০৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
ইউক্রেনের যুদ্ধের মানবিক চিত্র বদলে দিচ্ছে মার্কিন ধর্মপ্রচারকদের মনোভাব পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য? দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্পে টিএসএমসির কৌশল, যেভাবে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে বিশ্বজয় গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার নয় দ্বৈত কৌশলগত সিদ্ধান্ত: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সংঘাত নয়, শান্তির পথ বেছে নেওয়ার সময়

যুদ্ধ, তেল আর জলবায়ু: মানুষের সংকটই কি জ্বালানি কোম্পানির সোনালি সময়?

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার যখন অস্থির, তেলের দাম যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন বিশ্বের বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে। মাত্র তিন মাসে আটটি বৃহৎ তেল কোম্পানি ৬৭ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি মুনাফা করেছে। অর্থাৎ বসন্তের একটি প্রান্তিকে এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারের বেশি লাভ করেছে।

এই হিসাবকে নিছক করপোরেট সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ যে পরিস্থিতি কোটি কোটি মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, সেই একই পরিস্থিতি জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের জন্য পরিণত হয়েছে বিপুল মুনাফার উৎসে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে, অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ওঠে, আর তার প্রভাব পড়ে পেট্রল থেকে পরিবহন—সবকিছুর ওপর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি দামের একটি বড় সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে তেল কোম্পানিগুলো।

এখানেই বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি নিহিত: সংকটের মূল্য কে দিচ্ছে, আর সংকট থেকে লাভ করছে কে?

মুনাফার বিস্ফোরণ

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল জায়ান্ট আরামকো এই মুনাফার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। কোম্পানিটির ত্রৈমাসিক নিট আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। সংখ্যাটি এত বড় যে একটি দেশের বার্ষিক বাজেটের সঙ্গে তুলনা না করলে এর ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন। অথচ এই বিপুল মুনাফা এসেছে এমন সময়ে, যখন বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি ব্যয় মানুষের পারিবারিক বাজেটকে চাপে ফেলছে।

বিপি ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বছরের পর তাদের সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা। শেল করেছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা। ইকুইনরের আয় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। টোটালএনার্জিস, এনি, শেভরন এবং এক্সনমোবিলও যুদ্ধকালীন বাজারের সুবিধা নিয়ে বিপুল আয় করেছে।

এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ সংকট হলে তার দাম বাড়ে—এটি বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যখন সেই পণ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান এবং তার মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু বাজারের যুক্তি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।

কারণ জ্বালানি ব্যয় বাড়লে শুধু গাড়ির চালক বেশি অর্থ দেন না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ে। অর্থাৎ তেলের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা পুরো অর্থনীতির ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

Revealed: major oil firms make $93bn profits amid war and climate crisis |  Oil | The Guardian

অন্যদিকে তেল উৎপাদকরা সেই একই মূল্যবৃদ্ধিকে আয় বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে পায়।

ভোক্তার দুর্ভোগ বনাম করপোরেট লাভ

পেট্রলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে। যুক্তরাজ্যে পেট্রলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর অর্থ, যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার না হয়েও সাধারণ মানুষ যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করছে।

এই জায়গায় তেল কোম্পানির মুনাফা নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভের কারণটি পরিষ্কার। গ্রিনপিসের রাজনৈতিক প্রচারক অ্যাঙ্গারাড হপকিনসনের অভিযোগ—কোম্পানির বিপুল লাভ এবং জনস্বার্থের মধ্যে দূরত্ব এতটাই বেড়েছে যে সাধারণ মানুষ যখন বাড়তি খরচের চাপে পড়ছে, তখন দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই আর্থিকভাবে পুরস্কৃত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই—তেল শিল্পের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টও যখন কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত লাভ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বোঝা যায় জনমনে ক্ষোভ কতটা গভীর হয়েছে।

তবে শুধু অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ বর্তমান সংকটের শিকড় আরও গভীরে—বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বিপুলভাবে এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার মূল্য ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সঙ্গে অস্থির হয়ে ওঠে এবং যার ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।

