একসময় চীনের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানকে বিদেশে পড়তে পাঠানো ছিল বড় স্বপ্ন। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি মানেই ছিল ভালো চাকরি, সামাজিক মর্যাদা এবং উন্নত ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। সন্তান বিশ্বের নানা দেশ দেখবে, নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করবে এবং দেশে ফিরে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল অভিভাবকদের।
কিন্তু সেই মানসিকতায় এখন বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। চীনের তরুণদের একটি বড় অংশ বিদেশে উচ্চশিক্ষার বদলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা করতে চাইছে। যারা বিদেশে যাচ্ছে, তাদেরও বিপুলসংখ্যক পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসছে।
বিদেশে পড়াশোনা নিয়ে পরামর্শ দেওয়া বেইজিংয়ের পরামর্শক ইয়াং ফানের অভিজ্ঞতায় গত দেড় দশকে এই পরিবর্তন খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৫ বছর আগে তিনি যখন এই পেশায় আসেন, তখন বিদেশে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের আলাদা মর্যাদার চোখে দেখা হতো। এখন অনেক অভিভাবকই মনে করেন, চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের তুলনায় যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। তাই বিদেশে পড়াশোনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন কতটা, সেটিই তারা নতুন করে ভাবছেন।
চীনের বিশ্বসম্পৃক্ততার সঙ্গে একসময় বাড়ছিল বিদেশে পড়াশোনা
চীনের বিদেশে পড়াশোনার প্রবণতা দেশটির বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রপ্তানি দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সময়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
শুরুর দিকে মূলত অত্যন্ত মেধাবী, ধনী কিংবা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের সন্তানরাই বিদেশে পড়তে যেতেন। তাদের অনেকেই বিদেশে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন শিল্পে কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে যারা দেশে ফিরে আসতেন, তারা চাকরির বাজারে বিশেষ মর্যাদা পেতেন এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় চাকরির সুযোগ পেতেন।
চীনের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে পড়াশোনা আর কেবল অভিজাত পরিবারের বিষয় থাকেনি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারও সন্তানকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পড়তে পাঠাতে শুরু করে।
অনেক তরুণের কাছে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হয়ে ওঠে উন্নত জীবনের সম্ভাব্য পথ।
কিন্তু ২০১৯ সালের পর সেই প্রবণতায় ধীরে ধীরে ভাটা পড়ে।
মহামারি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় বদলে যায় পরিস্থিতি
বিশ্বজুড়ে মহামারি আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয় চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক বিরোধ এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।
ফলে বিদেশে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য আগের তুলনায় বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
২০১৯ সালে প্রায় ৭ লাখ চীনা তরুণ বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজারে। ২০১৬ সালের পর এটিই ছিল সবচেয়ে কম সংখ্যা।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এর পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের পছন্দের পরিবর্তন নয়, বিদেশে পড়াশোনা ও পরে সেখানেই চাকরি করার পথ কঠিন হয়ে যাওয়াও বড় কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রেও চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আগের মতো সহজ নেই।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়ে পড়াশোনা করা চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা কঠোরভাবে পর্যালোচনা ও বাতিল করার কথা জানায়।
পড়াশোনা শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে কাজ করার ক্ষেত্রেও নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত কর্মভিসার ব্যবস্থায় বেতনভিত্তিক কিছু পরিবর্তন নতুন স্নাতকদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে।
এর বাস্তব প্রভাব পড়েছে চীনা তরুণদের ওপরও।
একজন ২৫ বছর বয়সী চীনা নারী যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। কিন্তু ভিসার অবস্থার কারণে তিনি সহজে চাকরি পরিবর্তন করতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বদলে চীনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষার্থীকে বিদেশে পড়াশোনা শেষে সেখানে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বিদেশি শিক্ষার খরচ এখন বড় বাধা
বিদেশে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমার আরেকটি বড় কারণ হলো খরচ।
নিউ ওরিয়েন্টালের এক জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরে বিদেশে পড়াশোনার গড় ব্যয় প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার ইউয়ান। ২০২৩ সালের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেড়েছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপও পরিবারগুলোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। আয় ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক পরিবার এখন সন্তানের বিদেশি শিক্ষার জন্য আগের মতো বিপুল অর্থ খরচ করতে চাইছে না।
