গ্রীষ্মের ছুটিতে চীনের শিশুদের পড়াশোনায় ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত শিক্ষাযন্ত্র। বাড়িতে বসেই এসব যন্ত্র দিয়ে শিশুরা অঙ্ক করতে পারছে, খাতার লেখা স্ক্যান করে উত্তর যাচাই করতে পারছে এবং ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যাও পাচ্ছে। কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষাকেন্দ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণের পর সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে অনেক অভিভাবক এখন এসব প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন।
চীনের শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাল এডুকেশন গ্রুপের শুয়েশি ব্র্যান্ডের একটি শিক্ষাযন্ত্রে অঙ্কের সহজ প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। যেমন চারটি বান্ডিলে ছয়টি করে পেন্সিল থাকলে মোট কতটি পেন্সিল হবে—এটি যোগ ও গুণের মাধ্যমে কীভাবে হিসাব করা যায়, সে ধরনের প্রশ্ন দেওয়া হয়। শিশুরা লেখনী দিয়ে পর্দায় উত্তর লিখলে যন্ত্রটি সঙ্গে সঙ্গে তা যাচাই করে। সঠিক উত্তরে চিহ্ন দেওয়া হয় এবং কিছুটা অস্পষ্ট বা অগোছালো হাতের লেখাও এটি বেশ ভালোভাবে পড়তে পারে।
এক বিক্রয়কর্মীর ভাষ্য, এর ফলে গ্রীষ্মের ছুটিতেও শিশুরা অনেকটা নিজেরাই পড়াশোনা করতে পারে। অভিভাবকদের সারাক্ষণ পাশে বসে পড়া দেখার প্রয়োজন কমে যায়।
শুধু সাধারণ পড়াশোনা নয়, এসব যন্ত্রের অন্যতম আকর্ষণ হলো বাড়ির কাজের উত্তর পরীক্ষা করার সক্ষমতা। বড় প্রযুক্তি নির্মাতা আইফ্লাইটেকের একটি যন্ত্র ক্যামেরার সাহায্যে পুরো উত্তরপত্র স্ক্যান করে। এরপর লেখাগুলো পড়ে প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সমাধান তৈরি করতে পারে। এমনকি কোনো সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ভিডিওও তৈরি করে।
দাম বেশি হলেও আগ্রহ কমছে না
চীনে এআই-চালিত শিক্ষাযন্ত্রের বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্যও অভিভাবকদের আকৃষ্ট করছে। শুয়েশির সর্বশেষ পণ্যের উচ্চমানের সংস্করণটির দাম ১১ হাজার ৯৯৯ ইউয়ান, যা প্রায় ১ হাজার ৭৮০ মার্কিন ডলারের সমান। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে মন্থর থাকা একটি দেশে এই দাম অনেক পরিবারের জন্য বিলাসবহুল ব্যয় হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
তবু অনেক অভিভাবক মনে করছেন, দীর্ঘদিন ব্যবহার করা গেলে এই খরচ সার্থক। চীনের দালিয়ানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে বসবাসকারী ৪৯ বছর বয়সী এক বাবা বলেন, শুরুতে তাঁর কাছেও যন্ত্রটির দাম অনেক বেশি মনে হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ব্যবহার করা যাবে বিবেচনা করলে সেটি আর ততটা ব্যয়বহুল মনে হয় না।
পরিবারটি প্রায় প্রতিদিনই যন্ত্রটি ব্যবহার করে। ওই বাবা মনে করেন, একজন অভিভাবক হিসেবে মেয়ের পড়াশোনার ওপর তিনি যতটা নজর রাখতে পারেন, যন্ত্রটি তার চেয়েও বেশি কার্যকরভাবে তা অনুসরণ করতে পারে।
বিনোদনের বদলে শুধু পড়াশোনার জন্য
অভিভাবকদের কাছে এসব শিক্ষাযন্ত্রের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এগুলো মূলত পড়াশোনার জন্য তৈরি। সাধারণ মুঠোফোন বা ট্যাবলেটে শিশুরা পড়াশোনার বদলে ভিডিও দেখা কিংবা অন্যান্য বিনোদনে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু বিশেষভাবে শিক্ষার জন্য তৈরি যন্ত্রে সেই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
চীনের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন অনেকটাই দৈনন্দিন হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে দ্রুত গ্রহণ করার প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই শিক্ষাক্ষেত্রেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
কোচিং বন্ধের পর নতুন পথ
চীনা সরকার ২০২১ সালে কোচিংকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার লাগাম টানতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের শিক্ষাব্যয় কমানো এবং অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু কোচিংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এলেও চীনা সমাজে সন্তানের শিক্ষাকে ঘিরে উচ্চ প্রত্যাশা কমেনি।
ফলে অনেক অভিভাবক কোচিংয়ের বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তিকে বেছে নিচ্ছেন। শিক্ষক বা কোচিংকেন্দ্রের জায়গা পুরোপুরি এআই দখল করেনি, তবে বাড়িতে অতিরিক্ত অনুশীলন, উত্তর যাচাই ও বিষয় বুঝতে সহায়তার ক্ষেত্রে এসব যন্ত্র নতুন একটি পথ তৈরি করেছে।
চীনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রুনতো টেকনোলজির হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে এআই-সুবিধাসম্পন্ন ট্যাবলেটভিত্তিক শিক্ষাযন্ত্র বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫৮ লাখ ২০ হাজার। দুই বছর আগের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ বেশি। প্রতিষ্ঠানটি ধারণা করছে, ২০২৮ সালের মধ্যে এই বাজারে বিক্রি বেড়ে ৭৮ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ কোচিংয়ের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ, সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ এবং দ্রুত বিকশিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এই তিনের সমন্বয়ে চীনের শিক্ষাবাজারে তৈরি হচ্ছে নতুন এক বাস্তবতা। গ্রীষ্মের ছুটিতে বই-খাতার পাশে এখন তাই অনেক শিশুর সঙ্গী হয়ে উঠছে এআই শিক্ষকও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















