০৪:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
৯০ কোটি ডলারের রোবট বাজি: ডিপসিক থেকে টেনসেন্ট—চীনের সব বড় শক্তি কেন ইউনিট্রির পাশে? জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হস্তক্ষেপেও থামছে না ইয়েনের পতন, আস্থার সংকটেই কি আসল সমস্যা? থাইল্যান্ড সীমান্ত বন্ধ, জাপানি কোম্পানির ভরসা এখন কম্বোডিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রধানমন্ত্রী: একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় চীনে গ্রীষ্মের ছুটিতে কোচিংয়ের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষক ‘এক দফা’ কোনো নেতার ঘোষণা নয়, এটি জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: নুরুল হক নুর ১/১১-তে তারেক রহমানকে ‘আয়নাঘরে’ আটকে নির্যাতন: চিফ প্রসিকিউটর কুমিল্লায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২০ কিলোমিটারের বেশি যানজট, দুর্ভোগে যাত্রী-চালক ভারতের পরমাণু সাবমেরিনে নতুন বিপদ: পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে? টাইফুন ডলফিনের তাণ্ডব: জাপানের ওকিনাওয়ায় ৫ আহত, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ১৪ হাজার ভবনে

রেস্তোরাঁর রেটিংয়ে কেন পুরোপুরি ভরসা করা ঠিক নয়

এশিয়ার খাবারের জগৎ নিয়ে দীর্ঘদিন লেখালেখি করা খাদ্যবিষয়ক লেখক জন ক্রিচের মতে, এশিয়ায় কোথায় খাবেন—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিশ্বের নামী রেস্তোরাঁ র‌্যাঙ্কিংকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা ঠিক নয়। বিশেষ করে ‘সেরা’ বা ‘শ্রেষ্ঠ’ রেস্তোরাঁর তালিকা যতই মর্যাদাপূর্ণ হোক, সেগুলোকে কিছুটা সংশয় নিয়েই দেখা উচিত।

কারণ এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতির সবচেয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা অনেক সময় বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় নয়, বরং রাস্তার পাশের ছোট দোকান, স্থানীয় খাবারের আড্ডা কিংবা এমন সব রান্নাঘরে পাওয়া যায়, যেগুলোর নাম আন্তর্জাতিক খাদ্যতালিকায় কখনোই ওঠে না।

মিশেলিনের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন

এশিয়ায় মিশেলিন গাইডের বিস্তার বহু রেস্তোরাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে এর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অজ্ঞাতপরিচয় পরিদর্শকেরা রেস্তোরাঁ মূল্যায়ন করেন, কিন্তু তাঁদের সাংস্কৃতিক পটভূমি, রুচি কিংবা স্থানীয় খাবার সম্পর্কে তাঁদের সংবেদনশীলতার বিষয়টি পাঠকদের কাছে স্পষ্ট থাকে না।

ক্রিচের অভিযোগ, এই ধরনের মূল্যায়ন অনেক সময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত বা আধুনিক ধাঁচের খাবারকে ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় রান্নার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

থাইল্যান্ডের সর্বোচ্চ তারকাপ্রাপ্ত ১০টি রেস্তোরাঁর মধ্যে মাত্র তিনটি থাই খাবারের জন্য পরিচিত। বিপরীতে তিনটি ফরাসি এবং একটি জার্মান রেস্তোরাঁ রয়েছে। তাই থাইল্যান্ডের নিজস্ব খাদ্যঐতিহ্যের সঙ্গে এমন তালিকার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

Why I take restaurant ratings with a pinch of salt - Nikkei Asia

তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। সেখানে নানা ধরনের চীনা খাবারের ঐতিহ্য থাকলেও সর্বোচ্চ তারকাপ্রাপ্ত ১০টি রেস্তোরাঁর মাত্র একটি চীনা খাবারের। এক তারকাপ্রাপ্ত ৪৩টি রেস্তোরাঁর মধ্যে ‘তাইওয়ানিজ’ হিসেবে চিহ্নিত মাত্র ১০টি।

সিঙ্গাপুরের সর্বোচ্চ ১০টি রেস্তোরাঁর তালিকাতেও কোনো চীনা রেস্তোরাঁ নেই।

রাস্তার খাবারেও কি পক্ষপাত?

