পাকিস্তানের মতো ধর্ম, সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ ও দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতিনীতিতে গভীরভাবে প্রভাবিত সমাজে একজন নারীর সন্তান না চাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো অনেকের কাছে অস্বাভাবিক, এমনকি অগ্রহণযোগ্য। বিয়ের পর সন্তান নেওয়াকে যেখানে জীবনের স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে কোনো নারী যদি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি সন্তান চাই না’, তখনই শুরু হয় নানা প্রশ্ন।
কেন তিনি সন্তান চান না? তার মধ্যে কি মাতৃত্বের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা নেই? তিনি কি অতিরিক্ত ক্যারিয়ারমুখী? তিনি কি পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? নাকি তার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে?
কিন্তু প্রশ্নটি কি অন্যভাবেও করা যায় না?
বিশ্বজুড়ে যখন সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরিবেশগত বিপর্যয়, সহিংসতা ও নৈতিক সংকট মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, তখন প্রশ্ন হতে পারে—একজন মানুষ কেন সন্তান নিতে চান, তার কারণটিও কি কখনো একইভাবে খতিয়ে দেখা হয়?
প্রতিদিনের ভয়াবহ খবর
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভয়াবহ কোনো খবর পড়া যেন এখন স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে। পাকিস্তানে শিশু নির্যাতন ও হত্যার নানা ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
হারিপুরের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে একটি পরিত্যক্ত কূপে ফেলে রাখার অভিযোগের ঘটনা যেমন মানুষকে নাড়া দিয়েছে, তেমনি একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সারগোধায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে একটি মুদি দোকানে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রতিদিন এমন খবর শুনতে শুনতে মানুষ হয়তো একসময় মানসিকভাবে অসাড় হয়ে যেতে পারে। কিন্তু নিজের সন্তানের কথা যখন সামনে আসে, তখন সেই ভয় সহজে দূর হয় না।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য বাবা-মায়েরা কি যথেষ্ট সতর্ক নন, নাকি অপরাধীরা ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে? একটি শিশু কি সত্যিই নিরাপদ? বাবা-মা কি নিশ্চিন্ত মনে সন্তানকে বাইরে পাঠাতে পারেন?
বাস্তবতা হলো, এই উদ্বেগ শুধু একটি দেশ বা একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়েই প্রশ্ন রয়েছে। এ বছরের শুরুতে আলোচনায় আসা এপস্টিন-সংক্রান্ত নথিপত্রও ক্ষমতা, যৌন নির্যাতন ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
তাহলে আজ যে শিশুটি পৃথিবীতে জন্ম নেবে, তার জন্য আগামী পৃথিবী কতটা নিরাপদ?
এই প্রশ্ন কোনো নারী বা দম্পতির সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে না। বরং এটি দেখায়, সন্তান নেওয়া কত বড় দায়িত্ব।
নিরাপত্তা কি শুধু পরিবারের হাতে?
ধরা যাক, একটি শিশু কোনো অপরাধের শিকার হলো না। তবুও কি সে সম্পূর্ণ নিরাপদ?
একটি দেশের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সংকট, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা দুর্ঘটনাও একটি শিশুর জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইসলামাবাদের পিআইএমএস হাসপাতালকে ঘিরে এমন একটি ঘটনায় একসঙ্গে ১৭ নবজাতকের মৃত্যুর খবর গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। ওই ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও তত্ত্ব থাকলেও তদন্ত ও আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে ঘটনাটি পরিবারগুলোর জন্য যে ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে এনেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড বা অন্যান্য দুর্ঘটনার ঘটনাও মাঝেমধ্যে সামনে আসে। তখন প্রশ্ন ওঠে—যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের জীবন রক্ষার জন্য তৈরি, সেখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
একজন বাবা-মা নিজের ঘর শিশুর জন্য নিরাপদ করতে পারেন। দরজা-জানালা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, সিঁড়ি কিংবা আশপাশের পরিবেশ নিয়ে সতর্ক থাকতে পারেন। কিন্তু একটি শিশুর পুরো জীবন তো শুধু ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তাহলে তার নিরাপত্তার কতটুকু সত্যিই বাবা-মায়ের হাতে?
সন্তান না চাইলেই কেন ব্যাখ্যা দিতে হবে?
একজন নারী সন্তান না চাইলে তাকে প্রায়ই স্বার্থপর, অপরিণত, অতিরিক্ত ক্যারিয়ারমুখী কিংবা পরিবারবিরোধী হিসেবে দেখা হয়। কেউ কেউ বলেন, এখন হয়তো তিনি সন্তান চান না, কিন্তু সময় গেলে তার ‘মাতৃত্ববোধ’ জেগে উঠবে।
অথচ একজন নারী অনেক সন্তান চাইলে তাকে খুব কমই প্রশ্ন করা হয়—তিনি কি প্রত্যেক সন্তানকে যথাযথ সময়, যত্ন, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুযোগ দিতে পারবেন?
