০৬:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কার আগে কি আমেরিকার কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখানো সম্ভব? কুসংস্কারে আটকে অর্থনীতি, ‘অশুভ’ দিক এড়িয়ে চলেন চীনের মেয়ররা চীনের শিল্পবিস্তার কি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ, নাকি ‘অতিরিক্ত উৎপাদনের’ সংকট? ইয়েমেনে ফের সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধের শঙ্কা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় ফিলিপাইন, চীনের বিরুদ্ধে স্থায়ী বৈরিতা: নিজের স্বার্থ কোথায়? সিনেমা যতটা বাস্তব, ইতিহাসও কি ততটাই? চীনে গ্রীষ্মের ছুটিতে কোচিংয়ের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষক রোবট ভ্যাকুয়াম থেকে মহাকাশ—চীনের প্রযুক্তি নিয়ে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, এগিয়ে যাচ্ছে স্পেসএক্স ওকিনাওয়ায় ভয়ংকর টাইফুন ডলফিন, ২১৬ কিমি বেগে ঝড়—চীনে বন্ধ বন্দর-ফেরি, বাতিল ফ্লাইট নিরাপত্তারক্ষীর সংকট, সমাধানে রোবট কুকুর ও ড্রোনের দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানগুলো

হিটলারের ভি-২ রকেট চুরি: মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পোলিশ প্রতিরোধযোদ্ধাদের অবিশ্বাস্য অভিযান

১৯৪৪ সালের মে মাস। দক্ষিণ পোল্যান্ডের ব্লিজনা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে একটি ভি-২ রকেট আকাশে ছুটে উঠল। কমলা রঙের আগুনের ঝলক আর প্রচণ্ড গর্জনে কেঁপে উঠল আশপাশের এলাকা। আগের দুটি পরীক্ষায় রকেট আকাশেই বিস্ফোরিত হয়েছিল। এবার সেটি প্রায় ৪৫ সেকেন্ড পর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও এত দ্রুতগতিতে ছুটছিল যে বায়ুমণ্ডলের সীমানা পেরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। ভি-২ কর্মসূচির প্রধান ওয়াল্টার ডর্নবার্গারের কাছে ঘটনাটি ছিল একই সঙ্গে সাফল্য ও হতাশার। রকেট মহাকাশের প্রান্তে পৌঁছেছিল, কিন্তু পরীক্ষাগুলোর সাফল্যের হার তখনও মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ছিল। অথচ অ্যাডলফ হিটলার বিশ্বাস করতেন, ভি-২ দিয়েই যুদ্ধের ভাগ্য বদলে দেওয়া সম্ভব। তাঁর ধারণা ছিল, এই রকেট লন্ডন এমনকি একদিন নিউইয়র্ক পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারবে এবং বেসামরিক মানুষের মনোবল ভেঙে দেবে।

নদীর তীরে পড়ে থাকা অমূল্য রকেট

রকেটটি উৎক্ষেপণস্থল থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়ে। কৃষক জান লোপাচিউক ও তাঁর ছেলে তখন নিজেদের রক্ষা করতে দৌড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাঁরা বাগ নদীর তীরে গিয়ে দেখেন, বিস্ফোরণে ধ্বংস না হয়ে রকেটটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় কাদামাটির ওপর পড়ে আছে। নরম মাটি তার পতনের ধাক্কা সামলে দিয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারেননি, তাঁদের সামনে পড়ে থাকা এই রকেটই জার্মানির সবচেয়ে গোপন অস্ত্র কর্মসূচির বহু রহস্য ফাঁস করে দিতে পারে।

১৯৪৩ সালের আগস্টে পিনেমুন্দে অস্ত্র ও রকেট পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্রিটিশ বিমান হামলার পর ভি-২ পরীক্ষার কাজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ব্লিজনায়। সেখানে অস্বাভাবিক রেলপথের চালান, অসংখ্য জার্মান সামরিক ট্রাক এবং রাতদিন রকেট উৎক্ষেপণ স্থানীয় মানুষের নজরে আসে। ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর থেকেই গ্রামাঞ্চলের শান্ত পরিবেশ ভেঙে রকেটের গর্জন ও বিস্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এক কৃষক বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল যেন পৃথিবীর শেষ দিন এসে গেছে।

ধ্বংসস্তূপ থেকেও তথ্য সংগ্রহ

জার্মানরা জনবসতির দিকে রকেট ছুড়লেও রকেটের ভেতরে সবসময় বিস্ফোরক থাকত না। কিন্তু প্রায় ১৬ মিটার লম্বা ধাতব কাঠামো, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ঘণ্টায় প্রায় ৫,৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে আসা একটি রকেট নিজেই ভয়ংকর অস্ত্র ছিল।

ভি-২ মাটিতে আছড়ে পড়ার পর বেশির ভাগ সময়ই প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত। তবুও পোলিশ হোম আর্মির সদস্যরা ধ্বংসাবশেষ থেকে তথ্য সংগ্রহের উপায় বের করেছিলেন। স্টেফান মুসিয়ালেক-লোভিৎস্কি অস্থায়ী জরিপযন্ত্র ব্যবহার করে গর্তের আকার ও রকেটের গতিপথ হিসাব করার পদ্ধতি তৈরি করেন। কোনো কোনো আঘাতের গর্তের ব্যাস ১৫ মিটার পর্যন্ত হতো।

স্টেফান ভেরজিকোভস্কির নেতৃত্বে আরেক দল জার্মান উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই ধাতুর টুকরা, তার এবং অন্যান্য অংশ সংগ্রহ করত। রকেটটি কোথায় পড়েছে তা বোঝার জন্য তারা রকেট মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়ের গর্জন এবং মাটিতে আঘাতের বিস্ফোরণধ্বনির মধ্যকার সময়ও হিসাব করত।

The desperate hunt for Hitler's secret weapon | History | News |  Express.co.uk

সাইকেলে ছুটে যেত তিনজনের দল

তিনজনের ছোট ছোট দল সাইকেলে করে দুর্ঘটনাস্থলে যেত। একজন মাটি খুঁড়ত, একজন উদ্ধার করা জিনিস ব্যাগে ভরত এবং তৃতীয়জন পাহারা দিত। কোনো জায়গায় তারা ২০ মিনিটের বেশি থাকত না। কারণ জার্মানরা দুর্ঘটনাস্থলে কাউকে দেখলে গুলি করতে দ্বিধা করত না।