ছোট খাবারের দোকান কিংবা রাস্তার খাবারের গাড়িকে আন্তর্জাতিক পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কিন্তু হাজার হাজার স্থানীয় খাবারের দোকানের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটিকে বেছে নেওয়ার কারণ অনেক সময় স্পষ্ট নয়।

সিঙ্গাপুরের হিল স্ট্রিট তাই হুয়া পোর্ক নুডল বা হংকংয়ের হো হাং কি কেন একই ধরনের অসংখ্য স্থানীয় খাবারের দোকানের চেয়ে আলাদা—এ প্রশ্নও উঠতে পারে।

সমস্যার মূল জায়গাটি হলো, পশ্চিমা ও এশীয় সংস্কৃতিতে ‘ভালো রান্না’ বলতে একই বিষয় বোঝানো হয় না।

চীনা খাবার নিয়ে একটি বই লেখার সময় ক্রিচ নিজের চীনা বংশোদ্ভূত তৎকালীন স্ত্রীর সঙ্গে রেস্তোরাঁ মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, স্ত্রীর কাছে খাবারের ঐতিহ্য, স্বাদ, গঠন ও উপাদানের নিজস্ব চরিত্র ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে পশ্চিমা রুচিতে পরীক্ষামূলক রান্না কিংবা নতুন উপস্থাপনাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পর্যটন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব

মিশেলিনের মূল্যায়ন নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হয় বিভিন্ন দেশের পর্যটন সংস্থার সঙ্গে তাদের আর্থিক অংশীদারত্বকে ঘিরে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মিশেলিন গাইড নিয়ে আসতে দেশটির পর্যটন সংস্থা ২০১৫ সালে প্রায় ১৮ লাখ ডলার দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি করেছিল। থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে মিশেলিনের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য প্রায় ৪৪ লাখ ডলারের অংশীদারত্বে যায়।

Why I take restaurant ratings with a pinch of salt - Nikkei Asia

মিশেলিন অবশ্য বলে আসছে, এসব অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তাদের রেস্তোরাঁ নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলে না। কিন্তু ক্রিচের মতে, এমন সম্পর্ক থাকলে স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

‘বিশ্বের সেরা ৫০’ তালিকাও বিতর্কের বাইরে নয়

মিশেলিনের পাশাপাশি বিশ্বের প্রভাবশালী রেস্তোরাঁ তালিকাগুলোর মধ্যে ‘ওয়ার্ল্ডস ৫০ বেস্ট রেস্টুরেন্টস’ অন্যতম। একসময় এই উদ্যোগ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাঁধুনিদের মধ্যে যোগাযোগ, বন্ধুত্ব এবং নতুন রান্নার ধারণা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল।

কিন্তু ক্রিচের চোখে সময়ের সঙ্গে এটি অনেকটাই এমন এক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে পরিচিতি, যোগাযোগ ও পারস্পরিক প্রচারের গুরুত্ব রান্নার মানের কাছাকাছি চলে এসেছে।

এর প্রমাণ হিসেবে তিনি ২০২৫ সালের তালিকার উদাহরণ দিয়েছেন। টোকিওর ডেন রেস্তোরাঁ ২০২১ সালে ১১তম অবস্থানে থাকলেও ২০২৫ সালে মূল ৫০-এর বাইরে চলে যায় এবং ৫১ থেকে ১০০-এর তালিকায় ৫৩তম অবস্থানে থাকে।

নিউইয়র্কের ল্য বার্নার্দাঁ এবং স্পেনের মুগারিৎসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত রেস্তোরাঁও বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ ৫০-এর বাইরে চলে গেছে। তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে এসব রেস্তোরাঁর খাবারের মান কি সত্যিই এতটা খারাপ হয়ে গেল? নাকি তালিকায় প্রচারের গুরুত্বও বড় ভূমিকা রাখে—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

এশিয়ার রান্নার মূল্যায়নে পশ্চিমা চোখ

ক্রিচের সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংগুলো অনেক সময় এশিয়ার রান্নাকে পশ্চিমা মানদণ্ডে বিচার করে।

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় তারকা রাঁধুনি তৈরির একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি রয়েছে। নতুনত্ব, ব্যক্তিত্ব, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বই এবং গণমাধ্যমের উপস্থিতির মাধ্যমে একজন রাঁধুনি দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন।

World's 50 Best Restaurants Draws Criticism After Choosing to Hold Ceremony  in Abu Dhabi - The New York Times

এশিয়ার বহু দেশে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে কোনো রাঁধুনিকে ‘গুরু’ বা ‘মাস্টার’ বলা হতে পারে এমনকি তিনি শত শত বছর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কোনো রান্না নিখুঁতভাবে তৈরি করতে পারলেও। নতুনত্বের চেয়ে ঐতিহ্যকে নিখুঁতভাবে ধরে রাখাকেই অনেক সময় দক্ষতার বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।

