চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের কাছ থেকে আমদানি করা মোট ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক কমাতে সম্মত হয়েছে। কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে প্রসাধনী, গৃহস্থালি সামগ্রী, খেলনা ও শিশুদের গাড়ির আসন—বিভিন্ন ধরনের পণ্য এই নতুন শুল্ক-ছাড়ের আওতায় আসছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা কিছুটা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথ তৈরির ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ২৭ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বোর্ডের অধীনে দুই দেশই নিজ নিজ দেশের ৩০ বিলিয়ন ডলারের অ-সংবেদনশীল পণ্যকে তুলনামূলক সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থার জন্য সুপারিশ করেছে। এর ফলে চীনে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য বাজারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠকের অন্যতম ফলাফল ছিল পারস্পরিক শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে দুই দেশ তাদের চলমান বাণিজ্যবিরতি আরও কিছু সময় বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে।
কোন কোন পণ্যে কমছে শুল্ক
চীনের শুল্ক কমানোর তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কৃষিপণ্য। এর মধ্যে আছে ভুট্টা, গম, জোয়ার, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, উদ্ভিজ্জ তেল ও তেলবীজের খৈল। তবে এই তালিকায় সয়াবিনের নাম নেই।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা মাছ ও সামুদ্রিক খাবার, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য, প্রসাধনী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামেও শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিভিন্ন ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর তালিকা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কফি তৈরির যন্ত্র, টোস্টার, টেবিলওয়্যার, কম্বল ও বিছানার চাদর।
চীনের খেলনা, আতশবাজি, কৃত্রিম ফুল, বড়দিনের গাছের বাতি ও অন্যান্য উৎসবের সাজসজ্জার সামগ্রী এবং শিশুদের গাড়ির আসনও এই তালিকায় রয়েছে।
বাণিজ্যবিরতি ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যবিরতি আরও দুই মাস বাড়িয়ে আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। বেইজিংয়ের মতে, এই সময় দুই দেশ তাদের চলমান সমঝোতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে পারবে এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ সমাধানে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে পারবে।
চীনা মন্ত্রণালয় বলেছে, বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত পরিবেশ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দুই দেশ বিনিয়োগের সুযোগ ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চালাবে।
নীতির স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানো এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ মোকাবিলায়ও দুই পক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে।
তবে শীর্ষ বৈঠকের পর বাজারে আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন হয়েছে। নেতাদের বৈঠক থেকে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তারিত সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় এবং দুই দেশের মৌলিক বিরোধগুলো আবার সামনে আসায় বাজারে চাপ তৈরি হয়।
বিশেষ করে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তথ্যকেন্দ্রে চীনা উপাদান ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার জন্য দুই দলের আইনপ্রণেতাদের উদ্যোগ প্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। চীনের প্রধান নীলচিপ সূচকও ২ শতাংশের বেশি পড়ে এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
কৃষিপণ্য ও কয়লা নিয়ে নতুন সমীকরণ
চীনের শুল্ক কমানোর জন্য বেছে নেওয়া পণ্যগুলোর তালিকায় কৃষিপণ্যের বড় উপস্থিতি রয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা চীনের ১৭ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি পূরণে বেইজিং এগোতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত বছর করা একটি চুক্তির আওতায় চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিমাণে সয়াবিন কেনা আবার শুরু করেছে। ওই চুক্তিতে বছরে ২৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন সয়াবিন কেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দুই দেশ কৃষি খাত নিয়ে একটি পৃথক কর্মগোষ্ঠীও গঠন করবে। বাণিজ্য কাউন্সিলের অধীনে এই কর্মগোষ্ঠীর প্রথম বৈঠক বছরের শেষ হওয়ার আগেই হওয়ার কথা। সেখানে দুই দেশের বাজারে কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান নিয়ে আলোচনা হবে।
জ্বালানি খাতেও নতুন সমঝোতা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে চীন প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করবে। এই পরিমাণ চীনের বার্ষিক কয়লা আমদানির প্রায় ২ শতাংশের সমান।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়লা আমদানি দেশটির অভ্যন্তরীণ কয়লা বাজারের জন্য একটি সহায়ক উৎস হতে পারে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা শিল্পে আয় ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে ভূমিকা রাখবে।
তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল নতুন শুল্ক-ছাড়ের তালিকায় স্থান পায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আর্থিক খাতেও যোগাযোগ
বাণিজ্যের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন যোগাযোগের ব্যবস্থা হয়েছে। এআই-সংক্রান্ত কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি চ্যানেল চালু করার বিষয়ে তারা একমত হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সংলাপ নভেম্বরের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
আর্থিক খাতেও কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চীন বিদেশি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন পর্যালোচনা ও অনুমোদনের বিষয়টি এগিয়ে নেবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি থাকা প্রতিষ্ঠানও থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে চীনে ব্যবসা পরিচালনা ও শাখা খোলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা করা হবে।
এ ছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরও বেশি সরাসরি বিমান চলাচল চালুর বিষয়েও দুই দেশ যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে।
সমঝোতা কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?
নতুন শুল্ক-ছাড় ও বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্য স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি আনতে পারে। কৃষিপণ্য, গৃহস্থালি পণ্য ও অন্যান্য অ-সংবেদনশীল পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হলে দুই দেশের ব্যবসা ও ভোক্তা উভয় পক্ষই কিছুটা সুবিধা পেতে পারে।
তবে প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলগত শিল্প নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। চীনা প্রযুক্তি উপাদান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিধিনিষেধের উদ্যোগও দেখাচ্ছে যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ফলে ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তকে দুই দেশের সম্পর্কের বড় পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রমাণের চেয়ে আপাতত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাময়িক সমঝোতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসে বাণিজ্য, কৃষি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনায় কতটা বাস্তব অগ্রগতি হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হয়।