জলবায়ু সংকটের অদৃশ্য বিল

তেলের মুনাফার হিসাব সাধারণত ব্যালান্স শিটে পাওয়া যায়। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকৃত খরচ সেখানে দেখা যায় না। সেই খরচ বহন করে মানুষ—তাপপ্রবাহে, দাবানলে, খরায়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এবং কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষতিতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১৪টি বৃহৎ জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির যেকোনো একটির ঐতিহাসিক নিঃসরণই এমন ৫০টির বেশি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল, যেগুলো অন্যথায় অত্যন্ত বিরল হওয়ার কথা।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী বিপদ নয়। এটি ইতোমধ্যে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে।

চলতি বছর বিশ্বজুড়ে চরম তাপমাত্রার কারণে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাজ্যে মে ও জুন মাসে প্রায় ৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে অতিরিক্ত তাপের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। মে মাসে কিউ গার্ডেনে তাপমাত্রা ৩৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ১৯২২ সালের ৩২ দশমিক ৮ ডিগ্রির রেকর্ডকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যায়। জুনে নরফোকের লিংউডে তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে।

এর পাশাপাশি খরা ও দাবানল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ইংল্যান্ডের অর্ধেক অঞ্চল সরকারি হিসাবে খরার মধ্যে রয়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস জুলাইয়ে রেকর্ডের সবচেয়ে শুষ্ক মাস দেখেছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে দাবানল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এসব আগুন শুধু বন বা বসতি ধ্বংস করছে না; এর ধোঁয়া মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষের আয়ু দাবানলের ধোঁয়ার কারণে কমে যায়।

এখন তাই প্রশ্নটি আরও কঠিন: জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে যে মুনাফা তৈরি হচ্ছে, তার বিপরীতে জলবায়ু ক্ষতির সামাজিক ব্যয় কে বহন করছে?

লাভের সঙ্গে দায়ও কি আসবে?

কোনো কোম্পানি লাভ করবে—এটি বাজার অর্থনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কোনো শিল্প যদি একই সঙ্গে বিপুল মুনাফা করে এবং তার কার্যক্রমের পরিবেশগত ক্ষতির ব্যয় সমাজকে বহন করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবসার সামাজিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনিবার্য।

এখানেই তেল কোম্পানির মুনাফার বর্তমান হিসাব জলবায়ু রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যদি একদিকে তেলের দাম বাড়ার কারণে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে, আর অন্যদিকে মানুষকে তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য অর্থ দিতে হয়, তাহলে অর্থনৈতিক কাঠামোটি কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

বিশ্বের সরকারগুলো বহু বছর ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা এখনো এত বেশি যে সামান্য ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা তৈরি করে। ইরান যুদ্ধের অভিঘাত সেই দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

Feature: Oil crisis ends West's golden age when oil was cheaper than  water-Xinhua

অতএব সমাধান শুধু যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা নয়। প্রয়োজন এমন একটি জ্বালানি রূপান্তর, যাতে কোনো একটি অঞ্চলের সংঘাত পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে না পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ, কয়লা-তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং একই সঙ্গে জলবায়ু বিপর্যয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া—এই তিনটি বিষয়কে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিলও মূলত সেই পথের কথাই বলেছেন: জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং যেসব মানুষ ইতোমধ্যে জলবায়ু বিপর্যয়ের আঘাত পাচ্ছেন তাদের সুরক্ষা দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত তেল কোম্পানিগুলোর ৬৭ বিলিয়ন পাউন্ডের মুনাফা শুধু একটি করপোরেট আর্থিক রেকর্ড নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি গভীর বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। একদিকে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু বিপর্যয় মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে; অন্যদিকে একই পরিস্থিতি বিশ্বের বৃহৎ জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য অভূতপূর্ব মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে।

ইরান যুদ্ধ থামতে পারে। তেলের দামও একসময় কমতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এত সহজে ফিরে যাবে না। আজকের মুনাফা যদি আগামী দিনের পরিবেশগত ও মানবিক ক্ষতির বিল তৈরি করে, তবে সেই মুনাফাকে নিছক সাফল্য হিসেবে দেখা ভুল হবে।

আসল প্রশ্ন তাই তেল কোম্পানিগুলো কত টাকা আয় করছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—সেই আয়ের প্রকৃত মূল্য কে পরিশোধ করছে?