চীনের অনেক রাঁধুনি তাঁদের বহু পুরোনো রেসিপি প্রকাশ করতেও অনিচ্ছুক। কারণ প্রতিযোগীরা সেই রেসিপি নকল করে ফেলতে পারে।

তারকাহীন খাবারের স্বাদ

ক্রিচ নিজেও স্বীকার করেছেন, তাঁর মতামতের মধ্যে ব্যক্তিগত রুচির প্রভাব রয়েছে। তাঁর কাছে নিখুঁত এক বাটি হোকিয়েন শূকরের মস্তিষ্কের জাউ, জটিল স্বাদের থাই জাম্বুরার সালাদ কিংবা সিচুয়ান পদ্ধতির বেগুনের পদ অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ট্রাফল ও ইউজু দিয়ে তৈরি দামি সামুদ্রিক খাবারের চেয়েও এসব স্থানীয় খাবার তাঁর কাছে বেশি তৃপ্তিদায়ক।

এ ধরনের মতের সঙ্গে এশিয়ায় দীর্ঘদিন বসবাস করা আরও অনেক বিদেশিরও মিল রয়েছে। প্রয়াত অ্যান্থনি বোর্দেইনও এশিয়ার স্থানীয় খাবারের বৈচিত্র্য ও স্বতন্ত্রতার প্রতি একই ধরনের গভীর আকর্ষণ দেখিয়েছিলেন।

ক্রিচ মনে করেন, ইন্টারনেট বিশ্বকে অনেক বেশি উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরও খাদ্যসমালোচনায় পশ্চিমকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কমেনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে।

What Is the World's 50 Best Restaurants List? | Eater

দুই দশক আগেও তিনি বলেছিলেন, চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পশ্চিমাদের কাছে অজানা অন্তত ১০০টি রেস্তোরাঁ এবং জাপানের সাধারণ শহরতলিতে আরও ১০০টি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেগুলো উপাদান ও রান্নার কৌশলের দক্ষতায় আন্তর্জাতিক তালিকার যেকোনো রেস্তোরাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আজও তিনি সেই বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।

কারণ এশিয়ার খাবারের আসল শক্তি হয়তো কোনো তারকা, পদক কিংবা আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে নয়—বরং স্থানীয় মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধরে রাখা স্বাদ, ঐতিহ্য, কৌশল ও খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতিতে।

রেস্তোরাঁর রেটিং তাই খাবারের মান বোঝার একটি সূত্র হতে পারে, কিন্তু সেটিই যে চূড়ান্ত সত্য—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই।

এশিয়ার সেরা খাবার খুঁজতে হলে কখনো কখনো তারকাখচিত রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে অচেনা গলি, ছোট দোকান কিংবা ব্যস্ত রাস্তার খাবারের স্টলের দিকেই তাকাতে হয়।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

৯০ কোটি ডলারের রোবট বাজি: ডিপসিক থেকে টেনসেন্ট—চীনের সব বড় শক্তি কেন ইউনিট্রির পাশে?

রেস্তোরাঁর রেটিংয়ে কেন পুরোপুরি ভরসা করা ঠিক নয়

০৩:৪৩:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

এশিয়ার খাবারের জগৎ নিয়ে দীর্ঘদিন লেখালেখি করা খাদ্যবিষয়ক লেখক জন ক্রিচের মতে, এশিয়ায় কোথায় খাবেন—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিশ্বের নামী রেস্তোরাঁ র‌্যাঙ্কিংকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা ঠিক নয়। বিশেষ করে ‘সেরা’ বা ‘শ্রেষ্ঠ’ রেস্তোরাঁর তালিকা যতই মর্যাদাপূর্ণ হোক, সেগুলোকে কিছুটা সংশয় নিয়েই দেখা উচিত।

কারণ এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতির সবচেয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা অনেক সময় বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় নয়, বরং রাস্তার পাশের ছোট দোকান, স্থানীয় খাবারের আড্ডা কিংবা এমন সব রান্নাঘরে পাওয়া যায়, যেগুলোর নাম আন্তর্জাতিক খাদ্যতালিকায় কখনোই ওঠে না।

মিশেলিনের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন

এশিয়ায় মিশেলিন গাইডের বিস্তার বহু রেস্তোরাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে এর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অজ্ঞাতপরিচয় পরিদর্শকেরা রেস্তোরাঁ মূল্যায়ন করেন, কিন্তু তাঁদের সাংস্কৃতিক পটভূমি, রুচি কিংবা স্থানীয় খাবার সম্পর্কে তাঁদের সংবেদনশীলতার বিষয়টি পাঠকদের কাছে স্পষ্ট থাকে না।