শিক্ষার্থীরাও হিসাব করছে, বিদেশি ডিগ্রি অর্জনের জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে, ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগের যথেষ্ট আর্থিক সুফল পাওয়া যাবে কি না।
ফলে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়, খরচের তুলনায় শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ চাকরির সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে আগ্রহ
চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমলেও যারা যাচ্ছেন, তাদের গন্তব্যের ধরন বদলে যাচ্ছে।
ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় আগ্রহ বাড়ছে।
এর মধ্যে হংকং বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
হংকংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থান ভালো। একই সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এর ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও ঘনিষ্ঠ। ফলে পরিবারগুলো সন্তানকে অনেক দূরের পশ্চিমা দেশে পাঠানোর পরিবর্তে হংকংকে তুলনামূলক নিরাপদ ও সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে দেখছে।
শিক্ষা পরামর্শক ইয়াং ফানের কাছে আসা সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের প্রায় পাঁচজনের মধ্যে চারজনই হংকংয়ে পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চান।
কম খরচের গন্তব্যের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। মালয়েশিয়ায় প্রায় ১ লাখ ইউয়ানের মধ্যে একটি ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুযোগ থাকায় দেশটিও চীনা শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে চীনা শিক্ষার্থীরা এখন আগের মতো শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনের মতো সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গন্তব্যের দিকে তাকাচ্ছে না। বরং তারা ব্যয়, দূরত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ চাকরির সম্ভাবনা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নতি বদলে দিয়েছে হিসাব
চীনের অভ্যন্তরীণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দ্রুত উন্নতিও বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে।
গত বছর চীনে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হয়েছে রেকর্ড ১ কোটি ৭ লাখ শিক্ষার্থী। একই সময়ে চীনের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে ১৩তম ও ১৪তম অবস্থানে রয়েছে।
চীনের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল গবেষণাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে।
দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার খরচও বিদেশের তুলনায় অনেক কম। সাধারণত কয়েক হাজার ইউয়ান বার্ষিক শিক্ষাব্যয়েই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব।
ফলে পরিবারের সামনে এখন একটি সহজ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—যেখানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভালো শিক্ষা দিচ্ছে এবং খরচও অনেক কম, সেখানে বিদেশে পড়াশোনার জন্য কয়েক লাখ ইউয়ান ব্যয় করার যৌক্তিকতা কতটা?
অবশ্য অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইভি লিগের মতো বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর আকর্ষণ এখনো অটুট। কিন্তু মাঝারি মানের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ডিগ্রি আগের মতো বাড়তি মর্যাদা নিশ্চিত করছে না।
বিদেশি ডিগ্রির চাকরির সুবিধা কমেছে
চীনে বিদেশে পড়াশোনা শেষে ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের ‘হাইগুই’ বলা হয়। একসময় এই শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে বিশেষ সুবিধা পেতেন।
এখন সেই সুবিধা অনেকটাই কমে গেছে।
নিউ ওরিয়েন্টালের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশফেরত একজন শিক্ষার্থীর গড় প্রারম্ভিক মাসিক বেতন প্রায় ১২ হাজার ৮০০ ইউয়ান। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৭০০ ইউয়ান।
অর্থাৎ বিদেশি ডিগ্রি অর্জনের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেও চাকরির শুরুতে বেতনগত পার্থক্য খুব বেশি নয়।
কিছু ক্ষেত্রে বিদেশফেরত শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও কঠিন।
চীনের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এক তরুণী জানান, তার বাবা-মা তাকে বিদেশে পড়াতে ২০ লাখ ইউয়ানের বেশি খরচ করেছিলেন। অথচ পড়াশোনা শেষে তিনি মাসে মাত্র ৪ হাজার ইউয়ান বেতনের চাকরি পান।
এ ধরনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চীনা তরুণদের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনার অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এক বছরের বিদেশি স্নাতকোত্তর কোর্স নিয়েও প্রশ্ন
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে রসায়নে স্নাতকোত্তর পড়া চীনা শিক্ষার্থী জৌ বিদেশে গিয়েছেন মূলত পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে।