একবার মুসিয়ালেক-লোভিৎস্কি গিয়ে দেখলেন, জার্মান উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছে গেছে। তিনি সাবলীল জার্মান ভাষায় নিজেকে সরকারি কাজে আসা একজন প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেন। জার্মান সৈন্যরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল। সেই সুযোগে তিনি পোশাকের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লুকিয়ে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।

পরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও খবর ছড়িয়ে পড়ে যে হোম আর্মি ওই অদ্ভুত রকেটের অংশ সংগ্রহ করছে। কিশোর ছেলেরাও বাড়তি কিছু অর্থ উপার্জন এবং রোমাঞ্চের আশায় গোপন অভিযানে যোগ দেয়। মাঠের ছোট ছোট কর্মশালায় বিপুল পরিমাণ রকেটের অংশ জমা হতে থাকে। সেখান থেকে সেগুলো গোপনে ওয়ারশতে পাঠানো হতো। এক নারী এমনকি একটি ভালভ রুটির ভেতরে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। জার্মানরা তাঁর ব্যাগ তল্লাশি করলেও রুটিটি কেটে দেখেনি।

ভি-২-এর সম্পূর্ণ রূপ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা

ওয়ারশর গোপন গবেষণাগারে প্রকৌশলীরা উদ্ধার করা প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করে তার তালিকা তৈরি করতেন এবং বিশ্লেষণের ফলাফল লন্ডনে পাঠাতেন। এতে ভি-২ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা গেলেও একটি বড় সমস্যা রয়ে গিয়েছিল—তাঁদের হাতে কখনো পুরো রকেট ছিল না।

পুরো রকেট পাওয়া গেলে এর প্রতিটি ব্যবস্থা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তা বোঝা সম্ভব হতো। তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল যেন একটি বড় ধাঁধার বিচ্ছিন্ন টুকরা। ব্রিটেনেও তখন বিতর্ক চলছিল, জার্মানির ভি-২ অস্ত্র আদৌ বাস্তব কি না।

এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালের মে মাসে জান লোপাচিউক ও তাঁর ছেলে বাগ নদীর তীরে যে রকেটটি দেখতে পান, সেটি হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক সুযোগ।

অক্ষত ভি-২ উদ্ধার

রকেটটি প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। শুধু এর বিস্ফোরক মাথা এবং একটি পাখনা ছিল না। নিচের অংশ কিছুটা চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। এক পাশে ফাটল তৈরি হয়েছিল এবং সেখান দিয়ে তার বেরিয়ে ছিল। ছিদ্র হওয়া গ্যাস ট্যাংক থেকে অবশিষ্ট অক্সিজেন বেরিয়ে আসার কারণে বাতাসে ক্ষীণ হিসহিস শব্দ হচ্ছিল।

লোপাচিউক ও তাঁর ছেলে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ে বা সাইকেলে স্থানীয় চিকিৎসক মারিয়ান কোরচিকের কাছে যান। কোরচিক জানতেন, স্থানীয় মানুষ সাধারণত যেসব তথ্য গেরিলাদের কাছে পৌঁছে দেয়, সেসব তাঁর কাছেই আসে।

রকেটটি দেখে কোরচিক প্রথমেই সেটিকে লুকিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্ব ফ্রন্টে জার্মান বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ থাকায় উদ্ধারকারী দল হয়তো পুরোপুরি অনুসন্ধান করবে না—এই আশাই করেছিলেন তিনি। আশপাশের গ্রামের প্রায় এক ডজন মানুষকে ডেকে আনা হয়। তাঁরা প্রশ্ন না করেই ঘাস ও জলাভূমির গাছপালা কেটে রকেটটির ওপর ফেলে দেন। বিকেলের মধ্যেই রকেটটি দূর থেকে জলাভূমির অংশ বলেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু রাতে হোম আর্মির সদস্যরা এসে সিদ্ধান্ত নেন, রকেটটি সেখানে রাখা যাবে না। সেটিকে টুকরো করে বিভিন্ন গোপন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

জার্মান পোশাকে নয়, খাদ্য দপ্তরের কর্মী সেজে গবেষণা

ওয়ারশ থেকে বিশেষজ্ঞদের একটি দল গ্রামাঞ্চলে পাঠানো হয়। আন্তোনি কোচিয়ান-এর নেতৃত্বে তাঁরা জার্মান রাইখ খাদ্য দপ্তরের কর্মী সেজেছিলেন, যেন মাটির নমুনা পরীক্ষা করতে এসেছেন। রকেট পরীক্ষা করে কোচিয়ান বিস্তারিত নকশা তৈরি করেন। শেষে তিনি লিখেছিলেন, এটি তাঁদের প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি উন্নত এবং অবশ্যই লন্ডনে পৌঁছাতে হবে।

ওয়ারশতে দুইজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী সেই নকশা পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করেন। তাঁরা বুঝতে পারেন, রকেটটি দিক পরিবর্তনের জন্য ইঞ্জিনের ধাক্কার দিক নিয়ন্ত্রণ করত। তবে তাঁরা এটাও বুঝেছিলেন, শুধু নকশা দিয়ে পুরো প্রযুক্তি বোঝা সম্ভব নয়।

তাই রকেটটিকে ওয়ারশতে নিয়ে আসা হয়। সেটিকে এলোমেলো ধাতব আবর্জনার মতো সাজিয়ে দুটি ট্রাক ও একটি গাড়িতে করে পরিবহন করা হয়। রাজধানীতে প্রকৌশলীরা আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করেন—রকেটের ইঞ্জিনের ধরন, পাল্লা এবং কী ধরনের জ্বালানি ও জারক পদার্থ ব্যবহার করা হতো। এসব তথ্য লন্ডনে পাঠানো হলে ব্রিটিশ বিশ্লেষকেরা নিশ্চিত হন যে ভি-২ সত্যিই বাস্তব এবং খুব শিগগিরই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ রকেট হাতে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গোপন বিমানঘাঁটি ‘মটিল’

রকেটটিকে পোল্যান্ডের বাইরে পাঠানোর জন্য হোম আর্মি দক্ষিণ-পশ্চিম পোল্যান্ডে একটি গোপন অবতরণক্ষেত্র বেছে নেয়। এর সাংকেতিক নাম ছিল ‘মটিল’, যার অর্থ প্রজাপতি। জায়গাটি এতটাই লম্বা ছিল যে একটি ডাকোটা পরিবহন বিমান সেখানে নামতে পারত। চারদিকে উঁচু গাছ থাকায় বিমান ওঠানামার বিষয়টি আড়াল করা সম্ভব ছিল। কাছেই একটি রেলপথও ছিল, প্রয়োজন হলে সেটি নাশকতা করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যেত।

