ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে তীব্র লড়াই দেশটিকে আবারও পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শনিবার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে সামরিক স্থাপনায় হুথিদের হামলার জবাবে সরকারি বাহিনী পাল্টা সামরিক অভিযান চালিয়েছে। দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মারিব ও হাদরামাউতে হামলায় নিহত ১৭ সেনা
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত দুই দিন আগে। তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ মারিব ও হাদরামাউত প্রদেশে সরকারি বাহিনীর সামরিক অবস্থানে হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হুথিরা। ইয়েমেন সরকারের দাবি, এসব হামলায় অন্তত ১৭ সেনা নিহত হন।
শুক্রবারও সহিংসতা অব্যাহত থাকে। মারিব শহরের আবাসিক এলাকা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি বড় শিবিরে হুথিদের হামলায় দুইজন নিহত ও ১৪ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছে ইয়েমেন সরকার।
শনিবার ইয়েমেনি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নুজাইলি জানান, কয়েকটি এলাকায় হুথি মিলিশিয়ার ‘সন্ত্রাসী উপাদানের’ বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে সরকারি বাহিনী। তবে অভিযানের বিস্তারিত তিনি জানাননি।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট। ২০১৪ সালে ইরানের সমর্থনে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলছে। এক বছর পর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও দীর্ঘ ও ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও তাদের ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি।
এরপর থেকে ইয়েমেন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০২২ সালে যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করেছিল, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সেটি প্রায় ভেঙে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলের সম্পদসমৃদ্ধ এলাকায় হুথিদের বড় ধরনের অগ্রযাত্রা হলে সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হুমকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশটির লাখ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য নতুন মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব
ইয়েমেনের নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠার তাৎপর্য আরও বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে। ইরানের আঞ্চলিক মিত্র হুথি ও লেবাননের হিজবুল্লাহও ওই সংঘাতের মধ্যে নিজ নিজ অবস্থান থেকে হামলা চালিয়েছে।
গত মাসে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নতুন করে বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিও ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার কাঠামো নিয়ে ইরান ও প্রতিবেশী ওমান আলোচনা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারাও ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা শিগগির হতে পারে। তবে সম্ভাব্য চুক্তিতে জলপথে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের কিছু নিয়ন্ত্রণের দাবি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। শুক্রবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ৫১টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে, দুটি জাহাজকে জোরপূর্বক অচল করেছে এবং আরও দুটি জাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও ইয়েমেনে নতুন সংঘাত সেই স্থিতিশীলতাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। হুথি ও সরকারি বাহিনীর লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের স্থিতিশীলতাও নতুন চাপে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















