জাপানকে সাধারণত সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই সমৃদ্ধির আড়ালে দেশটির অনেক শিশু এখনো পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে বেড়ে উঠছে। বিশেষ করে একক মায়ের পরিবারগুলোতে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় জাপানের মিয়োশি শহরের একটি গ্রন্থাগারে গ্রীষ্মের ছুটিতে দুপুরের দিকে শিশুদের ভিড় দেখা যায়। তারা ভাউচার দিয়ে বেন্টো খাবার সংগ্রহ করে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গায় বসে খাবার খায়, আবার কেউ খাবারের বাক্স নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
শুধু একটি শহরের খাবার কর্মসূচি নয়, এর পেছনে রয়েছে জাপানের শিশুদের জীবনযাত্রার একটি বড় বাস্তবতা। গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটিতে স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুরা স্কুলের বিনা মূল্যের বা ভর্তুকির খাবার পায় না। একই সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। ফলে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য খাবার ও অতিরিক্ত গরম—দুটিই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি হিসাবে, ২০২৪ সালে জাপানের প্রায় ১১ শতাংশ শিশু আপেক্ষিক দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল। আপেক্ষিক দারিদ্র্য বলতে এমন পরিবারকে বোঝানো হয়, যাদের পরিবারের সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় সমন্বয় করা ব্যয়যোগ্য আয় জাতীয় মধ্যম আয়ের অর্ধেকেরও কম। ২০২৪ সালে এই মধ্যম আয় ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৭০ হাজার ইয়েন।
তবে পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে। ২০১২ সালে শিশুদের আপেক্ষিক দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা ১১ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু দীর্ঘদিনের মূল্যপতনের পর জাপানের অর্থনীতিতে যখন দাম বাড়তে শুরু করেছে, তখন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে। ২০২০ সালের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
একক মায়ের পরিবারে বেশি ঝুঁকি
জাপানে শিশু দারিদ্র্যের বড় একটি কারণ একক অভিভাবকের পরিবার, বিশেষ করে একক মায়ের পরিবার। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত ধনী দেশগুলোর মধ্যে জাপানে একক অভিভাবকের পরিবারের আপেক্ষিক দারিদ্র্যের হার অন্যতম বেশি—প্রায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ জাপানের প্রায় ৯০ শতাংশ একক মা কোনো না কোনোভাবে কর্মরত। অর্থাৎ কাজ থাকলেও অনেক পরিবার দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারছে না।
এর পেছনে দেশটির শ্রমবাজারের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানে নারী কর্মীদের বড় একটি অংশ অপেক্ষাকৃত কম বেতন ও কম নিরাপত্তার ‘অনিয়মিত’ চাকরিতে কাজ করেন। একই সঙ্গে দেশটির নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বড়।
বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানদের দায়িত্বও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মায়ের ওপর পড়ে। সরকারি এক জরিপ অনুযায়ী, জাপানে প্রায় ১০টির মধ্যে ৯টি বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সন্তানদের হেফাজত মায়ের কাছে থাকে। অথচ প্রায় ৭০ শতাংশ মা কোনো শিশুভরণপোষণ পান না।
এপ্রিল মাসে জাপান পারিবারিক আইন সংশোধন করে যৌথ হেফাজতের ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মাধ্যমে বাবা-মা দুজনেরই সন্তানদের জীবনে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারের আশা, সন্তানদের জীবনে বাবাদের সম্পৃক্ততা বাড়লে তারা ভরণপোষণের অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বেশি দায়িত্বশীল হবেন।
মূল্যস্ফীতিতে খাবার কমছে
সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সেভ দ্য চিলড্রেন জাপানের এক জরিপে দেখা গেছে, খাদ্য সহায়তার জন্য আবেদনকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতিকে তাদের সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এমন পরিবারগুলোর একজন মানুষের পেছনে প্রতিদিন খাবারের জন্য গড় ব্যয় ৫০০ ইয়েনের নিচে নেমে গেছে। টোকিওর আতোমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যান সাকিকোর মতে, এই ব্যয়ের মাত্রা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষের পর্যায়ের কাছাকাছি।
