ইয়েনকে শক্তিশালী করতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত বাজার হস্তক্ষেপের পরও জাপানের মুদ্রার দুর্বলতা কাটেনি। বরং হস্তক্ষেপের কয়েক দিনের মধ্যেই ইয়েন আবার চাপের মুখে পড়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, মুদ্রাবাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ সাময়িকভাবে দিক পরিবর্তন করতে পারলেও জাপানের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের গভীর সন্দেহ দূর করতে পারছে না।
প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েন যখন প্রায় ১৬৪-এর কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইয়েন কেনার মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করে। ইয়েনের এই দুর্বলতা প্রায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার কাছাকাছি ছিল। হস্তক্ষেপের পর ইয়েন কিছুটা শক্তিশালী হয় এবং কিছু সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারসূচকের ওপরেও উঠে যায়। কিন্তু সেই শক্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের বাজারে আবার প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েন প্রায় ১৫৮-এর ঘরে নেমে যায়। অর্থাৎ বাজার খুব দ্রুতই সরকারি হস্তক্ষেপের প্রভাবকে শোষণ করে নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের দুই বড় অর্থনীতির সমন্বিত উদ্যোগও যদি ইয়েনের গতিপথ বদলাতে না পারে, তাহলে সমস্যাটি আসলে কোথায়?
শুধু ইয়েন কিনলেই কি মুদ্রার শক্তি ফেরানো যায়?
মুদ্রাবাজারে কোনো দেশের মুদ্রার দর কেবল সরকারি হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর করে না। সুদহার, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ নীতির ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা—সবকিছু মিলে একটি মুদ্রার প্রকৃত শক্তি তৈরি হয়।
জাপানের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে।

বাজার মনে করছে, ইয়েনের দুর্বলতার পেছনে এমন কিছু মৌলিক কারণ রয়েছে, যেগুলো শুধু ইয়েন কিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কত দ্রুত সুদহার বাড়াবে এবং সরকার কতটা আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখবে—এই দুই প্রশ্ন এখন ইয়েনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জিএমএক্সের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ নাওকি ইওয়ামি মনে করেন, শুধু বাজারে হস্তক্ষেপ করে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৮ সালের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়।
১৯৯৮ সালের ব্যর্থতা কি আবার ফিরে এসেছে?
১৯৯৮ সালে এশিয়ার মুদ্রা সংকট এবং জাপানের নিজস্ব আর্থিক সংকটের সময় ইয়েন দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল।
কিন্তু সেই উদ্যোগ ইয়েনের পতন থামাতে পারেনি। হস্তক্ষেপের আগে ডলারের বিপরীতে ইয়েন ছিল প্রায় ১৪৬। কয়েক মাস পর সেটি আরও দুর্বল হয়ে ১৪৭-এ পৌঁছায়।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় একই—বাজার যদি মনে করে কোনো দেশের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি মুদ্রার দুর্বলতার দিকে যাচ্ছে, তাহলে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রভাব সীমিত হয়ে যেতে পারে।
এবারও ঠিক সেই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে।
জাপানের ‘আস্থার শক্তি’ কেন কমছে

একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তি শুধু তার মোট উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা শিল্প সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। নীতিনির্ধারকদের ওপর আস্থাও একটি বড় সম্পদ।
অর্থনীতিতে এটিকে অনেক সময় একটি দেশের নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ‘নরম শক্তি’ হিসেবে দেখা হয়। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় কি না, মুদ্রানীতি কতটা স্বচ্ছ, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা ধারাবাহিক এবং অর্থনৈতিক নীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাজার কতটা নিশ্চিত—এসব বিষয় মুদ্রার প্রতি আস্থা তৈরি করে।
জাপানের ক্ষেত্রে সেই আস্থাই এখন প্রশ্নের মুখে।
কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এমেরিটাস মাসায়া সাকুরাগাওয়ার মতে, জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির গতির তুলনায় ধীর। একই সময়ে সরকার আর্থিক সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। ফলে অর্থনৈতিক নীতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, কিন্তু সুদহার কতটা বাড়ছে?
ইয়েনের দুর্বলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ জাপান ও অন্যান্য বড় অর্থনীতির সুদহারের পার্থক্য।
জাপানে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ধীরে এগোচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাদ দিলে প্রকৃত সুদহার এখনো ঋণাত্মক।
এতে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইয়েনভিত্তিক সম্পদের আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। অন্যদিকে বেশি সুদ পাওয়া যায় এমন মুদ্রা বা সম্পদের দিকে অর্থ প্রবাহিত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদ তাকেশি হিগাশিফুকাসাওয়ার হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপের আগ পর্যন্ত ইয়েনের প্রায় ৫০ ইয়েন অবমূল্যায়নের অর্ধেকের বেশি ব্যাখ্যা করা যায় জাপানের ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা দিয়ে।
অর্থাৎ ইয়েনের পতনকে শুধু জল্পনামূলক লেনদেন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। এর পেছনে জাপানের অর্থনীতির মৌলিক পরিবর্তনও রয়েছে।
জাপানের সরকারি ব্যয়ও বাজারকে ভাবাচ্ছে
ইয়েনের আরেকটি দুর্বল জায়গা হলো সরকারি আর্থিক নীতি।
জাপান সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকারি ব্যয় সম্প্রসারণের পথে রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে সরকার যদি ব্যয় বাড়ায়, অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট দ্রুত এগোতে না পারে, তাহলে দুই নীতির মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
জুনে জাপান সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কৌশলের খসড়া প্রকাশের পর বাজারে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেটি এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার দ্রুত বেড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মুদ্রাবাজারে একটি দেশের নীতির ওপর আস্থা কমতে শুরু করলে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ যথেষ্ট নাও হতে পারে।
১৫৫ ইয়েন এখন গুরুত্বপূর্ণ সীমা
হস্তক্ষেপের পর ইয়েন সাময়িকভাবে শক্তিশালী হলেও ১৫৫-এর আশপাশের দর আবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে এপ্রিল ও মে মাসে জাপান এককভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করেও ইয়েনকে ১৫৫-এর নিচে স্থায়ীভাবে নিয়ে যেতে পারেনি। এবারও একই ধরনের প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে।
বাজারের দৃষ্টিতে এর অর্থ হলো, বিনিয়োগকারীরা এখনো ইয়েনের দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী হওয়ার বিষয়ে পুরোপুরি বিশ্বাসী নন।
ইয়েন যদি আবার ১৬০-এর দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে জাপানি কর্তৃপক্ষ নতুন করে বাজারে হস্তক্ষেপ করবে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কতটা কার্যকর হবে?

এবারের উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জাপান একা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইয়েনের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন সংশোধনে জাপানের মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দরকার। তিনি জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কাজুও উএদার ওপরও আস্থা প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু বাজারে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে তা নয়, জাপান বাস্তবে কী করছে।
কারণ বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত সুদহার, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার বাস্তব পরিবর্তনকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
সেপ্টেম্বরের সুদহার বৈঠক হতে পারে বড় পরীক্ষা
ইয়েনের ভবিষ্যতের জন্য এখন সেপ্টেম্বরের বৈঠক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাজারের প্রশ্ন হলো, জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি সুদহার বাড়াবে? শুধু সুদহার বাড়ানোই নয়, ভবিষ্যতে আরও দ্রুত সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হবে কি না—সেটিও ইয়েনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নাওকি ইওয়ামির মতে, সেপ্টেম্বরেই সুদহার বাড়ানো সম্ভব এবং ভবিষ্যতে বৃদ্ধির গতি বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে ইয়েন আবারও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
অন্যদিকে ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনালের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক জর্জ এফথাথোপুলোসের মতে, ইয়েনের টেকসই শক্তিশালী হওয়ার জন্য জাপানের আর্থিক ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

ইয়েনের লড়াই আসলে আস্থার লড়াই
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।
জাপান যদি শুধু বাজারে ইয়েন কেনে, তাহলে ইয়েন সাময়িকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন, জাপানের সুদহার মূল্যস্ফীতির তুলনায় খুব ধীরে বাড়ছে, সরকারি ব্যয় বাড়ছে এবং ভবিষ্যৎ নীতি স্পষ্ট নয়, তাহলে তারা আবার ইয়েন বিক্রি করতে পারেন।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে এবং সরকার আর্থিক শৃঙ্খলার বিষয়ে বাজারকে বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দিতে পারে, তাহলে ইয়েনের জন্য পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
সুতরাং ইয়েনের বর্তমান সংকটকে শুধু একটি মুদ্রাবাজারের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক নীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, সরকারি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরীক্ষা।
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হস্তক্ষেপ বাজারে সাময়িক স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু ইয়েনকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে বাজারকে বোঝাতে হবে যে জাপানের অর্থনৈতিক নীতি এখন আরও ধারাবাহিক, বিশ্বাসযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ‘জাপান আবার ইয়েন কিনবে কি না’—এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, জাপান কি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে ইয়েন আবার শক্তিশালী হওয়ার পথে ফিরবে, নাকি প্রতি ডলারের বিপরীতে আরও দুর্বলতার দিকে এগিয়ে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