ওয়ারশ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রকেটের অংশগুলো সেখানে পৌঁছাতে হবে। অংশগুলো ধাতব সিলিন্ডারের মধ্যে ঢুকিয়ে অক্সিজেন রাখার পাত্র হিসেবে দেখানো হয়। কাজ শেষ করে প্রকৌশলীরা ছড়িয়ে পড়েন। তাঁদের একজন কর্মশালার দেয়ালে লিখে যান, ‘আন্তোনির জন্য—সেতু টিকে আছে।’ এটি ছিল পাভিয়াক কারাগারে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার তাঁদের নেতা আন্তোনির প্রতি শ্রদ্ধা।

Remembering one of the biggest underground armies of WW2. From a  40,000-people-strong underground organisation to an underground army of  350,000 soldiers – the evolution of the Home Army. 🗓84 years ago, on

জার্মান পোশাকে গোপন যাত্রা

১৯৪৪ সালের ১২ জুলাই ভোররাতে দুটি ট্রাক ওয়ারশ ছেড়ে যায়। ট্রাক চালাচ্ছিলেন অভিজ্ঞ গোপন বার্তাবাহকেরা। তাঁরা জার্মানদের কাছ থেকে দখল করা সামরিক পোশাক পরেছিলেন এবং হাতে ছিল জাল নথি। চেকপোস্টে থাকা জার্মান সৈন্যরা তাঁদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করেনি।

এক পর্যায়ে কয়েকজন জার্মান সৈন্য লিফট চেয়ে ট্রাকে উঠে বসে। যে ধাতব সিলিন্ডারগুলোকে তারা বসার বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তার ভেতরেই ছিল হিটলারের গোপন অস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাতে গাড়ির আলো বন্ধ করে অন্ধকারে চলতে গিয়ে একটি ট্রাক গর্তে আটকে প্রায় এক ঘণ্টা পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৫ জুলাই তারা মটিলের কাছে হোম আর্মির একটি ঘাঁটিতে পৌঁছায়।

একই জায়গায় জার্মান বিমানও

এবার শুরু হয় আরও বিপজ্জনক কাজ—জার্মান দখলকৃত এলাকায় একটি বিমানঘাঁটি তৈরি করা। ডাকোটার জন্য প্রায় ২৬০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে প্রয়োজন ছিল। শিশুদের সংগ্রহ করা ছোট পাথর দিয়ে রানওয়ের চিহ্ন তৈরি করা হয়।

কিন্তু পোলিশ যোদ্ধারা বুঝতে পারেন, জার্মানরাও মটিলকে বিমান ওঠানামার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯ জুলাই লুফটওয়াফের ২০ জন সদস্য সেখানে ফিয়েসেলার স্টর্চ বিমান চালানোর জন্য এসে হাজির হয়।

পোলিশ যোদ্ধারা তখন নিজেদের সাধারণ কৃষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দিনের বেলা খড় কাটতে থাকে। তারা জার্মানদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলত, সিগারেট চুরি করত এবং এমনকি জার্মান বিমানের একটি চাকার ফুটোও ঠিক করতে সাহায্য করেছিল। জার্মানরা সন্ধ্যায় চলে গেলে পোলিশরা গোপনে রানওয়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করত। বর্ষাকালের অস্বাভাবিক বৃষ্টির কারণে এই কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল।

২৫ জুলাইয়ের রাত

ইতালির ব্রিন্দিসিতে ব্রিটিশ পরিবহন বিমানবাহিনীর ২৬৭ নম্বর স্কোয়াড্রন রকেট উদ্ধারের পরিকল্পনা করছিল। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘মস্ট তৃতীয়’। ডাকোটাকে মটিলে নিরাপদে নামতে হলে রানওয়ে একেবারে ভালো অবস্থায় থাকতে হবে।

২৫ থেকে ২৬ জুলাইয়ের রাত নির্ধারণ করা হয় অভিযানের জন্য। সেদিন মটিলের ওপর দিয়ে চারটি স্টর্চ বিমানও উড়েছিল। পোলিশ যোদ্ধারা জঙ্গলের মধ্যে মাটিতে শুয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের নির্দেশ ছিল, জার্মানরা দেখতে না পেলে একেবারে নড়াচড়া করা যাবে না।

শেষ জার্মান বিমানটি সূর্যাস্তের সময় উড়ে চলে যায়। তখন পোলিশরা লন্ডনে সংকেত পাঠায়—‘তৃণভূমিতে প্রজাপতি একা।’ অর্থাৎ অভিযান শুরু করার জন্য মটিল প্রস্তুত।

ডাকোটার বিপজ্জনক উড্ডয়ন

পরিবর্তিত ডাকোটা বিমানটি তখন ইতালি থেকে রওনা হয়ে আসছিল। অতিরিক্ত ভার বহনের জন্য এর ভেতরের কাঠামো শক্ত করা হয়েছিল। বিমানটির নেতৃত্বে ছিলেন নিউজিল্যান্ডের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট স্ট্যানলি কালিফোর্ড এবং পোলিশ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাজিমিয়ের্জ শ্রাইয়ার।

প্রথম ৯০ মিনিট একটি ভারী বোমারু বিমান ডাকোটার সঙ্গে উড়ে তাকে আকাশপথে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু ইঞ্জিনের সমস্যায় রাত ৯টার দিকে সেটি ফিরে যায়। এরপর ডাকোটা একাই চাঁদের আলোয় মধ্য ইউরোপের আকাশ পাড়ি দিতে থাকে। দূরে মাঝে মাঝে আলো ও গুলির রেখা দেখা যাচ্ছিল।

মটিলে অবতরণের সময় ডাকোটাকে দুইবার চেষ্টা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত বিমানটি কাদায় ভিজে মাটিতে থামে। একটি ইঞ্জিন চালু রাখা হয়েছিল, যাতে দ্রুত পালানো যায়। যাত্রী ও সরঞ্জাম নামানোর পাশাপাশি রকেটের মূল্যবান অংশ বিমানে তোলা হয়। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে পোলিশ যোদ্ধারা জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে।

এরপর হোম আর্মির প্রতিনিধি জেরজি খমিয়েলেভস্কি বিমানে ওঠেন। পাইলটরা আবার ইঞ্জিন চালু করে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু কাদা চাকার চারপাশে এমনভাবে আটকে ছিল যে বিমান নড়ল না।

তিনবার ব্যর্থ, চতুর্থবারে অলৌকিক সাফল্য

পোলিশ যোদ্ধারা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে চাকার নিচে কাঠের তক্তা ঢুকিয়ে দেন এবং খড় বিছিয়ে দেন। কিন্তু বিমান প্রায় ৩০ মিটার যাওয়ার পর আবার কাদায় আটকে যায়। তৃতীয়বারের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

