জাপানের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন এক অধ্যায়, যার সঙ্গে দেশটির বর্তমান পরিচয়ও অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে। একদিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ জাপানকে যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতীক বানিয়েছে, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পরাজয়ের স্মৃতি এখনো দেশটির সাংস্কৃতিক কল্পনায় সক্রিয়।
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতীকগুলোর একটি হলো ইয়ামাতো—ইম্পেরিয়াল জাপানিজ নেভির সেই যুদ্ধজাহাজ, যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু জাপানি সমাজে এর সাংস্কৃতিক জীবন আট দশক ধরে বিস্তৃত।
কুরে শহরের ইয়ামাতো মিউজিয়াম এই দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা। হিরোশিমার যুদ্ধ ও শান্তির স্মৃতিচর্চার পাশে দাঁড়িয়ে কুরে যেন জাপানকে তার অতীতের আরেকটি, বেশি অস্বস্তিকর মুখোমুখি দাঁড় করায়।
শান্তির ভাষার আড়ালে যে ইতিহাস
৬ আগস্ট জাপানে সাধারণত গভীর শোক ও আত্মসমালোচনার দিন। ১৯৪৫ সালের এই দিন হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এ বছরও বিশ্বের ১২১টি দেশ ও অঞ্চল হিরোশিমার বার্ষিক স্মরণ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করেছে। শহরের স্মৃতি জাদুঘরেও আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছে; ২০২৫ অর্থবছরে সেখানে ২৫ লাখের বেশি দর্শনার্থী গিয়েছেন, যাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি।
কিন্তু জাপানের যুদ্ধস্মৃতি কেবল হিরোশিমার স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দেশটির ভেতরে এবং প্রতিবেশী চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক।
এই কারণে জাপানের বহু জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধের নামের সঙ্গে ‘শান্তি’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। এটি স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য একটি ধারণা। কিন্তু অতিরিক্ত সাধারণীকরণ কখনো কখনো ইতিহাসের নির্দিষ্ট চরিত্রগুলোকে আড়াল করে। হিরোশিমা যেখানে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতার স্মৃতি বহন করে, কুরে সেখানে আত্মঘাতী পাইলট ও সামরিক শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
দুটি শহরই আসলে একই যুদ্ধের ভিন্ন অভিজ্ঞতা ধারণ করে।
ইয়ামাতোর দ্বিতীয় জীবন
হিরোশিমা থেকে অল্প দূরের কুরে শহরে অবস্থিত ইয়ামাতো মিউজিয়াম এই ভিন্ন ইতিহাসকে সামনে আনে। দীর্ঘ সংস্কারের পর জাদুঘরটি এ বছরের এপ্রিলে আবার খুলেছে। এটি শুধু একটি যুদ্ধজাহাজের প্রদর্শনী নয়; বরং জাপান কীভাবে নিজের অতীতকে মনে রাখে, পুনর্ব্যাখ্যা করে এবং কখনো কখনো নতুন অর্থ দেয়—তারও একটি উদাহরণ।
১৯৪৫ সালের এপ্রিলে ওকিনাওয়ার দিকে আত্মঘাতী অভিযানে পাঠানো হয়েছিল ইয়ামাতোকে। মার্কিন বাহিনীর আক্রমণে জাহাজটি ডুবে যায়। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ইয়ামাতোর সেই পরিণতি ছিল জাপানের সামরিক বিপর্যয়ের এক প্রতীকী মুহূর্ত।
