যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ডিজেল রপ্তানি বন্ধের প্রস্তাব জোরালো হচ্ছে। তবে দেশটির জ্বালানি খাতের বাস্তবতা বলছে, এমন পদক্ষেপ সংকট সমাধানের বদলে উল্টো পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির দামও বাড়িয়ে দিতে পারে।
২০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৬ ডলার ৫০ সেন্টের ওপরে উঠে রেকর্ড করেছে। ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল পরিবহন, কৃষি ও নির্মাণ খাতের জন্য এটি বড় চাপ তৈরি করেছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ রাজনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ওপর।
এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা ডিজেল রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করার দাবি তুলেছেন। তাঁদের মধ্যে মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মাইক রজার্স এবং আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান রয়েছেন। ২২ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করছেন। পরদিন পলিটিকো জানায়, প্রশাসন ৯০ দিনের জন্য ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে পরে হোয়াইট হাউস ওই খবর অস্বীকার করে।
একটি শোধনাগার থেকে শুধু ডিজেল তৈরি হয় না
রপ্তানি বন্ধের প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কাঠামোতে। দেশটির জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস রাইট ২৩ সেপ্টেম্বর দ্য ইকোনমিস্ট আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করা একটি ‘ভোঁতা হাতিয়ার’ হবে এবং এতে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
কারণ, একটি শোধনাগার শুধু ডিজেল উৎপাদন করে না। একই প্রক্রিয়ায় পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানিও তৈরি হয়। ফলে ডিজেল বিদেশে বিক্রি করতে না পারলে শোধনাগারগুলোতে অতিরিক্ত ডিজেল জমে যেতে পারে। সংরক্ষণের জায়গা কমে গেলে উৎপাদন কমাতে হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
আর শোধনাগারে উৎপাদন কমলে শুধু ডিজেলের সরবরাহই কমবে না। পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির উৎপাদনও কমতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বাড়ার পাশাপাশি উড়োজাহাজের জ্বালানির দামও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ডিজেলের চাহিদা কমানোও কঠিন
ডিজেলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনমনীয়। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের কিছু অংশ প্রয়োজনের বাইরে কমানো সম্ভব হলেও ডিজেলের ব্যবহার অনেক বেশি যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।
কৃষকের ট্রাক্টর, পণ্যবাহী ট্রাক, খনন ও নির্মাণকাজের যন্ত্রসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে দাম বেড়ে গেলেও এসব খাতে ডিজেলের ব্যবহার দ্রুত কমানো কঠিন।
আলাস্কা ও আইওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনের রাজ্যগুলোতেও ডিজেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। ফলে জ্বালানির বাড়তি দাম এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
সরবরাহ সংকটের পেছনে যুদ্ধ
ডিজেলের বর্তমান সংকটের বড় কারণ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার নয়; আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধাক্কা খেয়েছে।
ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগার ও ডিজেল পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি করেছে। একই সময়ে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধও ডিজেল সরবরাহকে প্রভাবিত করছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ডিজেল রপ্তানিকারক। ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগারে হামলা বাড়ানোয় দেশটির জ্বালানি সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ডিজেল সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। দ্রুত এই সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
একজন জ্বালানি ব্যবসায়ীর ভাষায়, বর্তমানে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ পণ্য অপরিশোধিত তেল নয়, বরং শোধনাগারের সক্ষমতা। অর্থাৎ পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল থাকলেও সেটিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানিতে রূপান্তর করার সক্ষমতা বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার বদলে স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের ভাবনা
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পুরোপুরি রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বদলে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজেল রপ্তানি কমানোর পথ বিবেচনা করছে। ক্রিস রাইটের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সহজ ও স্বেচ্ছামূলক সহযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারে আরও ডিজেল রাখার চেষ্টা করতে পারে।
তবে সরাসরি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের সংকট পুরোপুরি দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং শোধনাগারের উৎপাদন কমে গেলে পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারী হিসেবে নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তেও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে দ্রুত জনপ্রিয় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ থাকলেও জ্বালানি বাজারের জটিল উৎপাদন ও সরবরাহ কাঠামো বিবেচনায় ডিজেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু ডিজেলের বাজারে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।