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউক্রেনের যুদ্ধের মানবিক চিত্র বদলে দিচ্ছে মার্কিন ধর্মপ্রচারকদের মনোভাব

যুদ্ধ, তেল আর জলবায়ু: মানুষের সংকটই কি জ্বালানি কোম্পানির সোনালি সময়?

০৪:৫৮:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার যখন অস্থির, তেলের দাম যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন বিশ্বের বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে এনেছে। মাত্র তিন মাসে আটটি বৃহৎ তেল কোম্পানি ৬৭ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি মুনাফা করেছে। অর্থাৎ বসন্তের একটি প্রান্তিকে এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারের বেশি লাভ করেছে।

এই হিসাবকে নিছক করপোরেট সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ যে পরিস্থিতি কোটি কোটি মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, সেই একই পরিস্থিতি জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের জন্য পরিণত হয়েছে বিপুল মুনাফার উৎসে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে, অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ওঠে, আর তার প্রভাব পড়ে পেট্রল থেকে পরিবহন—সবকিছুর ওপর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি দামের একটি বড় সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে তেল কোম্পানিগুলো।

এখানেই বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি নিহিত: সংকটের মূল্য কে দিচ্ছে, আর সংকট থেকে লাভ করছে কে?

মুনাফার বিস্ফোরণ

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল জায়ান্ট আরামকো এই মুনাফার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। কোম্পানিটির ত্রৈমাসিক নিট আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। সংখ্যাটি এত বড় যে একটি দেশের বার্ষিক বাজেটের সঙ্গে তুলনা না করলে এর ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন। অথচ এই বিপুল মুনাফা এসেছে এমন সময়ে, যখন বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি ব্যয় মানুষের পারিবারিক বাজেটকে চাপে ফেলছে।

বিপি ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বছরের পর তাদের সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা। শেল করেছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা। ইকুইনরের আয় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। টোটালএনার্জিস, এনি, শেভরন এবং এক্সনমোবিলও যুদ্ধকালীন বাজারের সুবিধা নিয়ে বিপুল আয় করেছে।

এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ সংকট হলে তার দাম বাড়ে—এটি বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যখন সেই পণ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান এবং তার মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু বাজারের যুক্তি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।

কারণ জ্বালানি ব্যয় বাড়লে শুধু গাড়ির চালক বেশি অর্থ দেন না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ে। অর্থাৎ তেলের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা পুরো অর্থনীতির ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

Revealed: major oil firms make $93bn profits amid war and climate crisis |  Oil | The Guardian

অন্যদিকে তেল উৎপাদকরা সেই একই মূল্যবৃদ্ধিকে আয় বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে পায়।

ভোক্তার দুর্ভোগ বনাম করপোরেট লাভ

পেট্রলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে। যুক্তরাজ্যে পেট্রলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর অর্থ, যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার না হয়েও সাধারণ মানুষ যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করছে।

এই জায়গায় তেল কোম্পানির মুনাফা নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভের কারণটি পরিষ্কার। গ্রিনপিসের রাজনৈতিক প্রচারক অ্যাঙ্গারাড হপকিনসনের অভিযোগ—কোম্পানির বিপুল লাভ এবং জনস্বার্থের মধ্যে দূরত্ব এতটাই বেড়েছে যে সাধারণ মানুষ যখন বাড়তি খরচের চাপে পড়ছে, তখন দূষণ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই আর্থিকভাবে পুরস্কৃত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই—তেল শিল্পের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টও যখন কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত লাভ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বোঝা যায় জনমনে ক্ষোভ কতটা গভীর হয়েছে।

তবে শুধু অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ বর্তমান সংকটের শিকড় আরও গভীরে—বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বিপুলভাবে এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার মূল্য ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে সঙ্গে অস্থির হয়ে ওঠে এবং যার ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।