সন্তান নেওয়া কোনো ছোট সিদ্ধান্ত নয়। এটি একজন নারীর শরীর, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা, পেশা, স্বাধীনতা, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বদলে দিতে পারে। তাই মাতৃত্ব গ্রহণ করবেন কি না, সেটি একজন নারীর জীবনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো নারী সন্তান চান না, এ কথা বলার জন্য কেন তাকে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দীর্ঘ যুক্তি দাঁড় করাতে হবে?
তিনি কি শুধু বলতে পারেন না—‘আমি সন্তান চাই না’?
কেন তাকে অপরাধ, সহিংসতা, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশগত বিপর্যয় কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পরিসংখ্যান সামনে আনতে হবে নিজের সিদ্ধান্তকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য?
অন্যদিকে, একজন মানুষ সন্তান নিতে চান—এটি বলার পর সাধারণত তাকে একই ধরনের জেরা করা হয় না।
বিয়ের পর সন্তান—সামাজিক বাধ্যবাধকতা?
অনেক সমাজে বিয়ের পর সন্তান নেওয়াকে এতটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয় যে, দম্পতির নিজেদের ইচ্ছার বিষয়টি প্রায়ই আড়ালে চলে যায়।
পরিবারের চাপ, বাবা-মা বা শ্বশুর-শাশুড়ির প্রত্যাশা, আত্মীয়দের কৌতূহল কিংবা ‘সুখবর’ শোনার জন্য ক্রমাগত চাপ—এসবও অনেক দম্পতির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেউ হয়তো মনে করেন, সন্তান এলে দাম্পত্য সম্পর্ক আরও শক্ত হবে। কেউ ভাবেন, বার্ধক্যে সন্তানই হবে ভরসা। আবার কেউ পরিবারে নিজের বংশের নাম ধরে রাখার কথা ভাবেন।
কিন্তু একটি শিশুর জন্ম কি এসব প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যম হওয়া উচিত?
যে দাম্পত্য সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে সন্তানের প্রয়োজন হচ্ছে, সেই সম্পর্কের সমস্যার সমাধান হয়তো অন্যভাবে খোঁজা দরকার। প্রয়োজন হলে পারিবারিক বা দাম্পত্য পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
একটি অনাগত শিশুকে জন্মের আগেই এমন দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে আনা উচিত নয় যে তাকে বাবা-মায়ের সম্পর্ক ঠিক করতে হবে, বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখাশোনা করতে হবে কিংবা পরিবারের নাম ধরে রাখতে হবে।
সন্তান কোনো অবসরকালীন পরিকল্পনা নয়, কোনো পারিবারিক ‘দায়িত্বের বাহক’ও নয়।
পৃথিবীটা কেমন থাকবে?
সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরেকটি বড় প্রশ্ন জড়িয়ে আছে—যে পৃথিবীতে তাকে বড় করা হবে, সেটি কেমন হবে?
জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, দাবানল, পানি সংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয় এখন আর দূরের ভবিষ্যতের বিষয় নয়।

হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার আকস্মিক বন্যা মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও পুরো সম্প্রদায়কে বিপর্যস্ত করেছে। যুক্তরাজ্যেও সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ ও খরার পরিস্থিতি মানুষকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলও দ্রুত বিস্তৃত হয়ে বিপুল বনভূমি ধ্বংস করছে।
এগুলো শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। এগুলোর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, খাদ্য, পানি, বাসস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
বিশ্বের নেতারা জলবায়ু সম্মেলনে নানা প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আজ যে শিশু জন্ম নেবে, সে কেমন পৃথিবী উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তার বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও যত্নের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সমাজ, রাষ্ট্র ও পুরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপরও।
সন্তান নেওয়া যেমন ভুল নয়, সন্তান না নেওয়াও ভুল নয়
সন্তান নেওয়া নিঃসন্দেহে অনেক মানুষের জীবনে গভীর আনন্দ, ভালোবাসা ও অর্থপূর্ণতার উৎস হতে পারে। একজন নারী বা দম্পতি আন্তরিকভাবে বাবা-মা হতে চাইলে সেটি তাদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং সেটিকে সম্মান করা উচিত।
একইভাবে, কেউ যদি সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেই সিদ্ধান্তকেও সমানভাবে ব্যক্তিগত বলে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মাতৃত্ব আর সন্তানহীন জীবনকে ‘সঠিক’ ও ‘ভুল’-এর দুই বিপরীত প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই। দুটিই জীবনের ভিন্ন পথ।
একজন নারী মা হতে চাইবেন কি না, সেটি তার শরীর, জীবন, ভবিষ্যৎ এবং নিজের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সিদ্ধান্ত। তাই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার থাকা উচিত।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুব সহজ—কেউ সন্তান নিতে চাইলে তাকে কেন এত ব্যাখ্যা দিতে হয় না, কিন্তু সন্তান না চাইলে কেন তাকে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দীর্ঘ প্রতিরক্ষা তৈরি করতে হয়?
হয়তো সময় এসেছে এই দ্বৈত মানসিকতা বদলানোর।
সন্তান নেওয়া একটি পছন্দ। সন্তান না নেওয়াও একটি পছন্দ। কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে অপরাধের মতো বিবেচনা না করে, মানুষের নিজস্ব জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করাই হতে পারে একটি পরিণত সমাজের লক্ষণ।












