থাইল্যান্ডের সঙ্গে স্থল সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কম্বোডিয়ার একমাত্র আন্তর্জাতিক গভীর সমুদ্রবন্দর এখন জাপানি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বাণিজ্যপথে পরিণত হয়েছে। তবে বন্দরটির তুলনামূলক বেশি পণ্য ওঠানামার খরচ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জাপানি ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্দর ব্যবহারের খরচ কমানোসহ বিকল্প বাণিজ্যপথ আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।
কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল স্বায়ত্তশাসিত বন্দর দেশটির একমাত্র আন্তর্জাতিক গভীর সমুদ্রবন্দর। জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তায় গড়ে ওঠা এই বন্দরটি রাজধানী নমপেন থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। ২০২২ সালে চালু হওয়া একটি দ্রুতগতির সড়ক বন্দরটির সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও সহজ করেছে।
সীমান্ত বন্ধের পর বন্দরে পণ্য পরিবহন বেড়েছে
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সিহানুকভিল বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষের পর স্থলসীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য বিকল্প পথের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। এর বড় অংশই সামলাতে হচ্ছে সিহানুকভিল বন্দরকে।
বন্দরের রাষ্ট্রীয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে বন্দরের আয় হয়েছে প্রায় ১৭৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন রিয়েল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে নিট মুনাফা প্রায় ছয় গুণ বেড়ে ৬২ দশমিক ১ বিলিয়ন রিয়েলে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে মুনাফার হার ছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ।
এমন বিপুল মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রয়্যাল গ্রুপ নমপেন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী হিরোশি উয়েমাতসু। তাঁর প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অবকাঠামো পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের এত বিপুল মুনাফা করার প্রয়োজন কতটা।
বেশি খরচে চাপে জাপানি ব্যবসা
জাপানি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিহানুকভিল বন্দরে কনটেইনার ওঠানামার খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর বড় বড় বন্দরের তুলনায় বেশি। কম্বোডিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্যে এই বন্দরের প্রায় একচেটিয়া অবস্থান এবং দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে বন্দরের সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ—দুই বিষয়ই বাড়তি খরচের কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার সংরক্ষণের নিয়মেও পরিবর্তন আনে। চার দিনের বিনামূল্যের সময়সীমা পার হলে পুরো সময়ের জন্য সংরক্ষণ খরচ নেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত বিনামূল্যের চার দিনও হিসাবের আওতায় চলে আসে। নতুন নিয়মটি ব্যবসায়ী ও পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বন্দরে জট কমাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, বন্দরের নিজস্ব সমস্যার কারণে কখনো কখনো পণ্য ছাড়তে দেরি হলেও সেই বাড়তি সময়ের খরচ তাদের বহন করতে হচ্ছে।
এক বছরেও খুলছে না থাইল্যান্ড সীমান্ত
কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রায় এক বছর পরও স্থলসীমান্ত পুনরায় খোলার কোনো স্পষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। অথচ বহু জাপানি কোম্পানি কম্বোডিয়ায় বিনিয়োগ করেছিল থাইল্যান্ডের সঙ্গে নির্বিঘ্ন স্থলবাণিজ্যের ওপর আস্থা রেখে।
সীমান্ত বন্ধ হওয়ার পর এসব কোম্পানিকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। ফলে তাদের পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কম্বোডিয়ায় জাপানি ব্যবসায়ীদের সংগঠনের প্রতিনিধি কাজুকি মাতসুকাওয়া বলেন, স্থলসীমান্ত খুলতে যদি আরও সময় লাগে, তাহলে সিহানুকভিল বন্দর এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সীমান্তপথের মতো বিকল্প রুটগুলোর পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা উন্নত করা জরুরি।
‘অঘোষিত খরচ’ নিয়েও অভিযোগ
কম্বোডিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী সুন চানথল অবশ্য সিহানুকভিল বন্দরের কনটেইনার ওঠানামার সরকারি খরচকে বেশি বলে মনে করেন না। জুন মাসে তিনি বলেন, সমস্যার বড় অংশ রয়েছে বিভিন্ন ‘অঘোষিত’ খরচে। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
কম্বোডিয়াকে ঘুষ ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে বন্দর ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত খরচ নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
রপ্তানি কম, খালি কনটেইনার ফিরছে
বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাও পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সিহানুকভিল বন্দর দিয়ে রপ্তানির তুলনায় আমদানিকৃত পণ্য বেশি আসে। ফলে রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত প্রায় ৪০ শতাংশ কনটেইনার খালি অবস্থায় ফিরে যায়।
এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে কম্বোডিয়াকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলতে হবে। এতে বন্দরের সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং পরিবহন খরচও কমতে পারে।
ধীরগতির অর্থনীতিতে নতুন চাপ
বন্দর ব্যবস্থার উন্নতি এখন শুধু বাণিজ্য নয়, কম্বোডিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জুলাই মাসে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করেছে।
এরই মধ্যে কিছু বিদেশি কোম্পানি কম্বোডিয়া থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। জাপানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মিৎসুবিশি করপোরেশন এপ্রিলের শেষ দিকে দেশটিতে থাকা তাদের কর্মীদের প্রত্যাহার করেছে।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে একদিকে যেমন সিহানুকভিল বন্দরের ব্যবসা ও মুনাফা বেড়েছে, অন্যদিকে বাড়তি খরচ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি কম্বোডিয়াকে তার বিকল্প বাণিজ্যপথগুলোর ব্যয়, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা—তিন ক্ষেত্রেই উন্নতি করতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















