অঞ্চলে সামুদ্রিক ঘাসের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। ফলে খাদ্যের সংকটে অপুষ্টিতে ভোগা অনেক ডুগং তীরে ভেসে উঠতে শুরু করে।
থাই সরকারের হিসাবে ২০২২ সালে দেশটির জলসীমায় প্রায় ২৭৩টি ডুগং ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২০০-তে দাঁড়িয়েছে। পপের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও কম—১০০ থেকে ১৫০-এর মধ্যে। চীনে প্রাণীটি কার্যত বিলুপ্তির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পপের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর একটি ছিল জিন জক নামের একটি স্ত্রী ডুগংয়ের মৃত্যু। তীরে পড়ে থাকা মৃতদেহটি পেটের একটি দাগ দেখে তিনি শনাক্ত করেন।
জিন জককে তিনি শুধু একটি প্রাণী হিসেবে দেখতেন না। তার বিশ্বাস, অন্য ডুগংগুলোকে তাং খেন উপসাগরে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে জিন জকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তার মৃত্যুর পরই পপ আরও দৃঢ়ভাবে কাজে নেমে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, ডুগংগুলোকে চেনা, তাদের চলাফেরা অনুসরণ করা এবং মৃত্যুর কারণ বোঝা জরুরি।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ড্রোনের ছবি
এরপর থেকে পপ কয়েক ডজন ডুগং শনাক্ত করেছেন। থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও তিনি কাজ করছেন।
তার ড্রোনে ধারণ করা ভিডিও এখন গবেষকদের জন্য মূল্যবান তথ্যের উৎস। বিশেষ করে ডুগংয়ের এমন কিছু আচরণ তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, যা আগে বিজ্ঞানীরা সরাসরি দেখার সুযোগ পাননি।
ডুগংয়ের মিলন, লড়াই এবং দলগত আচরণ সম্পর্কে তার ধারণ করা দৃশ্য গবেষণায় নতুন তথ্য যোগ করেছে। একজন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী পপের কাজকে বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক বলে উল্লেখ করেছেন।

শুধু ডুগং নয়, বাঁচাতে হবে সামুদ্রিক ঘাসও
ডুগং রক্ষার কাজ কেবল প্রাণীগুলোকে খুঁজে বের করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সামুদ্রিক ঘাসের আবাসস্থল রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং পানিতে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিসহ নানা কারণে সামুদ্রিক ঘাস কমে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত সামুদ্রিক ঘাস রোপণের উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এই ঘাস নিজে থেকেই আবার জন্মাতে পারে। তবে সেই পুনরুদ্ধারে সময় লাগে এবং পানির পরিবেশকে নিরাপদ রাখা জরুরি।
ত্রাং এলাকায় সামুদ্রিক ঘাস আবার বাড়তে শুরু করায় অনেক ডুগং সেখানে ফিরে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাওয়াই এলাকায় সামুদ্রিক ঘাস কমে গেছে। তাং খেন উপসাগরেও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেখানে সামুদ্রিক ঘাসের বড় অংশ ক্ষতিকর নীল-সবুজ শৈবালে ঢেকে গেছে।
প্রস্তাবিত স্থলসেতু নিয়েও উদ্বেগ
ফুকেট থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে প্রস্তাবিত একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিয়েও পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ রয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় থাইল্যান্ড উপসাগর ও আন্দামান সাগরের উপকূলকে দুটি নতুন বন্দর এবং প্রায় ৯০ কিলোমিটার রেলপথের মাধ্যমে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।

পপের আশঙ্কা, নির্মাণকাজ থেকে উৎপন্ন ময়লা ও পলি ভারী বৃষ্টির সময় সমুদ্রে গিয়ে সামুদ্রিক ঘাসের মাঠ ঢেকে দিতে পারে। এতে ডুগংয়ের খাদ্যের উৎস আরও সংকুচিত হবে।
তার মতে, নির্মাণকাজের কারণে পানি ঘোলা হয়ে গেলে শব্দ ও দূষণ বাড়বে এবং বড় জাহাজের চলাচলও প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে জুলাইয়ের শেষ দিকে থাইল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে পর্যালোচনায় প্রশ্ন ওঠার পর প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে ছোট পরিসরে নেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত পপকে কিছুটা আশাবাদী করেছে।
ড্রোন, ডুগং আর এক বিশ্বস্ত সঙ্গী
মে মাসের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে তাং খেন উপসাগরে ড্রোন নিয়ে কাজ করছিলেন পপ। তার পাশে ছিল ‘তাং খেন’ নামের একটি হাঁস। পপের সঙ্গে অদ্ভুত এক বন্ধন তৈরি হওয়া এই হাঁসটি ড্রোন ওড়ানোর সময় প্রায় সবসময় তার কাছাকাছি থাকে।
একটি স্যুটকেসে রাখা ব্যাটারি বদলে বদলে পপ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রায় ২০ মিনিট পরপর ড্রোনের ব্যাটারি বদলাতে হয়। পানির সামান্য নড়াচড়াও তার চোখ এড়ায় না। একসময় তিনি একটি সামুদ্রিক কাছিমও দেখতে পান।
ড্রোন ওড়ানোর সময় চারপাশের পৃথিবী যেন তার কাছে হারিয়ে যায়। নিজের ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তাগুলোও তখন কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকেন তিনি।

নিজের অর্থেই চালিয়ে যাচ্ছেন লড়াই
ডুগং রক্ষার এই কাজ করতে গিয়ে পপকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার ক্যাফে এখনো আছে, তবে সেটি পরিচালনার দায়িত্ব স্ত্রী ও ভাইবোনদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।
আগের মতো বিলাসবহুল পারিবারিক ভ্রমণও এখন আর করেন না। নিজের অর্থেই পরিবেশ রক্ষার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
কখনো একা বসে তার মনে প্রশ্ন জাগে—এত পরিশ্রমে সত্যিই কি কোনো পরিবর্তন আসছে? তখন নিজেকেই তিনি আশাবাদী থাকার কথা মনে করিয়ে দেন।
জুলাইয়ে সেই আশার বড় একটি কারণও ফিরে আসে। তাং খেন উপসাগরে প্রথম দিকে দেখা ডুগংগুলোর একটি ‘মিরাকল’ কয়েক মাস নিখোঁজ থাকার পর আবার ফিরে আসে।
মিরাকল ছিল একটি আঞ্চলিক পুরুষ ডুগং। জিন জকের সঙ্গে তার অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দুজনকে একসঙ্গে খেলতে ও সাঁতার কাটতে দেখা যেত। এর কিছুদিন আগে একটি শিশু ডুগংয়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন পপ। মিরাকলকে আবার ফিরে আসতে দেখে তার মনে নতুন আশার জন্ম হয়।
বন্ধুটিকে দেখে মনে মনে পপ বলেন, ‘হ্যালো বন্ধু, আবার তোমাকে দেখে ভালো লাগছে। আমি তোমাকে আরও জানতে ও বুঝতে চাই।’
তারপরও তার অপেক্ষা শেষ হয়নি। অন্য ডুগংগুলোর জন্যও তিনি একইভাবে নজর রাখছেন।
‘আমি ওদের আবার দেখতে চাই। আবার ওদের অনুসরণ করব।’
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