ব্রিটিশ নথিতে উল্লেখ আছে, শেষ পর্যন্ত পাইলট বিমানটির ব্রেকের ঘর্ষণ কমানোর জন্য জলচালিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পাইপ কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কালিফোর্ড বুঝতে পারছিলেন, জার্মান সেনারা চলে এলে তাঁদের ধরা পড়া প্রায় নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে বিমান ও এর ভেতরের মূল্যবান মালামাল ধ্বংস করে পালিয়ে যেতে হতো।

একজন পোলিশ যোদ্ধা তাঁদের বলেছিলেন, ‘জ্বালাবেন না। আমাদের আরও পাঁচ মিনিট দিন।’

পোলিশরা তখন আরও মরিয়া হয়ে মাটি খুঁড়তে, কাঠ বিছাতে এবং খড় দিয়ে শক্ত রাস্তা বানাতে শুরু করে। দুজন যোদ্ধা রাস্তার দিকে ছুটে যায়। জার্মান টহলদল এলে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে—প্রয়োজনে প্রাণও দেবে।

চতুর্থবার ডাকোটা সফলভাবে উড্ডয়ন করে। বিমানটি এত নিচু দিয়ে উড়েছিল যে রানওয়ের শেষ প্রান্তের গাছের ওপরের ডাল ভেঙে যায়। ভারী বোঝাই বিমানটি প্রায় ৩০ সেকেন্ড গাছের মাথার সমান উচ্চতায় উড়ে তারপর ওপরে উঠতে শুরু করে।

পোল্যান্ডের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের সুযোগ নিয়ে জার্মানরা এত কাছে থেকেও অভিযানটি খুঁজে পায়নি। ডাকোটা কার্পাথিয়ান পর্বতমালার উপত্যকার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় উড়ে যায়, যাতে জার্মান রাডারে ধরা না পড়ে।

ইতালিতে পৌঁছাল ভি-২

সকালের দিকে ডাকোটা ব্রিন্দিসিতে অবতরণের প্রস্তুতি নেয়। জলচালিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট থাকা সত্ত্বেও কালিফোর্ড ও শ্রাইয়ার সফলভাবে বিমান নামাতে সক্ষম হন।

এদিকে মটিলে থাকা হোম আর্মির সদস্যরা ভোরের আলো ফোটার আগেই ডাকোটার চাকার দাগ মুছে ফেলতে শুরু করেন। একজন পরে বলেছিলেন, সকাল সাতটার মধ্যে এমন মনে হচ্ছিল যেন সেখানে কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটেইনি।

ইতালিতে পোলিশ নির্বাসিত সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অস্ত্রের অংশগুলো বিমান থেকে নামানো হয়। তখন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পোলিশ প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা বলেন, বিমান থেকে নামানো সবকিছু ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

জেরজি খমিয়েলেভস্কি জবাব দেন, এগুলো পোল্যান্ডের সম্পত্তি এবং উচ্চপদস্থ পোলিশ কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া তিনি কিছুই হস্তান্তর করবেন না। পরে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রেজিনাল্ড ভিক্টর জোন্স স্মরণ করেন, খমিয়েলেভস্কি তাঁর বস্তার ওপর বসে থাকতেন এবং কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তা কাছে এলেই ছুরি বের করতেন।

শেষ পর্যন্ত কাছের কারিগরি যোগাযোগ কমিটির মেজর জেরজি বাজানের উপস্থিতিতে বিরোধের অবসান হয়। রকেটের অংশগুলো ক্যাসাব্লাঙ্কা ও জিব্রাল্টার হয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে পাঠানো হয়। ২৭ জুলাই সেগুলো ইংল্যান্ডে পৌঁছে যায়। খমিয়েলেভস্কিও আলাদা বিমানে সেখানে যান এবং হ্যাম্পশায়ারের রয়্যাল এয়ারক্রাফট এস্টাবলিশমেন্ট গবেষণাকেন্দ্রে রকেট পৌঁছানোর পর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

The V-2 Missile Heist - YouTube

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের বিস্ময়

ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা ভি-২ পরীক্ষা করে বিস্মিত হয়ে যান। তাঁদের একজন বলেছিলেন, তাঁরা এর আগে এত নিখুঁতভাবে তৈরি কোনো বস্তু দেখেননি। গবেষণাকেন্দ্রটি রকেটের মাপজোক করে বিস্তারিত নকশা তৈরি করে এবং সেগুলোর অনুলিপি আটলান্টিকের ওপারে পাঠানো হয়।

৫ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকারকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। মাত্র তিন দিন পরই লন্ডনে প্রথম ভি-২ আঘাত হানে।

এরপর ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা প্রতিটি ভি-২ আঘাতের স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। ১৯৪৫ সালের মার্চে দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের অরপিংটনে শেষ ভি-২ আঘাত হানা পর্যন্ত এই তথ্য সংগ্রহ চলতে থাকে। ভি-২ হামলায় ব্রিটেনে প্রায় ৩ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল।

গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে অসাধারণ সাফল্য

পোলিশ হোম আর্মির এই অভিযান জার্মানির ভি-২ কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি। কিন্তু এটি ব্রিটেনকে নতুন অস্ত্রটির বিরুদ্ধে বেসামরিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরির সুযোগ দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, ভি-২ রকেটে কোনো দূরনিয়ন্ত্রিত নির্দেশনা ব্যবস্থা নেই—এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া। ফলে মিত্রশক্তিকে অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরিতে বিপুল সময়, অর্থ ও বৈজ্ঞানিক শ্রম ব্যয় করতে হয়নি। ভি-২-এর বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির কার্যকর উপায় মূলত ছিল উৎপাদনকেন্দ্রে বোমা হামলা এবং উৎক্ষেপণস্থলগুলোর ওপর নজরদারি চালানো।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রেজিনাল্ড ভিক্টর জোন্স পরে হোম আর্মির এই অভিযানকে গোয়েন্দা ইতিহাসের অন্যতম অসাধারণ সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু পোলিশ যোদ্ধাদের জন্য এর পরিণতি ছিল অত্যন্ত নির্মম।

১৯৪৪ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ওয়ারশ বিদ্রোহে হোম আর্মি ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়ে। এরপর ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত বাহিনী ওয়ারশতে প্রবেশ করলে তারাও পোলিশ হোম আর্মির সদস্যদের মিত্র হিসেবে নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে।

অর্থাৎ, হিটলারের সবচেয়ে গোপন অস্ত্রের একটি সম্পূর্ণ রকেট জীবন বাজি রেখে চুরি করে মিত্রশক্তির হাতে তুলে দেওয়া সেই মানুষগুলোর অসাধারণ সাফল্যের পরেই নেমে এসেছিল গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ট্র্যাজেডি। তাঁদের সেই অভিযান ভি-২-এর যুদ্ধ থামাতে পারেনি, কিন্তু আধুনিক সামরিক গোয়েন্দা ইতিহাসে এটি আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কার আগে কি আমেরিকার কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখানো সম্ভব?