ক্রিচের অভিযোগ, এই ধরনের মূল্যায়ন অনেক সময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবিত বা আধুনিক ধাঁচের খাবারকে ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় রান্নার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

থাইল্যান্ডের সর্বোচ্চ তারকাপ্রাপ্ত ১০টি রেস্তোরাঁর মধ্যে মাত্র তিনটি থাই খাবারের জন্য পরিচিত। বিপরীতে তিনটি ফরাসি এবং একটি জার্মান রেস্তোরাঁ রয়েছে। তাই থাইল্যান্ডের নিজস্ব খাদ্যঐতিহ্যের সঙ্গে এমন তালিকার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

Why I take restaurant ratings with a pinch of salt - Nikkei Asia

তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। সেখানে নানা ধরনের চীনা খাবারের ঐতিহ্য থাকলেও সর্বোচ্চ তারকাপ্রাপ্ত ১০টি রেস্তোরাঁর মাত্র একটি চীনা খাবারের। এক তারকাপ্রাপ্ত ৪৩টি রেস্তোরাঁর মধ্যে ‘তাইওয়ানিজ’ হিসেবে চিহ্নিত মাত্র ১০টি।

সিঙ্গাপুরের সর্বোচ্চ ১০টি রেস্তোরাঁর তালিকাতেও কোনো চীনা রেস্তোরাঁ নেই।

রাস্তার খাবারেও কি পক্ষপাত?

ছোট খাবারের দোকান কিংবা রাস্তার খাবারের গাড়িকে আন্তর্জাতিক পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কিন্তু হাজার হাজার স্থানীয় খাবারের দোকানের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটিকে বেছে নেওয়ার কারণ অনেক সময় স্পষ্ট নয়।

সিঙ্গাপুরের হিল স্ট্রিট তাই হুয়া পোর্ক নুডল বা হংকংয়ের হো হাং কি কেন একই ধরনের অসংখ্য স্থানীয় খাবারের দোকানের চেয়ে আলাদা—এ প্রশ্নও উঠতে পারে।

সমস্যার মূল জায়গাটি হলো, পশ্চিমা ও এশীয় সংস্কৃতিতে ‘ভালো রান্না’ বলতে একই বিষয় বোঝানো হয় না।

চীনা খাবার নিয়ে একটি বই লেখার সময় ক্রিচ নিজের চীনা বংশোদ্ভূত তৎকালীন স্ত্রীর সঙ্গে রেস্তোরাঁ মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, স্ত্রীর কাছে খাবারের ঐতিহ্য, স্বাদ, গঠন ও উপাদানের নিজস্ব চরিত্র ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে পশ্চিমা রুচিতে পরীক্ষামূলক রান্না কিংবা নতুন উপস্থাপনাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পর্যটন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব

মিশেলিনের মূল্যায়ন নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হয় বিভিন্ন দেশের পর্যটন সংস্থার সঙ্গে তাদের আর্থিক অংশীদারত্বকে ঘিরে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মিশেলিন গাইড নিয়ে আসতে দেশটির পর্যটন সংস্থা ২০১৫ সালে প্রায় ১৮ লাখ ডলার দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি করেছিল। থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে মিশেলিনের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য প্রায় ৪৪ লাখ ডলারের অংশীদারত্বে যায়।

Why I take restaurant ratings with a pinch of salt - Nikkei Asia

মিশেলিন অবশ্য বলে আসছে, এসব অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তাদের রেস্তোরাঁ নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলে না। কিন্তু ক্রিচের মতে, এমন সম্পর্ক থাকলে স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

‘বিশ্বের সেরা ৫০’ তালিকাও বিতর্কের বাইরে নয়

মিশেলিনের পাশাপাশি বিশ্বের প্রভাবশালী রেস্তোরাঁ তালিকাগুলোর মধ্যে ‘ওয়ার্ল্ডস ৫০ বেস্ট রেস্টুরেন্টস’ অন্যতম। একসময় এই উদ্যোগ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাঁধুনিদের মধ্যে যোগাযোগ, বন্ধুত্ব এবং নতুন রান্নার ধারণা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল।

কিন্তু ক্রিচের চোখে সময়ের সঙ্গে এটি অনেকটাই এমন এক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে পরিচিতি, যোগাযোগ ও পারস্পরিক প্রচারের গুরুত্ব রান্নার মানের কাছাকাছি চলে এসেছে।