কিন্তু জাহাজটি ডুবে গেলেও তার সাংস্কৃতিক জীবন শেষ হয়নি।
জাপানে ইয়ামাতোকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র, লেখা হয়েছে উপন্যাস, তৈরি হয়েছে শিল্পকর্ম। এমনকি ‘স্পেস ব্যাটলশিপ ইয়ামাতো’ নামে জনপ্রিয় অ্যানিমে সিরিজে যুদ্ধজাহাজটিকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উঠে মহাকাশে যাত্রা করতে দেখা যায়—পৃথিবীকে এলিয়েন ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার অভিযানে।
বাস্তবের পরাজিত যুদ্ধজাহাজ এখানে কল্পনায় পরিণত হয়েছে পৃথিবী রক্ষার নায়কোচিত প্রতীকে। এই রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে ইয়ামাতো শুধু সামরিক ইতিহাসের বস্তু থাকে না; এটি হয়ে ওঠে পরাজয়, আকাঙ্ক্ষা, প্রযুক্তি, আত্মত্যাগ এবং অপূর্ণ স্বপ্নের সাংস্কৃতিক প্রতীক।
প্রযুক্তির গর্ব বনাম ইতিহাসের দায়
চলচ্চিত্র নির্মাতা তাকাশি ইয়ামাজাকি, যিনি ‘গডজিলা মাইনাস ওয়ান’-এর জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন, ইয়ামাতোকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী জাপানি প্রতীকগুলোর একটি হিসেবে দেখেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে ইয়ামাতোর গল্পে এমন এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কল্পনায় নতুন জীবন পেয়েছে।
সাংবাদিক হিরোয়ুকি ওতার লেখাতেও ইয়ামাতোর এই সাংস্কৃতিক ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। তাঁর বিশ্লেষণে, ১৯৪৫ সালে জাহাজটির ডুবে যাওয়ার ক্ষত এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি; কল্পকাহিনি সেই ক্ষতকে অন্যভাবে ধারণ করার একটি পথ তৈরি করেছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে।
ইয়ামাতো কি কেবল একটি পরাজিত সামরিক শক্তির স্মারক, নাকি এটি জাপানের অসাধারণ শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীকও?
কুরের জাদুঘর দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি পুরোপুরি এড়িয়ে যায় না। সেখানে যুদ্ধজাহাজটির নির্মাণকে জাপানের প্রাকযুদ্ধকালীন জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তির অসাধারণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জাদুঘরের প্রদর্শনীতে এমন যুক্তিও রয়েছে যে ইয়ামাতো নির্মাণে অর্জিত শিল্প ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার কিছু ধারাই পরবর্তী সময়ে জাপানের গাড়ি, ক্যামেরা, দ্রুতগতির ট্রেন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ একটি যুদ্ধজাহাজের গল্পকে সেখানে পরাজয়ের গল্প থেকে পুনর্গঠনের গল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির রাজনৈতিক তাৎপর্যও আছে। কারণ জাপানের যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক উত্থানকে যদি যুদ্ধকালীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ইয়ামাতো কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়; বরং পরবর্তী জাতীয় পুনর্গঠনের একটি দূরবর্তী পূর্বসূরিও হয়ে ওঠে।

তবে এই ব্যাখ্যা ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কমুক্ত নয়।
ইতিহাসকে প্রযুক্তি দিয়ে ঢেকে দেওয়া যাবে?