জলবায়ু সংকটের অদৃশ্য বিল

তেলের মুনাফার হিসাব সাধারণত ব্যালান্স শিটে পাওয়া যায়। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির প্রকৃত খরচ সেখানে দেখা যায় না। সেই খরচ বহন করে মানুষ—তাপপ্রবাহে, দাবানলে, খরায়, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এবং কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষতিতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১৪টি বৃহৎ জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির যেকোনো একটির ঐতিহাসিক নিঃসরণই এমন ৫০টির বেশি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল, যেগুলো অন্যথায় অত্যন্ত বিরল হওয়ার কথা।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী বিপদ নয়। এটি ইতোমধ্যে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে।

চলতি বছর বিশ্বজুড়ে চরম তাপমাত্রার কারণে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাজ্যে মে ও জুন মাসে প্রায় ৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে অতিরিক্ত তাপের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। মে মাসে কিউ গার্ডেনে তাপমাত্রা ৩৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ১৯২২ সালের ৩২ দশমিক ৮ ডিগ্রির রেকর্ডকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যায়। জুনে নরফোকের লিংউডে তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে।

এর পাশাপাশি খরা ও দাবানল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ইংল্যান্ডের অর্ধেক অঞ্চল সরকারি হিসাবে খরার মধ্যে রয়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলস জুলাইয়ে রেকর্ডের সবচেয়ে শুষ্ক মাস দেখেছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে দাবানল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এসব আগুন শুধু বন বা বসতি ধ্বংস করছে না; এর ধোঁয়া মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষের আয়ু দাবানলের ধোঁয়ার কারণে কমে যায়।

এখন তাই প্রশ্নটি আরও কঠিন: জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে যে মুনাফা তৈরি হচ্ছে, তার বিপরীতে জলবায়ু ক্ষতির সামাজিক ব্যয় কে বহন করছে?

লাভের সঙ্গে দায়ও কি আসবে?

কোনো কোম্পানি লাভ করবে—এটি বাজার অর্থনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কোনো শিল্প যদি একই সঙ্গে বিপুল মুনাফা করে এবং তার কার্যক্রমের পরিবেশগত ক্ষতির ব্যয় সমাজকে বহন করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবসার সামাজিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনিবার্য।

এখানেই তেল কোম্পানির মুনাফার বর্তমান হিসাব জলবায়ু রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যদি একদিকে তেলের দাম বাড়ার কারণে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে, আর অন্যদিকে মানুষকে তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য অর্থ দিতে হয়, তাহলে অর্থনৈতিক কাঠামোটি কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

বিশ্বের সরকারগুলো বহু বছর ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা এখনো এত বেশি যে সামান্য ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা তৈরি করে। ইরান যুদ্ধের অভিঘাত সেই দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

Feature: Oil crisis ends West's golden age when oil was cheaper than  water-Xinhua

অতএব সমাধান শুধু যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা নয়। প্রয়োজন এমন একটি জ্বালানি রূপান্তর, যাতে কোনো একটি অঞ্চলের সংঘাত পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে না পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ, কয়লা-তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং একই সঙ্গে জলবায়ু বিপর্যয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া—এই তিনটি বিষয়কে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিলও মূলত সেই পথের কথাই বলেছেন: জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং যেসব মানুষ ইতোমধ্যে জলবায়ু বিপর্যয়ের আঘাত পাচ্ছেন তাদের সুরক্ষা দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত তেল কোম্পানিগুলোর ৬৭ বিলিয়ন পাউন্ডের মুনাফা শুধু একটি করপোরেট আর্থিক রেকর্ড নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি গভীর বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। একদিকে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু বিপর্যয় মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে; অন্যদিকে একই পরিস্থিতি বিশ্বের বৃহৎ জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য অভূতপূর্ব মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে।

ইরান যুদ্ধ থামতে পারে। তেলের দামও একসময় কমতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এত সহজে ফিরে যাবে না। আজকের মুনাফা যদি আগামী দিনের পরিবেশগত ও মানবিক ক্ষতির বিল তৈরি করে, তবে সেই মুনাফাকে নিছক সাফল্য হিসেবে দেখা ভুল হবে।

আসল প্রশ্ন তাই তেল কোম্পানিগুলো কত টাকা আয় করছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—সেই আয়ের প্রকৃত মূল্য কে পরিশোধ করছে?