হিটলারের ভি-২ রকেট চুরি: মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পোলিশ প্রতিরোধযোদ্ধাদের অবিশ্বাস্য অভিযান

০৫:১১:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

১৯৪৪ সালের মে মাস। দক্ষিণ পোল্যান্ডের ব্লিজনা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে একটি ভি-২ রকেট আকাশে ছুটে উঠল। কমলা রঙের আগুনের ঝলক আর প্রচণ্ড গর্জনে কেঁপে উঠল আশপাশের এলাকা। আগের দুটি পরীক্ষায় রকেট আকাশেই বিস্ফোরিত হয়েছিল। এবার সেটি প্রায় ৪৫ সেকেন্ড পর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও এত দ্রুতগতিতে ছুটছিল যে বায়ুমণ্ডলের সীমানা পেরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। ভি-২ কর্মসূচির প্রধান ওয়াল্টার ডর্নবার্গারের কাছে ঘটনাটি ছিল একই সঙ্গে সাফল্য ও হতাশার। রকেট মহাকাশের প্রান্তে পৌঁছেছিল, কিন্তু পরীক্ষাগুলোর সাফল্যের হার তখনও মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ছিল। অথচ অ্যাডলফ হিটলার বিশ্বাস করতেন, ভি-২ দিয়েই যুদ্ধের ভাগ্য বদলে দেওয়া সম্ভব। তাঁর ধারণা ছিল, এই রকেট লন্ডন এমনকি একদিন নিউইয়র্ক পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারবে এবং বেসামরিক মানুষের মনোবল ভেঙে দেবে।

নদীর তীরে পড়ে থাকা অমূল্য রকেট

রকেটটি উৎক্ষেপণস্থল থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়ে। কৃষক জান লোপাচিউক ও তাঁর ছেলে তখন নিজেদের রক্ষা করতে দৌড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাঁরা বাগ নদীর তীরে গিয়ে দেখেন, বিস্ফোরণে ধ্বংস না হয়ে রকেটটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় কাদামাটির ওপর পড়ে আছে। নরম মাটি তার পতনের ধাক্কা সামলে দিয়েছিল। তাঁরা বুঝতে পারেননি, তাঁদের সামনে পড়ে থাকা এই রকেটই জার্মানির সবচেয়ে গোপন অস্ত্র কর্মসূচির বহু রহস্য ফাঁস করে দিতে পারে।

১৯৪৩ সালের আগস্টে পিনেমুন্দে অস্ত্র ও রকেট পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্রিটিশ বিমান হামলার পর ভি-২ পরীক্ষার কাজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ব্লিজনায়। সেখানে অস্বাভাবিক রেলপথের চালান, অসংখ্য জার্মান সামরিক ট্রাক এবং রাতদিন রকেট উৎক্ষেপণ স্থানীয় মানুষের নজরে আসে। ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর থেকেই গ্রামাঞ্চলের শান্ত পরিবেশ ভেঙে রকেটের গর্জন ও বিস্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এক কৃষক বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল যেন পৃথিবীর শেষ দিন এসে গেছে।

ধ্বংসস্তূপ থেকেও তথ্য সংগ্রহ

জার্মানরা জনবসতির দিকে রকেট ছুড়লেও রকেটের ভেতরে সবসময় বিস্ফোরক থাকত না। কিন্তু প্রায় ১৬ মিটার লম্বা ধাতব কাঠামো, বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ঘণ্টায় প্রায় ৫,৬০০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে আসা একটি রকেট নিজেই ভয়ংকর অস্ত্র ছিল।

ভি-২ মাটিতে আছড়ে পড়ার পর বেশির ভাগ সময়ই প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত। তবুও পোলিশ হোম আর্মির সদস্যরা ধ্বংসাবশেষ থেকে তথ্য সংগ্রহের উপায় বের করেছিলেন। স্টেফান মুসিয়ালেক-লোভিৎস্কি অস্থায়ী জরিপযন্ত্র ব্যবহার করে গর্তের আকার ও রকেটের গতিপথ হিসাব করার পদ্ধতি তৈরি করেন। কোনো কোনো আঘাতের গর্তের ব্যাস ১৫ মিটার পর্যন্ত হতো।

স্টেফান ভেরজিকোভস্কির নেতৃত্বে আরেক দল জার্মান উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই ধাতুর টুকরা, তার এবং অন্যান্য অংশ সংগ্রহ করত। রকেটটি কোথায় পড়েছে তা বোঝার জন্য তারা রকেট মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়ের গর্জন এবং মাটিতে আঘাতের বিস্ফোরণধ্বনির মধ্যকার সময়ও হিসাব করত।

The desperate hunt for Hitler's secret weapon | History | News |  Express.co.uk

সাইকেলে ছুটে যেত তিনজনের দল

তিনজনের ছোট ছোট দল সাইকেলে করে দুর্ঘটনাস্থলে যেত। একজন মাটি খুঁড়ত, একজন উদ্ধার করা জিনিস ব্যাগে ভরত এবং তৃতীয়জন পাহারা দিত। কোনো জায়গায় তারা ২০ মিনিটের বেশি থাকত না। কারণ জার্মানরা দুর্ঘটনাস্থলে কাউকে দেখলে গুলি করতে দ্বিধা করত না।

একবার মুসিয়ালেক-লোভিৎস্কি গিয়ে দেখলেন, জার্মান উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছে গেছে। তিনি সাবলীল জার্মান ভাষায় নিজেকে সরকারি কাজে আসা একজন প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেন। জার্মান সৈন্যরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল। সেই সুযোগে তিনি পোশাকের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ লুকিয়ে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।

পরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও খবর ছড়িয়ে পড়ে যে হোম আর্মি ওই অদ্ভুত রকেটের অংশ সংগ্রহ করছে। কিশোর ছেলেরাও বাড়তি কিছু অর্থ উপার্জন এবং রোমাঞ্চের আশায় গোপন অভিযানে যোগ দেয়। মাঠের ছোট ছোট কর্মশালায় বিপুল পরিমাণ রকেটের অংশ জমা হতে থাকে। সেখান থেকে সেগুলো গোপনে ওয়ারশতে পাঠানো হতো। এক নারী এমনকি একটি ভালভ রুটির ভেতরে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। জার্মানরা তাঁর ব্যাগ তল্লাশি করলেও রুটিটি কেটে দেখেনি।

ভি-২-এর সম্পূর্ণ রূপ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা

ওয়ারশর গোপন গবেষণাগারে প্রকৌশলীরা উদ্ধার করা প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করে তার তালিকা তৈরি করতেন এবং বিশ্লেষণের ফলাফল লন্ডনে পাঠাতেন। এতে ভি-২ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা গেলেও একটি বড় সমস্যা রয়ে গিয়েছিল—তাঁদের হাতে কখনো পুরো রকেট ছিল না।

পুরো রকেট পাওয়া গেলে এর প্রতিটি ব্যবস্থা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তা বোঝা সম্ভব হতো। তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল যেন একটি বড় ধাঁধার বিচ্ছিন্ন টুকরা। ব্রিটেনেও তখন বিতর্ক চলছিল, জার্মানির ভি-২ অস্ত্র আদৌ বাস্তব কি না।

এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালের মে মাসে জান লোপাচিউক ও তাঁর ছেলে বাগ নদীর তীরে যে রকেটটি দেখতে পান, সেটি হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক সুযোগ।

অক্ষত ভি-২ উদ্ধার

রকেটটি প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। শুধু এর বিস্ফোরক মাথা এবং একটি পাখনা ছিল না। নিচের অংশ কিছুটা চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। এক পাশে ফাটল তৈরি হয়েছিল এবং সেখান দিয়ে তার বেরিয়ে ছিল। ছিদ্র হওয়া গ্যাস ট্যাংক থেকে অবশিষ্ট অক্সিজেন বেরিয়ে আসার কারণে বাতাসে ক্ষীণ হিসহিস শব্দ হচ্ছিল।

লোপাচিউক ও তাঁর ছেলে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ে বা সাইকেলে স্থানীয় চিকিৎসক মারিয়ান কোরচিকের কাছে যান। কোরচিক জানতেন, স্থানীয় মানুষ সাধারণত যেসব তথ্য গেরিলাদের কাছে পৌঁছে দেয়, সেসব তাঁর কাছেই আসে।

রকেটটি দেখে কোরচিক প্রথমেই সেটিকে লুকিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পূর্ব ফ্রন্টে জার্মান বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড চাপ থাকায় উদ্ধারকারী দল হয়তো পুরোপুরি অনুসন্ধান করবে না—এই আশাই করেছিলেন তিনি। আশপাশের গ্রামের প্রায় এক ডজন মানুষকে ডেকে আনা হয়। তাঁরা প্রশ্ন না করেই ঘাস ও জলাভূমির গাছপালা কেটে রকেটটির ওপর ফেলে দেন। বিকেলের মধ্যেই রকেটটি দূর থেকে জলাভূমির অংশ বলেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু রাতে হোম আর্মির সদস্যরা এসে সিদ্ধান্ত নেন, রকেটটি সেখানে রাখা যাবে না। সেটিকে টুকরো করে বিভিন্ন গোপন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

জার্মান পোশাকে নয়, খাদ্য দপ্তরের কর্মী সেজে গবেষণা

ওয়ারশ থেকে বিশেষজ্ঞদের একটি দল গ্রামাঞ্চলে পাঠানো হয়। আন্তোনি কোচিয়ান-এর নেতৃত্বে তাঁরা জার্মান রাইখ খাদ্য দপ্তরের কর্মী সেজেছিলেন, যেন মাটির নমুনা পরীক্ষা করতে এসেছেন। রকেট পরীক্ষা করে কোচিয়ান বিস্তারিত নকশা তৈরি করেন। শেষে তিনি লিখেছিলেন, এটি তাঁদের প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি উন্নত এবং অবশ্যই লন্ডনে পৌঁছাতে হবে।

ওয়ারশতে দুইজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী সেই নকশা পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করেন। তাঁরা বুঝতে পারেন, রকেটটি দিক পরিবর্তনের জন্য ইঞ্জিনের ধাক্কার দিক নিয়ন্ত্রণ করত। তবে তাঁরা এটাও বুঝেছিলেন, শুধু নকশা দিয়ে পুরো প্রযুক্তি বোঝা সম্ভব নয়।

তাই রকেটটিকে ওয়ারশতে নিয়ে আসা হয়। সেটিকে এলোমেলো ধাতব আবর্জনার মতো সাজিয়ে দুটি ট্রাক ও একটি গাড়িতে করে পরিবহন করা হয়। রাজধানীতে প্রকৌশলীরা আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করেন—রকেটের ইঞ্জিনের ধরন, পাল্লা এবং কী ধরনের জ্বালানি ও জারক পদার্থ ব্যবহার করা হতো। এসব তথ্য লন্ডনে পাঠানো হলে ব্রিটিশ বিশ্লেষকেরা নিশ্চিত হন যে ভি-২ সত্যিই বাস্তব এবং খুব শিগগিরই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ রকেট হাতে পাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গোপন বিমানঘাঁটি ‘মটিল’

রকেটটিকে পোল্যান্ডের বাইরে পাঠানোর জন্য হোম আর্মি দক্ষিণ-পশ্চিম পোল্যান্ডে একটি গোপন অবতরণক্ষেত্র বেছে নেয়। এর সাংকেতিক নাম ছিল ‘মটিল’, যার অর্থ প্রজাপতি। জায়গাটি এতটাই লম্বা ছিল যে একটি ডাকোটা পরিবহন বিমান সেখানে নামতে পারত। চারদিকে উঁচু গাছ থাকায় বিমান ওঠানামার বিষয়টি আড়াল করা সম্ভব ছিল। কাছেই একটি রেলপথও ছিল, প্রয়োজন হলে সেটি নাশকতা করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যেত।

ওয়ারশ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রকেটের অংশগুলো সেখানে পৌঁছাতে হবে। অংশগুলো ধাতব সিলিন্ডারের মধ্যে ঢুকিয়ে অক্সিজেন রাখার পাত্র হিসেবে দেখানো হয়। কাজ শেষ করে প্রকৌশলীরা ছড়িয়ে পড়েন। তাঁদের একজন কর্মশালার দেয়ালে লিখে যান, ‘আন্তোনির জন্য—সেতু টিকে আছে।’ এটি ছিল পাভিয়াক কারাগারে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার তাঁদের নেতা আন্তোনির প্রতি শ্রদ্ধা।