ইতিহাসবিদ হিরোমি মিজুনোর আপত্তি এখানেই। তাঁর মতে, যুদ্ধকালীন প্রযুক্তিকে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখলে প্রযুক্তির বিকাশের পেছনে থাকা উদ্দেশ্য ও শ্রম—দুটিই আড়ালে চলে যেতে পারে।
এই আপত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়ামাতো নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ প্রকৌশল সাফল্য ছিল। কিন্তু সেটি কেন নির্মিত হয়েছিল, কোন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কোন যুদ্ধে সেটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল—এসব প্রশ্ন বাদ দিলে প্রযুক্তিগত সাফল্যের মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এখানে জাপানের যুদ্ধস্মৃতির বৃহত্তর দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়। রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণত যুদ্ধের বিপর্যয়কে অস্বীকার না করেও জাপানের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথা সামনে আনে। অন্যদিকে উদারপন্থী ও সমালোচনামূলক ইতিহাসচর্চা মনে করে, যুদ্ধকালীন প্রযুক্তিগত অর্জনকে গৌরবের বিষয় বানানোর আগে তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক মূল্যকে সামনে রাখা জরুরি।
ইয়ামাতো তাই দুই পক্ষের জন্যই ব্যবহারযোগ্য এক প্রতীক।
কুরে ও হিরোশিয়া—দুটি আলাদা স্মৃতি নয়
হিরোশিমা ও কুরেকে অনেক সময় দুটি বিপরীত প্রতীকের শহর হিসেবে দেখা হয়। একটি ‘শান্তি’র, অন্যটি ‘সামরিক শক্তি’র। কিন্তু এই বিভাজন আসলে ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।
দুই শহরের অস্তিত্বই যুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কুরে ছিল ইম্পেরিয়াল নেভির গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও জাহাজ নির্মাণকেন্দ্র। হিরোশিয়া যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পারমাণবিক হামলার শিকার হয়ে বিশ্ব ইতিহাসে অন্য ধরনের প্রতীকে পরিণত হয়।
অর্থাৎ দুটি শহরকে আলাদা করে দেখলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি অভিজ্ঞতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
কুরের আজকের চেহারা যুদ্ধের আগের শহরটির সঙ্গে মেলানো কঠিন। আধুনিক বন্দর, রেল যোগাযোগ এবং শহুরে জীবন পুরোনো সামরিক অবকাঠামোর জায়গা নিয়েছে। কিন্তু ইয়ামাতো মিউজিয়াম সেই অতীতকে পুরোপুরি মুছে যেতে দেয় না।
জাদুঘরের বিশাল মডেলটি এই স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধজাহাজটির এক-দশমাংশ মাপের মডেল দর্শকদের কাছে তার বিশালত্বকে বাস্তবের কাছাকাছি অনুভব করায়। আরও ক্ষুদ্র মডেল তৈরির প্রযুক্তিও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। এ যেন একই সঙ্গে অতীতের সামরিক প্রযুক্তি এবং বর্তমানের প্রদর্শন প্রযুক্তির সাক্ষাৎ।
ইয়ামাতোর জনপ্রিয়তা যে কেবল জাদুঘরের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণও আছে। যুদ্ধজাহাজটির প্রতিরূপ তৈরি করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল; মাত্র ছয় মাসে সেখানে ১০ লাখের বেশি মানুষ গিয়েছিল।
এত বিপুল আগ্রহ দেখায়, ইয়ামাতোকে জাপানি সমাজ কেবল একটি যুদ্ধের স্মারক হিসেবে দেখে না।
হারানো গৌরবের প্রতীক?
ইয়ামাতোর জনপ্রিয়তার আরেকটি ব্যাখ্যা আরও গভীরে যায়। কারও কাছে এটি সেই প্রাচীন জাপানি কাহিনিগুলোর সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে তরুণ নায়ক পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছানোর আগেই আত্মত্যাগ করে। অন্যদের কাছে এটি এমন এক দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ, যাকে একসময় পশ্চিমা বিশ্ব শিল্প ও বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা রাষ্ট্র হিসেবে দেখত।
এই ব্যাখ্যায় ইয়ামাতোর সামরিক পরাজয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার নির্মাণক্ষমতা।
কিন্তু এখানেও সতর্ক থাকা দরকার। একটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অবশ্যই তার ইতিহাসের গর্ব হতে পারে। কিন্তু যে প্রযুক্তি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, তার গৌরবকে যুদ্ধের নৈতিকতা থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।
ইয়ামাতোর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—এটি কোনো একক অর্থে আটকে নেই।