কিন্তু দেশে ফিরে চীনের চিপ নির্মাণ শিল্পে চাকরি করার সময় তিনি মনে করছেন না যে বিদেশি ডিগ্রি তাকে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের ওপর বড় কোনো সুবিধা দেবে।
এর একটি কারণ হলো শিক্ষাক্রমের দৈর্ঘ্য।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনে যেখানে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে, সেখানে যুক্তরাজ্যের কিছু কোর্স মাত্র এক বছরেই শেষ হয়।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কোর্সে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতাও তুলনামূলক কম হওয়ায় নিয়োগদাতাদের একটি অংশ এখন এসব ডিগ্রির মান নিয়ে আগের মতো নিশ্চিত নয়।
জৌয়ের শ্রেণিতেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী চীন থেকে এসেছে। অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানে এই অনুপাত ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ফলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে এমন পরিবেশ পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে, যেখানে একই দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত। এতে বিদেশে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের অভিজ্ঞতা পাওয়ার যে প্রত্যাশা থাকে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে পূরণ হচ্ছে না।
কিছু নিয়োগকর্তার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে
বিদেশি ডিগ্রি এখন আর সব নিয়োগদাতার কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়তি সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।
কিছু মানবসম্পদ কর্মকর্তা মনে করেন, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থীরা দেশের কর্মপরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুনের সঙ্গে তুলনামূলক সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
বিদেশফেরত শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ আবার সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও বাড়তি বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কিছু প্রাদেশিক সরকার বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে আসা শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখিয়েছে।
২০২৪ সালে চীনের বড় বৈদ্যুতিক পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গ্রির প্রধান বিদেশফেরত শিক্ষার্থীদের নিয়োগ না করার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তাদের সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছিলেন।
এ ধরনের বক্তব্য দেখিয়ে দেয়, বিদেশে পড়াশোনা এখন শুধু শিক্ষা বা চাকরির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আস্থার বিষয়ও কোথাও কোথাও যুক্ত হয়ে গেছে।
দেশে ফিরছেন প্রায় সবাই
চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখিতা কমার পাশাপাশি বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরার প্রবণতাও দ্রুত বাড়ছে।
২০২৫ সালে বিদেশে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৪ শতাংশ পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরেছেন। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ হার।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫২ লাখ বিদেশফেরত শিক্ষার্থী চীনে ফিরে এসেছেন।
এই বিপুলসংখ্যক তরুণ দেশে ফিরে আসায় বিদেশি ডিগ্রির সামাজিক মর্যাদাও আগের মতো বিশেষ থাকছে না।
একসময় বিদেশফেরত মানেই ছিল বিরল ও বিশেষ অভিজ্ঞতার অধিকারী মানুষ। এখন লাখ লাখ তরুণ বিদেশে পড়াশোনা করে ফিরে আসায় এই পরিচয় আর ততটা ব্যতিক্রমী নয়।
চাকরির বাজারে যেমন বিদেশি ডিগ্রির মূল্যায়ন বদলেছে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিদেশে পড়াশোনার আকর্ষণ কমেছে।
পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিপাকে
চীনা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর।
ব্রিটেনের শীর্ষ ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গঠিত রাসেল গ্রুপে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের দুই-পঞ্চমাংশের বেশি ছিলেন চীনা নাগরিক।
চীনা শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো স্নাতকোত্তর কোর্স বাড়িয়েছিল। বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া উচ্চ ফি এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠেছিল।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে—এই প্রত্যাশায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক নিয়োগ করেছে, নতুন ভবন তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে।
কিন্তু এখন চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই ব্যবসায়িক মডেল চাপের মুখে পড়েছে।
লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফিলিপ্পো বোয়েরির ভাষায়, আগের পরিস্থিতি অনেকটা আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি বিভ্রম তৈরি করেছিল।
এখন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স বন্ধ করছে। কোথাও শিক্ষক-কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে। কোথাও আবার কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
অর্থাৎ চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব এখন পশ্চিমা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অর্থনীতিতেও দৃশ্যমান।