জাপানে দারিদ্র্য অনেক সময় দৃশ্যমান নয়। রাস্তায় গৃহহীন মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশটির দারিদ্র্য পরিস্থিতি অনেক সময় সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থাকে। কিন্তু আয় ও সুযোগের বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এরই মধ্যে ‘ওয়াগাচা’ নয়, বরং ‘ওয়য়াগাচা’ শব্দটি জাপানি সমাজে আলোচনায় এসেছে। শব্দটি ‘অভিভাবক’ এবং খেলনা বের করার ক্যাপসুল মেশিনের ধারণা মিলিয়ে তৈরি। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়—একটি শিশু তার বাবা-মাকে বেছে নিতে পারে না এবং তার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে জন্মপরিবারের ওপর নির্ভর করে।
সহায়তা আছে, কিন্তু পৌঁছায় না সবার কাছে
দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য জাপানে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের তুলনায় কম।
বিশেষ করে একক অভিভাবকদের জন্য সহায়তা পাওয়ার আয়ের সীমা অনেক কম হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। কোনো মা কিছুটা বেশি আয় করলেই তিনি সরকারি সহায়তার যোগ্যতা হারাতে পারেন। এতে কেউ কেউ বেশি সময় কাজ করলেও অতিরিক্ত আয়ের কারণে সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।
আরেকটি সমস্যা হলো সামাজিক সংকোচ। একটি হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণমূলক সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য পরিবারগুলোর মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বাস্তবে সেই সুবিধা ব্যবহার করে। অনেক পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় আবেদন করে না। কেউ আবেদন করলেও সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ বা জটিল প্রক্রিয়ার কারণে সহায়তা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
এ কারণে দরিদ্র পরিবারের জন্য আরও লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা থাকলেও তা অনেক সময় নিম্নআয়ের পরিবারের বদলে আর্থিক চাপে থাকা বৃহত্তর মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।
মিয়োশির খাবার কর্মসূচিতে ভিন্ন পদ্ধতি
মিয়োশি শহরের খাবার কর্মসূচি এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ তৈরি করেছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে শহরের ১১টি সরকারি স্থাপনায় প্রতিদিন শত শত শিশুকে খাবার দেওয়া হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেন্টো খাবার শুধু দরিদ্র শিশুদের জন্য নয়। সব শিশুই খাবার নিতে পারে। অধিকাংশ শিশু খাবারের মূল্য দেয়, আর নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুরা বিনা মূল্যে খাবার পায়।
অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও অনলাইনে আগে থেকেই সম্পন্ন করা হয়। ফলে কে দরিদ্র পরিবারের শিশু আর কে নয়, তা অন্যদের বোঝার সুযোগ থাকে না।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য শুধু খাবার দেওয়া নয়; সহায়তা নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক সংকোচও কমানো। পরিবারগুলো যাতে নিজেদের আলাদা বা চিহ্নিত মনে না করে, সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
মিয়োশির এই উদ্যোগ জাপানের শিশু দারিদ্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। দেশটিতে অভাব সব সময় প্রকাশ্য নয়। অনেক শিশুর পরিবার হয়তো রাস্তায় দৃশ্যমান দারিদ্র্যের মধ্যে নেই, কিন্তু খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ সামলাতে প্রতিদিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
জাপানে শিশু দারিদ্র্যের হার এক দশকের বেশি সময়ে কমেছে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, একক মায়ের কম আয়, ভরণপোষণের ঘাটতি এবং সরকারি সহায়তা ব্যবস্থায় পৌঁছানোর বাধা—সব মিলিয়ে সমস্যাটি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বরং মূল্যস্ফীতির সময়ে এই নীরব দারিদ্র্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।











