যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও দেশটির সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার নিয়ে CNN, MS NOW ও Politico-কে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পর আদালতের হস্তক্ষেপে সেই নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে আটকে গেছে। তবে এর মধ্যেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এই লড়াই কি কেবল কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়ে, নাকি এর প্রভাব আরও বিস্তৃত?
২১ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে নতুন একটি হেলিপ্যাড উদ্বোধনের সময় ট্রাম্প কথা বলছিলেন, কিন্তু দর্শকেরা তাঁর বক্তব্যের স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পাননি। এর পেছনে ছিল হোয়াইট হাউসের টেলিভিশন প্রেস পুলের সিদ্ধান্ত। CNN-কে নিষিদ্ধ করার পর অন্য বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোও ওই পুলের দায়িত্ব পালনে সাময়িকভাবে বিরত থাকে। ফলে প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য কর্মসূচির সরাসরি ভিডিও ও শব্দ সরবরাহের প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটে।
বিতর্কের সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। ট্রাম্প প্রশাসন CNN, MS NOW ও Politico-কে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ট্রাম্প পরে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের গত দুই বছরের ধারাবাহিক সংবাদ কাভারেজের কারণে তিনি বিরক্ত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, কিছু প্রতিবেদন জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি তৈরি করেছে বা ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে তাদের প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে সরকারি বৈষম্য হিসেবে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যায়।
২৪ সেপ্টেম্বর ফেডারেল বিচারক টিমোথি কেলি নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করে তিন সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রশাসন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাতিল করেছে এবং নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি হিসেবে যে মানদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। আদালত জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তির পক্ষেও প্রশাসনের উপস্থাপিত প্রমাণকে অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করে। পরে হোয়াইট হাউস জানায়, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করা হয়েছে।
এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হোয়াইট হাউসের টেলিভিশন প্রেস পুল। সাধারণত কয়েকটি বড় সংবাদমাধ্যম পালাক্রমে প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি ধারণ করে এবং সেই ভিডিও অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেয়। CNN নিষিদ্ধ হওয়ার পর ABC, CBS, NBC, CNN ও Fox News-কে নিয়ে গঠিত এই ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়। অন্য বড় নেটওয়ার্কগুলোও কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কর্মসূচির ভিডিও ধারণ বন্ধ রাখে। ফলে প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের সংবাদ কাভারেজের প্রচলিত কাঠামো সরাসরি প্রভাবিত হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। এর আগে পেন্টাগন সাংবাদিকদের জন্য নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। সেই নীতির ফলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক সাংবাদিক সরে যান এবং তাদের জায়গায় অন্য ধরনের সংবাদকর্মী ও অনলাইনভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতাদের উপস্থিতি বাড়ে। আদালতে সেই বিধিনিষেধও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ রয়েছে। মেক্সিকো উপসাগরকে ট্রাম্পের পছন্দের নাম ‘গালফ অব আমেরিকা’ হিসেবে ব্যবহার না করার পর এপির সাংবাদিকদের কিছু অনুষ্ঠান ও প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছিল। এ নিয়েও আদালতে আইনি বিরোধ চলছে।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো মামলা। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদ থেকেই তিনি বিভিন্ন সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছেন। বেশির ভাগ মামলার ফল তাঁর পক্ষে যায়নি, তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা সমঝোতার মাধ্যমে শেষ হয়। এবিসি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট লাইব্রেরির জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা করে এবং আইনি খরচ বাবদ আরও ১ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়। আর সিবিএসের মালিক প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সও ট্রাম্পের লাইব্রেরিতে ১৬ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার মাধ্যমে একটি মামলা নিষ্পত্তি করে।
এর পাশাপাশি সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রক চাপ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার এমন কিছু সম্প্রচার কার্যক্রম নিয়ে লাইসেন্স-সংক্রান্ত নজরদারির হুমকি দিয়েছেন, যেগুলো ট্রাম্পের অপছন্দ। এ অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সম্প্রচার লাইসেন্সের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্যারামাউন্টের ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির মালিকানায় থাকা সিএনএনের ভবিষ্যৎ সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল। শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিএনএন ও সিবিএসের জন্য একটি ‘সম্পাদকীয় স্বাধীনতা’ বোর্ড রাখার শর্তও যুক্ত হয়।
তবে ট্রাম্প-সংবাদমাধ্যম দ্বন্দ্বের প্রভাব শুধু আদালত বা হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিং কক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থাও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে খবর নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন জনগণের বড় অংশ নীতিগতভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সমর্থন করলেও তারা সব পরিস্থিতিতে সংবাদ প্রকাশের ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকার পক্ষে নয়। ২২–২৮ জুন ২০২৬-এ পরিচালিত জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, কোনো সংবাদ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলে সরকার সংবাদটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারা উচিত। আবার ৫১ শতাংশ বলেছেন, কোনো প্রতিবেদনে ভুল তথ্য থাকলেও একই ধরনের সরকারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তবে কোনো সংবাদ সরকারকে সমালোচনা করলে সেটি সরানোর ক্ষমতা সরকারের থাকা উচিত বলে মনে করেন মাত্র ১০ শতাংশ।
একই জরিপে মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, সংবাদমাধ্যম বর্তমানে খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বাধীন। ৪৮ শতাংশের মতে সংবাদমাধ্যম ‘কিছুটা স্বাধীন’, আর ২৩ শতাংশ মনে করেন তারা খুব বেশি বা একেবারেই স্বাধীন নয়। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের উদ্বেগও কম নয়।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সংঘাতকে শুধু একটি নিষেধাজ্ঞা বা একটি আদালতের মামলার ঘটনা হিসেবে দেখা কঠিন। একদিকে প্রশাসন বলছে, ভুল তথ্য, জাতীয় নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার প্রশ্নে কঠোরতা প্রয়োজন। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সরকারের সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে প্রবেশাধিকার বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা সীমিত করা হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আদালতের সাম্প্রতিক আদেশ অন্তত এই নির্দিষ্ট বিরোধে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সর্বশেষ সংবাদমাধ্যম-বিরোধী লড়াইয়ের তাৎক্ষণিক আইনি ফল তাঁর ঘোষিত নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যায়নি। কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটি রয়ে গেছে—প্রেসিডেন্ট ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সংঘাত যত বাড়বে, ততই কি মার্কিন জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছানোর প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে? সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের রায়েই নয়, সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা এবং সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা নিয়েও নির্ভর করবে।










