যুক্তরাষ্ট্রে স্বয়ংক্রিয় গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী ক্যামেরা নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে দেশটির সবচেয়ে বড় এমন প্রযুক্তি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ফ্লক সেফটিকে ঘিরে গোপনীয়তা, পুলিশের ক্ষমতার সীমা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২৩ সেপ্টেম্বর মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর জশ হাওলি নজরদারি প্রযুক্তি নির্মাতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে কংগ্রেসের একটি উপকমিটিতে সাক্ষ্য দিতে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু আমন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউই হাজির হয়নি। এর মধ্যেই ফ্লক সেফটির প্রযুক্তি নিয়ে কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সমালোচনা তীব্র হয়েছে।
ফ্লক সেফটির ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করতে পারে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভিন্ন যানবাহনের গতিবিধি অনুসরণে পুলিশকে সহায়তা করে। পুলিশের দাবি, চুরি বা অপহরণের মতো অপরাধ তদন্তে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্লকের দাবি, গত বছর তাদের প্রযুক্তি ১০ হাজার নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে।
তবে একই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠেছে। ইউগভের এক জরিপ অনুযায়ী, নিজ এলাকায় স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী ব্যবস্থা ব্যবহারের বিরোধিতা করা আমেরিকানদের হার এক বছরেরও কম সময়ে ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশ হয়েছে। প্রযুক্তিটির ব্যবহার সীমিত করতে দুই প্রধান দলের আইনপ্রণেতারাই বিভিন্ন বিল বিবেচনা করছেন।
স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী ব্যবস্থা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়। স্থানীয় সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরে টোল আদায় ও ট্রাফিক আইন প্রয়োগে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিসর অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বামপন্থী অধিকারকর্মীদের প্রতিবাদ প্রযুক্তিটিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করায় তিনি ফ্লকের প্রযুক্তি পছন্দ করেন।
ফ্লক তুলনামূলক কম দামে ক্যামেরা সরবরাহ করায় দ্রুত বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাদের ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ক্যামেরা রয়েছে। প্রতিটি ক্যামেরা বিপুলসংখ্যক ছবি তৈরি করে। স্থানীয় সংস্থাগুলো চাইলে এসব তথ্য আশপাশের পুলিশ বিভাগ এবং ফ্লকের জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে ভাগ করতে পারে। ফলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি শহরের তথ্য ব্যবহার করে অন্য শহর বা অঙ্গরাজ্যের যানবাহন সম্পর্কেও অনুসন্ধান করতে পারেন।
শুধু নম্বরপ্লেট নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গাড়ির রংসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও শনাক্ত করতে পারে। এতে কোনো নির্দিষ্ট গাড়িকে খোঁজার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। প্রযুক্তির সমর্থকদের কাছে এটি অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি উপায়। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষাকারীদের আশঙ্কা, এর ফলে মানুষের চলাচলের ওপর নজরদারির ক্ষমতা অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ক্রিমিনাল ডিফেন্স ল’ইয়ার্সের মেলিসা ওয়েনের মতে, ফ্লকের নম্বরপ্লেট ক্যামেরার নেটওয়ার্ক মানুষের আগে ধারণা করা নজরদারির পরিসরের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। পুলিশ কর্মকর্তাদের নম্বরপ্লেটের তথ্য দেখতে সাধারণত আদালতের পরোয়ানা প্রয়োজন হয় না। একই সঙ্গে কোন অঙ্গরাজ্যে পুলিশ কীভাবে অনুসন্ধানের তথ্য নথিবদ্ধ করবে, কতদিন তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে এবং এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে তা পাঠানো যাবে কি না—এসব বিষয়ে আইন একেক জায়গায় একেক রকম।
নজরদারি ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঘটনাও সামনে এসেছে। কিছু পুলিশ কর্মকর্তা সাবেক সঙ্গী বা স্বামী-স্ত্রীর গতিবিধি অনুসরণ করতে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার সফটওয়্যারের ভুলের কারণে নির্দোষ চালকদেরও থামানোর ঘটনা ঘটেছে।
স্বচ্ছতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন অনুসন্ধানের নথি বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছে, কিছু কর্মকর্তা নম্বরপ্লেট অনুসন্ধানের কারণ হিসেবে অর্থহীন বা অনুপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন—যার মধ্যে “LOL” ও “sexy”-এর মতো শব্দও ছিল। পরে ফ্লক অনুসন্ধানের কারণ বাছাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস যুক্ত করেছে।
ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি সংগঠন বিভিন্ন শহরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। ফ্লক বলেছে, তারা জাতীয় তথ্যভান্ডারে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও অনুমোদনের শর্ত আরও কঠোর করেছে।
বিতর্ক এখন স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। মন্টানায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শেথ বোডনার সম্প্রতি একটি ফ্লক ক্যামেরাকে বন্দুক দিয়ে গুলি করার ভিডিও ধারণ করেছেন। ঘটনাটি প্রযুক্তিটিকে ঘিরে রাজনৈতিক ক্ষোভের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
তবে প্রতিবাদের পাশাপাশি বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। টেক্সাসের গভর্নর হিসেবে পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা গ্রেগ অ্যাবট রাজ্যের ফ্লক প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করেছেন। আর নজরদারিবিরোধী সংগঠন সিকিউর জাস্টিসের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই দুই মাসে ২৫০টির বেশি শহর, পৌর এলাকা ও স্কুল ফ্লকের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করেছে। গত বছরের একই দুই মাসে এমন চুক্তি বাতিলের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটি।
ফ্লককে ঘিরে এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগেরও মিল রয়েছে। যেমন দ্রুত বাড়তে থাকা তথ্যকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে বিদ্যুৎ, পরিবেশ ও স্থানীয় প্রভাব নিয়ে মানুষের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তেমনি স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থাও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
মূল বিতর্কটি তাই শুধু একটি কোম্পানির ক্যামেরা নিয়ে নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রযুক্তি কতটা ব্যবহার করা যাবে, মানুষের চলাচলের তথ্য কতদিন সংরক্ষণ করা হবে, কে সেই তথ্য দেখতে পারবেন এবং এক এলাকার তথ্য অন্য এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কীভাবে যাবে—এসব প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা, পুলিশ, অধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে।