এর প্রমাণ হিসেবে তিনি ২০২৫ সালের তালিকার উদাহরণ দিয়েছেন। টোকিওর ডেন রেস্তোরাঁ ২০২১ সালে ১১তম অবস্থানে থাকলেও ২০২৫ সালে মূল ৫০-এর বাইরে চলে যায় এবং ৫১ থেকে ১০০-এর তালিকায় ৫৩তম অবস্থানে থাকে।

নিউইয়র্কের ল্য বার্নার্দাঁ এবং স্পেনের মুগারিৎসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত রেস্তোরাঁও বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ ৫০-এর বাইরে চলে গেছে। তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে এসব রেস্তোরাঁর খাবারের মান কি সত্যিই এতটা খারাপ হয়ে গেল? নাকি তালিকায় প্রচারের গুরুত্বও বড় ভূমিকা রাখে—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

এশিয়ার রান্নার মূল্যায়নে পশ্চিমা চোখ

ক্রিচের সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংগুলো অনেক সময় এশিয়ার রান্নাকে পশ্চিমা মানদণ্ডে বিচার করে।

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় তারকা রাঁধুনি তৈরির একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি রয়েছে। নতুনত্ব, ব্যক্তিত্ব, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বই এবং গণমাধ্যমের উপস্থিতির মাধ্যমে একজন রাঁধুনি দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন।

World's 50 Best Restaurants Draws Criticism After Choosing to Hold Ceremony  in Abu Dhabi - The New York Times

এশিয়ার বহু দেশে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে কোনো রাঁধুনিকে ‘গুরু’ বা ‘মাস্টার’ বলা হতে পারে এমনকি তিনি শত শত বছর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কোনো রান্না নিখুঁতভাবে তৈরি করতে পারলেও। নতুনত্বের চেয়ে ঐতিহ্যকে নিখুঁতভাবে ধরে রাখাকেই অনেক সময় দক্ষতার বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।

চীনের অনেক রাঁধুনি তাঁদের বহু পুরোনো রেসিপি প্রকাশ করতেও অনিচ্ছুক। কারণ প্রতিযোগীরা সেই রেসিপি নকল করে ফেলতে পারে।

তারকাহীন খাবারের স্বাদ

ক্রিচ নিজেও স্বীকার করেছেন, তাঁর মতামতের মধ্যে ব্যক্তিগত রুচির প্রভাব রয়েছে। তাঁর কাছে নিখুঁত এক বাটি হোকিয়েন শূকরের মস্তিষ্কের জাউ, জটিল স্বাদের থাই জাম্বুরার সালাদ কিংবা সিচুয়ান পদ্ধতির বেগুনের পদ অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ট্রাফল ও ইউজু দিয়ে তৈরি দামি সামুদ্রিক খাবারের চেয়েও এসব স্থানীয় খাবার তাঁর কাছে বেশি তৃপ্তিদায়ক।

এ ধরনের মতের সঙ্গে এশিয়ায় দীর্ঘদিন বসবাস করা আরও অনেক বিদেশিরও মিল রয়েছে। প্রয়াত অ্যান্থনি বোর্দেইনও এশিয়ার স্থানীয় খাবারের বৈচিত্র্য ও স্বতন্ত্রতার প্রতি একই ধরনের গভীর আকর্ষণ দেখিয়েছিলেন।

ক্রিচ মনে করেন, ইন্টারনেট বিশ্বকে অনেক বেশি উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরও খাদ্যসমালোচনায় পশ্চিমকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কমেনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে।

What Is the World's 50 Best Restaurants List? | Eater

দুই দশক আগেও তিনি বলেছিলেন, চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পশ্চিমাদের কাছে অজানা অন্তত ১০০টি রেস্তোরাঁ এবং জাপানের সাধারণ শহরতলিতে আরও ১০০টি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেগুলো উপাদান ও রান্নার কৌশলের দক্ষতায় আন্তর্জাতিক তালিকার যেকোনো রেস্তোরাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আজও তিনি সেই বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।

কারণ এশিয়ার খাবারের আসল শক্তি হয়তো কোনো তারকা, পদক কিংবা আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে নয়—বরং স্থানীয় মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধরে রাখা স্বাদ, ঐতিহ্য, কৌশল ও খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতিতে।

রেস্তোরাঁর রেটিং তাই খাবারের মান বোঝার একটি সূত্র হতে পারে, কিন্তু সেটিই যে চূড়ান্ত সত্য—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই।

এশিয়ার সেরা খাবার খুঁজতে হলে কখনো কখনো তারকাখচিত রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে অচেনা গলি, ছোট দোকান কিংবা ব্যস্ত রাস্তার খাবারের স্টলের দিকেই তাকাতে হয়।