কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়া এখন বড় একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে। দেশটিতে ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটিং অবকাঠামোতে প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগের সম্ভাব্য আকারের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পেছনে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা প্রায় ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং চীনে প্রায় ২৯৫ বিলিয়ন ডলার।
অস্ট্রেলিয়ার এই উত্থানের পেছনে যেমন রয়েছে দেশটির প্রাকৃতিক সুবিধা, তেমনি রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রাজনৈতিক ও আইনি স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। একই সঙ্গে এশিয়ার দ্রুত বাড়তে থাকা এআই ব্যবহারের বাজারও অস্ট্রেলিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে অস্ট্রেলিয়া সরকারও সক্রিয় হয়েছে। চলতি মাসে দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো সফর করে বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠানের কাছে অস্ট্রেলিয়ায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে সাধারণ মানুষের বিরোধিতা বাড়ছে। একই সময়ে এআই কোম্পানিগুলোর আরও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে তারা নতুন বিনিয়োগের জায়গা খুঁজছে।
১৬ সেপ্টেম্বর খবর আসে, এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২ দশমিক ১৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার সুবিধা ব্যবহারের জন্য চুক্তি করেছে। ক্ষমতার দিক থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টারগুলোর কয়েকটির সঙ্গে তুলনীয়।
কেন অস্ট্রেলিয়ায় এত আগ্রহ?
অস্ট্রেলিয়ার কিছু সুবিধা খুবই সরাসরি। দেশটিতে প্রচুর রোদ, বিশাল খালি জায়গা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটির বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের কম খরচে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি।
এআই ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে ডেটা সেন্টারগুলো যদি নিজেদের প্রয়োজনের একটি বড় অংশ সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বিদ্যুতের খরচ ও সরবরাহ নিয়ে চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বিশাল আকারের ডেটা সেন্টারগুলো জনবসতি থেকে দূরে স্থাপন করা যায়, ফলে শব্দ ও অন্যান্য স্থানীয় প্রভাব নিয়েও তুলনামূলকভাবে কম সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে, যা প্রথম নজরে এতটা স্পষ্ট নয়।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এআই ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। ভারত অ্যানথ্রপিকের ব্যবহারের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও এআই গ্রহণের হার বেশি।
এশিয়ার এই বাজারে সেবা দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ায় যাওয়া সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলগুলোর একটি বড় অংশ দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। চীনকে ঘিরে সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের সময় এসব কেবল নাশকতা বা ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ার দিকে যাওয়া অনেক নতুন কেবল প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছায়। ফলে এশিয়ার জন্য কম্পিউটিং ক্ষমতা সরবরাহের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া একটি স্বাভাবিক অবস্থান হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বড় সুবিধা
অস্ট্রেলিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং দেশটির শক্তিশালী আইনি কাঠামো।
এআই কোম্পানিগুলোর কাছে তাদের তৈরি মডেলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রযুক্তি—যাকে সাধারণভাবে ‘মডেল ওয়েটস’ বলা হয়—অত্যন্ত মূল্যবান। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র বা অন্য কোনো পক্ষ এসব তথ্য চুরি করতে পারে, এমন ঝুঁকি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ‘ফাইভ আইজ’ গোয়েন্দা জোটের সদস্য। দেশটির সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংবেদনশীল মার্কিন তথ্য সুরক্ষার সঙ্গে কাজ করছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও অস্ট্রেলিয়া কার্যকর করে। এর ফলে উন্নত এআই চিপ, বিশেষ করে এনভিডিয়ার চাহিদাসম্পন্ন চিপ, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশে—বিশেষ করে চীনে—পাচার হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
তবে অস্ট্রেলিয়া বিনিয়োগের সঙ্গে কিছু শর্তও দিতে চায়
অস্ট্রেলিয়া শুধু বড় বিনিয়োগ চায় না; সরকার চায় এই বিনিয়োগের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক প্রভাবও নিয়ন্ত্রিত থাকুক।
এআইবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অ্যান্ড্রু চার্লটনের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ডেটা সেন্টারের জন্য সরকার কিছু মৌলিক মানদণ্ড চালু করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে—ডেটা সেন্টারকে গ্রিড থেকে যত বিদ্যুৎ নিতে হবে, তার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা, গ্রিডে সংযোগের খরচ নিজে বহন করা, বাড়িঘর ও স্কুল থেকে দূরে স্থাপন করা এবং পানির ব্যবহার যতটা সম্ভব কমানো।
সরকারের যুক্তি হলো, এসব নিয়ম শুরুতে কঠোর মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো কোম্পানিগুলোর স্বার্থেই কাজ করবে। কারণ বিদ্যুৎ, পানি ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া আরও চায়, ডেটা সেন্টার থেকে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সুবিধার পুরোটা যেন সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলোর কাছে চলে না যায়।
এখানে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে খনিজ শিল্পের সঙ্গে। লৌহ আকরিকের খনিতে দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। কিন্তু ডেটা সেন্টার নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সেখানে সরাসরি কর্মসংস্থানের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ফলে এগুলো থেকে বড় ধরনের কর-রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত হতে পারে।
এই কারণে অস্ট্রেলিয়া সরকার চায়, এআই কোম্পানিগুলো যেন দেশটির নিজস্ব ব্যবসা ও গবেষকদের জন্য তাদের কম্পিউটিং সক্ষমতার একটি অংশ বরাদ্দ করে। তবে এখন পর্যন্ত এটিকে বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়, বরং সরকারের প্রত্যাশা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সামনে বড় প্রশ্ন কপিরাইট নিয়ে
অস্ট্রেলিয়ায় পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাস্তবে নিশ্চিত করতে হলে দেশটিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে—এআই প্রশিক্ষণে কপিরাইট সুরক্ষিত তথ্য ব্যবহারের নিয়ম।
এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ বই, ওয়েবসাইট, লেখা ও অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তারা চান, দেশটির ব্যবসা ও সৃজনশীল খাত তাদের তথ্য এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হলে তার জন্য অর্থ পাবে।
কিন্তু এখানে একটি আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। কোনো এআই কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ায় তথ্য ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে রাজি হলে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারে তাদের আগের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির সঙ্গে তার পার্থক্য তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এআই কোম্পানিগুলো বই ও ইন্টারনেটের বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যে নানা আইনি ও নীতিগত বিতর্কের মধ্যে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে তাই সুযোগের পাশাপাশি একটি ভারসাম্যের প্রশ্নও রয়েছে। সরকার যদি খুব বেশি নিয়ম আরোপ করে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা কানাডা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্যের দিকে চলে যেতে পারে।
অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো—এআই অবকাঠামোর বৈশ্বিক বিনিয়োগ থেকে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি, পরিবেশ, কপিরাইট, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও নিশ্চিত করা। দেশটি যে প্রাকৃতিক ও কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে হলে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।