চীনের জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি
বিদেশে কম চীনা শিক্ষার্থী যাওয়া চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কিছু ঝুঁকিও রয়েছে।
চীন যখন বিশ্বের সঙ্গে দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হচ্ছিল, তখন বিদেশফেরত শিক্ষার্থীরা দেশের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
তারা বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছিলেন নতুন প্রযুক্তি, গবেষণার পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনার ধারণা, আন্তর্জাতিক ব্যবসার অভিজ্ঞতা এবং ভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা।
চীনের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও বিদেশে পড়াশোনা করা ব্যক্তির উপস্থিতি রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের পলিটব্যুরোর বর্তমান ২১ সদস্যের মধ্যে আটজন বিদেশে পড়াশোনা করেছেন।
বিদেশফেরত তরুণরা চীনা কোম্পানিগুলোকে বিদেশি বাজারে প্রবেশ করতেও সাহায্য করেছেন। তারা বিদেশি ভাষা, ব্যবসায়িক সংস্কৃতি, আইনকানুন, বাজারের আচরণ এবং স্থানীয় যোগাযোগ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন।
ফলে বিদেশে যাওয়ার এই প্রবাহ যদি দীর্ঘমেয়াদে সংকুচিত হয়, তাহলে চীন নিজেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হারাতে পারে।
বিশ্বের সঙ্গে চীনের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে
বিদেশে পড়াশোনা শুধু একটি শিক্ষাগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
চীনের লাখ লাখ তরুণ যখন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান কিংবা অন্য দেশে পড়াশোনা করতেন, তখন তারা শুধু ডিগ্রি অর্জন করতেন না। তারা স্থানীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ব্যবসা ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতেন।
পরে দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও সমাজে ব্যবহার করতেন।
এখন সেই প্রবাহ কমে গেলে চীন ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে সরাসরি মানবিক যোগাযোগও কমতে পারে।
চীনা তরুণদের কাছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা তাই একদিকে চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য ও আত্মনির্ভরতার প্রতিফলন। অন্যদিকে এটি বিশ্বায়নের গতিপথ বদলে যাওয়ারও একটি লক্ষণ।

বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নের জায়গায় বাস্তব হিসাব
চীনা তরুণদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের পেছনে কোনো একক কারণ নেই।
মহামারির পর আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তন, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিদেশি শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এবং চীনের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নতি—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি বদলেছে।
আগে প্রশ্ন ছিল, বিদেশে গেলে ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে।
এখন প্রশ্নটি অনেক বেশি বাস্তব—বিদেশে যেতে যে বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় হবে, তার বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা কতটা পাওয়া যাবে?
এই পরিবর্তনই চীনের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রকে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে।
একসময় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাওয়া ছিল চীনা তরুণদের কাছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এখন অনেকেই মনে করছেন, সেই সমুদ্র পাড়ি না দিয়েও দেশে থেকেই ভালো শিক্ষা, ভালো চাকরি এবং ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।
তবে বিদেশে যাওয়ার প্রবাহ কমে গেলে শুধু পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। চীনও হারাতে পারে বিদেশ থেকে জ্ঞান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসা সেই প্রজন্মের একটি অংশ, যারা গত কয়েক দশকে দেশটির আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাই চীনের বিদেশে পড়াশোনার নতুন বাস্তবতা একই সঙ্গে দুটি বিপরীত বার্তা দিচ্ছে—দেশের ভেতরে শিক্ষার শক্তি বাড়ছে, কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ সংকুচিত হচ্ছে।
বিদেশে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে, দেশে ফিরছেন রেকর্ডসংখ্যক তরুণ। এর পেছনে বাড়তি ব্যয়, ভিসা জটিলতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং চীনের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বড় ভূমিকা রাখছে। এই পরিবর্তন শুধু চীনের শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নয়, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক মানবসম্পদ প্রবাহকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বিদেশে পড়ার স্বপ্ন কি চীনের তরুণদের কাছে আগের মতো আকর্ষণীয় নেই? কেন তারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, কেন বিদেশে গিয়েও দেশে ফিরে আসছেন এবং এর প্রভাব চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের ওপর কী হতে পারে—জানুন বিস্তারিত প্রতিবেদনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