Remembering one of the biggest underground armies of WW2. From a  40,000-people-strong underground organisation to an underground army of  350,000 soldiers – the evolution of the Home Army. 🗓84 years ago, on

জার্মান পোশাকে গোপন যাত্রা

১৯৪৪ সালের ১২ জুলাই ভোররাতে দুটি ট্রাক ওয়ারশ ছেড়ে যায়। ট্রাক চালাচ্ছিলেন অভিজ্ঞ গোপন বার্তাবাহকেরা। তাঁরা জার্মানদের কাছ থেকে দখল করা সামরিক পোশাক পরেছিলেন এবং হাতে ছিল জাল নথি। চেকপোস্টে থাকা জার্মান সৈন্যরা তাঁদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করেনি।

এক পর্যায়ে কয়েকজন জার্মান সৈন্য লিফট চেয়ে ট্রাকে উঠে বসে। যে ধাতব সিলিন্ডারগুলোকে তারা বসার বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তার ভেতরেই ছিল হিটলারের গোপন অস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাতে গাড়ির আলো বন্ধ করে অন্ধকারে চলতে গিয়ে একটি ট্রাক গর্তে আটকে প্রায় এক ঘণ্টা পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৫ জুলাই তারা মটিলের কাছে হোম আর্মির একটি ঘাঁটিতে পৌঁছায়।

একই জায়গায় জার্মান বিমানও

এবার শুরু হয় আরও বিপজ্জনক কাজ—জার্মান দখলকৃত এলাকায় একটি বিমানঘাঁটি তৈরি করা। ডাকোটার জন্য প্রায় ২৬০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে প্রয়োজন ছিল। শিশুদের সংগ্রহ করা ছোট পাথর দিয়ে রানওয়ের চিহ্ন তৈরি করা হয়।

কিন্তু পোলিশ যোদ্ধারা বুঝতে পারেন, জার্মানরাও মটিলকে বিমান ওঠানামার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯ জুলাই লুফটওয়াফের ২০ জন সদস্য সেখানে ফিয়েসেলার স্টর্চ বিমান চালানোর জন্য এসে হাজির হয়।

পোলিশ যোদ্ধারা তখন নিজেদের সাধারণ কৃষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দিনের বেলা খড় কাটতে থাকে। তারা জার্মানদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলত, সিগারেট চুরি করত এবং এমনকি জার্মান বিমানের একটি চাকার ফুটোও ঠিক করতে সাহায্য করেছিল। জার্মানরা সন্ধ্যায় চলে গেলে পোলিশরা গোপনে রানওয়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করত। বর্ষাকালের অস্বাভাবিক বৃষ্টির কারণে এই কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল।

২৫ জুলাইয়ের রাত

ইতালির ব্রিন্দিসিতে ব্রিটিশ পরিবহন বিমানবাহিনীর ২৬৭ নম্বর স্কোয়াড্রন রকেট উদ্ধারের পরিকল্পনা করছিল। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘মস্ট তৃতীয়’। ডাকোটাকে মটিলে নিরাপদে নামতে হলে রানওয়ে একেবারে ভালো অবস্থায় থাকতে হবে।

২৫ থেকে ২৬ জুলাইয়ের রাত নির্ধারণ করা হয় অভিযানের জন্য। সেদিন মটিলের ওপর দিয়ে চারটি স্টর্চ বিমানও উড়েছিল। পোলিশ যোদ্ধারা জঙ্গলের মধ্যে মাটিতে শুয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের নির্দেশ ছিল, জার্মানরা দেখতে না পেলে একেবারে নড়াচড়া করা যাবে না।

শেষ জার্মান বিমানটি সূর্যাস্তের সময় উড়ে চলে যায়। তখন পোলিশরা লন্ডনে সংকেত পাঠায়—‘তৃণভূমিতে প্রজাপতি একা।’ অর্থাৎ অভিযান শুরু করার জন্য মটিল প্রস্তুত।

ডাকোটার বিপজ্জনক উড্ডয়ন

পরিবর্তিত ডাকোটা বিমানটি তখন ইতালি থেকে রওনা হয়ে আসছিল। অতিরিক্ত ভার বহনের জন্য এর ভেতরের কাঠামো শক্ত করা হয়েছিল। বিমানটির নেতৃত্বে ছিলেন নিউজিল্যান্ডের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট স্ট্যানলি কালিফোর্ড এবং পোলিশ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাজিমিয়ের্জ শ্রাইয়ার।

প্রথম ৯০ মিনিট একটি ভারী বোমারু বিমান ডাকোটার সঙ্গে উড়ে তাকে আকাশপথে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু ইঞ্জিনের সমস্যায় রাত ৯টার দিকে সেটি ফিরে যায়। এরপর ডাকোটা একাই চাঁদের আলোয় মধ্য ইউরোপের আকাশ পাড়ি দিতে থাকে। দূরে মাঝে মাঝে আলো ও গুলির রেখা দেখা যাচ্ছিল।

মটিলে অবতরণের সময় ডাকোটাকে দুইবার চেষ্টা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত বিমানটি কাদায় ভিজে মাটিতে থামে। একটি ইঞ্জিন চালু রাখা হয়েছিল, যাতে দ্রুত পালানো যায়। যাত্রী ও সরঞ্জাম নামানোর পাশাপাশি রকেটের মূল্যবান অংশ বিমানে তোলা হয়। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে পোলিশ যোদ্ধারা জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে।

এরপর হোম আর্মির প্রতিনিধি জেরজি খমিয়েলেভস্কি বিমানে ওঠেন। পাইলটরা আবার ইঞ্জিন চালু করে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু কাদা চাকার চারপাশে এমনভাবে আটকে ছিল যে বিমান নড়ল না।

তিনবার ব্যর্থ, চতুর্থবারে অলৌকিক সাফল্য

পোলিশ যোদ্ধারা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে চাকার নিচে কাঠের তক্তা ঢুকিয়ে দেন এবং খড় বিছিয়ে দেন। কিন্তু বিমান প্রায় ৩০ মিটার যাওয়ার পর আবার কাদায় আটকে যায়। তৃতীয়বারের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

ব্রিটিশ নথিতে উল্লেখ আছে, শেষ পর্যন্ত পাইলট বিমানটির ব্রেকের ঘর্ষণ কমানোর জন্য জলচালিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পাইপ কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কালিফোর্ড বুঝতে পারছিলেন, জার্মান সেনারা চলে এলে তাঁদের ধরা পড়া প্রায় নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে বিমান ও এর ভেতরের মূল্যবান মালামাল ধ্বংস করে পালিয়ে যেতে হতো।