কারও কাছে এটি আত্মত্যাগের প্রতীক, কারও কাছে প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব, কারও কাছে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের বিপজ্জনক উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্মারক, আবার কারও কাছে যুদ্ধোত্তর জাতীয় পুনর্গঠনের দূরবর্তী প্রতীক।
জাপান আবার শক্তিশালী হচ্ছে
আজ ইয়ামাতোর নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান দীর্ঘ সময় সামরিক শক্তির বদলে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিকে নিজের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের ভিত্তি বানিয়েছে। গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, অ্যানিমে, সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশটি বিশ্বে যে প্রভাব তৈরি করেছে, সেটি এক ধরনের ‘নরম শক্তি’র অসাধারণ উদাহরণ।

কিন্তু সেই জাপান এখন ধীরে ধীরে কঠিন শক্তির দিকে ফিরে তাকাচ্ছে।
১৯৪৫ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ত্র উন্নয়ন, সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর পুরোনো সীমাবদ্ধতা শিথিল করা এবং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে জাপানের নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সময়ে ইয়ামাতোকে নতুন চোখে দেখা অবশ্যম্ভাবী।
একসময় যে যুদ্ধজাহাজ জাপানের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত প্রতীক ছিল, আজ সেটিই এমন এক সময়ে সাংস্কৃতিকভাবে পুনরায় সামনে এসেছে যখন জাপান আবার সামরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবছে।
এটি সরাসরি কোনো পুনরাবৃত্তির প্রমাণ নয়। বর্তমান জাপান ১৯৪০-এর দশকের জাপান নয়। কিন্তু ইতিহাসের প্রতীক কখনো শুধু অতীতের মধ্যে আটকে থাকে না। বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের নতুন অর্থ দেয়।
ইয়ামাতো সেই অর্থে জাপানের অমীমাংসিত আত্মপরিচয়ের একটি আয়না।
পরাজয়ের স্মৃতি থেকে ভবিষ্যতের প্রশ্ন
জাপান জার্মানির তুলনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ্রাসী ভূমিকার দায় স্বীকার ও তার সঙ্গে হিসাব-নিকাশে কম সফল হয়েছে—এমন মত বহু গবেষকের। এই প্রেক্ষাপটে ইয়ামাতোর জনপ্রিয়তা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কারণ জাহাজটি একই সঙ্গে জাতীয় গর্ব এবং জাতীয় বিপর্যয়ের প্রতীক।
এটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের স্মৃতি, আবার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধেরও স্মারক। এটি আত্মত্যাগের কাহিনি, আবার সেই আত্মত্যাগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে। এটি জাপানের পরাজয়ের প্রতীক, আবার যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের গল্প বলার একটি মাধ্যম।
সম্ভবত ইয়ামাতোকে বোঝার সবচেয়ে সৎ উপায় হলো এর এই দ্বৈততা মেনে নেওয়া।
একটি সমাজ তার অতীতকে স্মরণ করার সময় শুধু অপরাধবোধে আটকে থাকতে পারে না। কিন্তু গর্বের নামে সেই অতীতের অন্ধকারও মুছে ফেলতে পারে না। ইতিহাসের পরিপক্বতা আসলে এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা।
কুরের ইয়ামাতো মিউজিয়ামের গুরুত্ব এখানেই। এটি জাপানকে শুধু কীভাবে শক্তিশালী ছিল তা মনে করায় না; বরং সেই শক্তি কোথায় নিয়ে গিয়েছিল, তার মূল্য কী ছিল এবং আজকের জাপান আবার কোন পথে হাঁটছে—সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
ইয়ামাতো মাত্র কয়েক বছর সমুদ্রে ছিল। কিন্তু তার সাংস্কৃতিক জীবন আট দশক ধরে চলছে। সম্ভবত এর কারণ জাহাজটি নিজে নয়, বরং জাপান যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পুরোপুরি খুঁজে পায়নি, সেগুলোর প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি।
যে দেশ একসময় সামরিক শক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে ভয় দেখিয়েছিল, পরে প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশ্বকে আকৃষ্ট করেছে, সেই দেশ এখন আবার নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এই পরিবর্তনের সময়ে ইয়ামাতোর দিকে তাকানো মানে শুধু অতীতের একটি যুদ্ধজাহাজের দিকে তাকানো নয়। বরং জাপান নিজের অতীতকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে এবং সেই ব্যাখ্যা তার ভবিষ্যৎকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে—সেই প্রশ্নের দিকে তাকানো।
আলেকজান্ডার উলি 



