একজন পোলিশ যোদ্ধা তাঁদের বলেছিলেন, ‘জ্বালাবেন না। আমাদের আরও পাঁচ মিনিট দিন।’

পোলিশরা তখন আরও মরিয়া হয়ে মাটি খুঁড়তে, কাঠ বিছাতে এবং খড় দিয়ে শক্ত রাস্তা বানাতে শুরু করে। দুজন যোদ্ধা রাস্তার দিকে ছুটে যায়। জার্মান টহলদল এলে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে—প্রয়োজনে প্রাণও দেবে।

চতুর্থবার ডাকোটা সফলভাবে উড্ডয়ন করে। বিমানটি এত নিচু দিয়ে উড়েছিল যে রানওয়ের শেষ প্রান্তের গাছের ওপরের ডাল ভেঙে যায়। ভারী বোঝাই বিমানটি প্রায় ৩০ সেকেন্ড গাছের মাথার সমান উচ্চতায় উড়ে তারপর ওপরে উঠতে শুরু করে।

পোল্যান্ডের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের সুযোগ নিয়ে জার্মানরা এত কাছে থেকেও অভিযানটি খুঁজে পায়নি। ডাকোটা কার্পাথিয়ান পর্বতমালার উপত্যকার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় উড়ে যায়, যাতে জার্মান রাডারে ধরা না পড়ে।

ইতালিতে পৌঁছাল ভি-২

সকালের দিকে ডাকোটা ব্রিন্দিসিতে অবতরণের প্রস্তুতি নেয়। জলচালিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট থাকা সত্ত্বেও কালিফোর্ড ও শ্রাইয়ার সফলভাবে বিমান নামাতে সক্ষম হন।

এদিকে মটিলে থাকা হোম আর্মির সদস্যরা ভোরের আলো ফোটার আগেই ডাকোটার চাকার দাগ মুছে ফেলতে শুরু করেন। একজন পরে বলেছিলেন, সকাল সাতটার মধ্যে এমন মনে হচ্ছিল যেন সেখানে কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটেইনি।

ইতালিতে পোলিশ নির্বাসিত সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অস্ত্রের অংশগুলো বিমান থেকে নামানো হয়। তখন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পোলিশ প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা বলেন, বিমান থেকে নামানো সবকিছু ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

জেরজি খমিয়েলেভস্কি জবাব দেন, এগুলো পোল্যান্ডের সম্পত্তি এবং উচ্চপদস্থ পোলিশ কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া তিনি কিছুই হস্তান্তর করবেন না। পরে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রেজিনাল্ড ভিক্টর জোন্স স্মরণ করেন, খমিয়েলেভস্কি তাঁর বস্তার ওপর বসে থাকতেন এবং কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তা কাছে এলেই ছুরি বের করতেন।

শেষ পর্যন্ত কাছের কারিগরি যোগাযোগ কমিটির মেজর জেরজি বাজানের উপস্থিতিতে বিরোধের অবসান হয়। রকেটের অংশগুলো ক্যাসাব্লাঙ্কা ও জিব্রাল্টার হয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে পাঠানো হয়। ২৭ জুলাই সেগুলো ইংল্যান্ডে পৌঁছে যায়। খমিয়েলেভস্কিও আলাদা বিমানে সেখানে যান এবং হ্যাম্পশায়ারের রয়্যাল এয়ারক্রাফট এস্টাবলিশমেন্ট গবেষণাকেন্দ্রে রকেট পৌঁছানোর পর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

The V-2 Missile Heist - YouTube

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের বিস্ময়

ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা ভি-২ পরীক্ষা করে বিস্মিত হয়ে যান। তাঁদের একজন বলেছিলেন, তাঁরা এর আগে এত নিখুঁতভাবে তৈরি কোনো বস্তু দেখেননি। গবেষণাকেন্দ্রটি রকেটের মাপজোক করে বিস্তারিত নকশা তৈরি করে এবং সেগুলোর অনুলিপি আটলান্টিকের ওপারে পাঠানো হয়।

৫ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকারকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। মাত্র তিন দিন পরই লন্ডনে প্রথম ভি-২ আঘাত হানে।

এরপর ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা প্রতিটি ভি-২ আঘাতের স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। ১৯৪৫ সালের মার্চে দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের অরপিংটনে শেষ ভি-২ আঘাত হানা পর্যন্ত এই তথ্য সংগ্রহ চলতে থাকে। ভি-২ হামলায় ব্রিটেনে প্রায় ৩ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল।

গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে অসাধারণ সাফল্য

পোলিশ হোম আর্মির এই অভিযান জার্মানির ভি-২ কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি। কিন্তু এটি ব্রিটেনকে নতুন অস্ত্রটির বিরুদ্ধে বেসামরিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরির সুযোগ দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, ভি-২ রকেটে কোনো দূরনিয়ন্ত্রিত নির্দেশনা ব্যবস্থা নেই—এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া। ফলে মিত্রশক্তিকে অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরিতে বিপুল সময়, অর্থ ও বৈজ্ঞানিক শ্রম ব্যয় করতে হয়নি। ভি-২-এর বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির কার্যকর উপায় মূলত ছিল উৎপাদনকেন্দ্রে বোমা হামলা এবং উৎক্ষেপণস্থলগুলোর ওপর নজরদারি চালানো।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা রেজিনাল্ড ভিক্টর জোন্স পরে হোম আর্মির এই অভিযানকে গোয়েন্দা ইতিহাসের অন্যতম অসাধারণ সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু পোলিশ যোদ্ধাদের জন্য এর পরিণতি ছিল অত্যন্ত নির্মম।

১৯৪৪ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ওয়ারশ বিদ্রোহে হোম আর্মি ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়ে। এরপর ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত বাহিনী ওয়ারশতে প্রবেশ করলে তারাও পোলিশ হোম আর্মির সদস্যদের মিত্র হিসেবে নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে।

অর্থাৎ, হিটলারের সবচেয়ে গোপন অস্ত্রের একটি সম্পূর্ণ রকেট জীবন বাজি রেখে চুরি করে মিত্রশক্তির হাতে তুলে দেওয়া সেই মানুষগুলোর অসাধারণ সাফল্যের পরেই নেমে এসেছিল গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ট্র্যাজেডি। তাঁদের সেই অভিযান ভি-২-এর যুদ্ধ থামাতে পারেনি, কিন্তু আধুনিক সামরিক গোয়েন্দা ইতিহাসে এটি আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।